ব্রজগোপাল শূন্য বাসার নির্জনতা আর স্তব্ধতা টের পান। ভয় লাগে। সবাই ঠিকঠাক আছে তো! সংসারী মানুষের বুকে মায়ার পাথার দিয়ে রেখেছেন ঠাকুর। এত যে ছেড়ে থাকেন তবু ভুল পড়ে না। বিশ্বসংসারকে আপন করতে পারা সোজা নয়, তেমনি শক্ত নিজের জনকে পর করা। এ বড় ধন্ধ।।
—খারাপ খবর নেই তো!
ননীবালা হঠাৎ উভরে বলেন—খারাপ নয় তো কী? ভাল খবর আসবে কোত্থেকে?
ব্রজগোপাল ধুতির খুঁটে মুখের ঘাম মুছে হাতের বোঝা নামিয়ে বলেন—ভাল আর কী হবে? ভাল চাই না, খারাপ কিছু না হলেই হল। সংসারী মানুষের তো ওই সারাক্ষণ ভয়, ভাল না হোক খারাপও যেন কিছু না হয়।
ননীবালা বলেন—তুমি আবার সংসারী নাকি!
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—ভেক বোঝা যায় না। কিন্তু আমিও যেমন জানি তুমিও তেমনি জানো, আমার মায়াদয়া ঠাকুর কম দেননি। তোমাদের শান্তির অভাব হবে বুঝেই আমি বেড়াল-পার হয়েছি। এসব তো কেউ বুঝবে না।
ব্রজগোপাল বাইরের ঘরের সোফাটায় বসতে যাচ্ছিলেন, ননীবালা বললেন—ওখানে বসছ কেন? ঘরে এস। আমার ঘরে।।
—এই তো বেশ। দুটো কথা বলে চলে যাব।
ননীবালা ঝংকার দিয়ে বলেন—কেন, বাইরের লোক নাকি যে বাইরের ঘরে বসে দুটো কথা বলে চলে যাবে! কোনওদিন তো অন্দরমহলে ঢোকো না। বাইরে থেকে বুঝে যাও যে আমরা খুব ভাল আছি।
—তা ভাবি না। স্মিত হেসে ব্রজগোপাল বলেন—দেশকালের যা অবস্থা তাতে ভাল কেই বা আছে। সবাই বাইরেটা চকচকে রাখার চেষ্টা করে, তবু ঢাকতে পারে না। তুমিও পারোনি।।
ননীবালা অবাক হয়ে বলেন—কী পারিনি?
—ননীবউ, তুমি ছেলেদের কাছে বড় আদরে সম্মানে আছো, এটাই আমাকে বোঝাতে চেয়েছিলে বরাবর। কিন্তু আমি বরাবরই টের পেয়েছি, তুমি নিজেকে ধোঁকা দিচ্ছো। তাই কি হয়! মা-বাপকে ছেলেমেয়েরা কবে আর বুঝতে শিখল! মা বাপের মনের মধ্যে কত মান-অভিমান জমা থাকে, ওরা কী তা বোঝে! স্নেহ নিম্নগামী, বড় সত্য কথা। তুমি ওদের জন্য যতই করো ওরা তোমাকে কোনওদিন বুঝতে পারবে না। অভিমান করে লাভ নেই।
ননীবালা কী উত্তর দেবেন! সত্য কথার কী উত্তরই বা হয়। তিনি আবার হঠাৎ চোখে-আসা জল আঁচল চেপে সামলান। বলেন—দোষ কার বলো তো! কে আমাকে ছেলেদের সংসারে যুতে দিয়ে সরে গেল?
—সে কি আমি ননীবউ
—তুমি ছাড়া কে
ব্রজগোপাল বললেন—আমাকে এত বড় মানুষের সম্মান তো তুমি কোনওদিন দাওনি। আমি যে তোমার কেউ তা তো শেষ দিকটায় বুঝতেই পারতাম না। তুমি ছেলেপুলে, নাতিনাতনি নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত ছিলে, সংসারে বুক দিয়ে পড়ে জমি তৈরি করছ, আমার দিকে মনোযোগ ছিল না। উপরন্তু ছেলেমেয়েদের কাছে আমার কত দোষের কথা বলে মন বিষিয়ে দিতে। মনে পড়ে?
ননীবালা স্তব্ধ হয়ে থাকেন। যেন ব্রজগোপাল যে সেসব কথা কখনও তুলবেন এটা তাঁর বিশ্বাস ছিল না।
ব্রজগোপাল বললেন-”ভালই করেছ। আমার ক্ষোভ নেই। কিন্তু আমি বাড়ি ছাড়া হয়ে যেমন বনবাসী, তুমি ঘরে থেকেও তেমনি বনবাসী। ছেলেরা বড় হলে মা-বাপ অপ্রয়োজন হয়, আর সেই বুঝে মা-বাপেরও অপ্রয়োজন হয়ে সরে আসা উচিত।
ননীবালা উম্মাভরে বলেন—আমার ছেলেরা সে রকম নয়।
—না, ছেলেরা বোধ হয় ভালই। ব্রজগোপাল বলেন—তবু বলি, বুড়ো বয়সের মা-বাপকে যদি ছেলেরা নিজের ছেলেমেয়ের মতো না দেখে তবে সংসারও বনবাস। ভাত-কাপড়টাই কি বড় কথা, মর্ম না বুঝলে ভাত কাপড় দিয়ে কী হবে!
ননীবালা শ্বাস ফেলে বলেন—ভিতরের ঘরে এস বোসো। ওভাবে বাইরের ঘর থেকে চলে যাও, ও আমার ভাল লাগে না।
ব্রজগোপাল উঠলেন।
ননীবালা ঘরে এসে নিজের বিছানাটা ঝেড়েঝুড়ে বসালেন ব্রজগোপালকে। বললেন— শরীরটা তো ভাল নেই দেখছি।
—না। ব্রজগোপাল বলেন—গত সপ্তাহেও ব্যথাটা উঠেছিল। নইলে তখন আসবার কথা।
—বুকের ব্যথাটা নাকি?
—হ্যাঁ।
—প্রায়ই হচ্ছে, চিন্তার কথা।
—ব্রজগোপাল শান্তস্বরে বলেন—ওটা ছাড়া আর কোনও উপসর্গ নেই।
—নেই কেন? এবার তো নিজের চোখে দেখে এলাম, খাওয়া অর্ধেকেরও কম হয়ে গেছে। অত কম খেলে চলে নাকি?
—নেই কেন? এবার তো নিজের চোখে দেখে এলাম, খাওয়া অর্ধেকেরও কম হয়ে গেছে। অত কম খেলে চলে নাকি?
—ওতেই বেশ থাকি।
—দুধ-টুধও তো পেটে পড়ে না। বহেরুর কত গরু!
ব্রজগোপাল হাসলেন—ওর মধ্যে আমারও আছে দুটো। হরিয়ানার দুটো গাই কিনেছিলাম দুহাজার টাকায়। দেখোনি, না?
—না! বলোনি তো!
—ভুলে গেছি হয়তো! বুড়ো বয়সে সব মনে থাকে না।
—তা সে গরুর দুধ খায় কে?
—বহেরু বেচে দেয়, কিছু আমাকেও দিয়ে যায়।
ননীবালা আবার একটা শ্বাস ফেলে বলেন—সবই তো করলে, কিন্তু ভোগ-দখল যে কে করবে!
—কে আর করবে! যেই করুক, ভাবব যে আমার আপনজনই করছে। দুনিয়ার কেউ পর নয়।
ননীবালা মেঝেয় বসে চৌকির তলা থেকে সুটকেস টেনে বের করে সযত্নে ধুলোটুলো ন্যাকড়া দিয়ে মুছছিলেন। ব্রজগোপাল বসে আছেন চৌকির ওপর। আড়চোখে দেখলেন।
ননীবালা ডালা খুলে টুকিটাকি জিনিসপত্র বের করে রাখলেন। ট্রাঙ্ক খুলে শাড়ি সেমিজ বের করে থাক করতে থাকেন বিছানায়। কাজকর্ম করতে করতেই বললেন—আর মন টিকছে না।
—কোথায়?
—এখানে।
—কেন? সবিস্ময়ে ব্রজগোপাল বলেন।
—বঝতেই তো পারো। এতকাল গতর পাত করে দিলাম যাদের জন্য তারা মা বলে ভাল করে ডাকে না পর্যন্ত। বউমা এমন কথাও বলে, রণো যে পাগল হল সে নাকি আমার জন্যই। ছোট ছেলেও কত কথা শোনায়! এখন শুনছি, সে নাকি আমেরিকা না কোথায় চলে যাবে।
