মতিরাম কোমরে হাত রেখে দাড়িয়ে থাকে অসহায়ভাবে। তারপর উবু হয়ে বসে পায়ের একটা ফাটা আঙুলের ক্ষতটা নিবিষ্টভাবে দেখার চেষ্টা করে বলে—দৌড়ে এসেছি। কোথায় যে হোঁচট খেয়ে চোটটা লাগল, বুঝতে পারলাম না। এখন ব্যথা করছে বড়।
এই বলে রাস্তার ধুলো তুলে ক্ষতে চাপা দিচ্ছিল।
ব্রজগোপাল ধমক দিয়ে বললেন—ওটা কী করছ। বিষিয়ে যাবে যে!
—ধ্যৎ! ব্রজকর্তা কিছু জানেন না। ধুলোর মতো ওষুধ নেই। যখনই কাটবে একটু ধুলো চাপান দিয়ে দেখবেন, একদম ফরসা।
ব্রজগোপাল আর কিছু বলেন না। যার যেমন বিশ্রাম।
মতিরাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কয়েক পা হেঁটে দেখল। বলল—একটা রিকশা হলে চলে যেতে পারতাম। এ পা নিয়ে কি হঁটা যায়!
রিকশা তো আছেই, ফিরতি পথে তোমাকে নিয়ে যাবেন, আমি বলে দেব।
মতিরাম হাসে—ব্রজকর্তার যেমন কথা। নিয়ে যাবে কি! বললে এমনিতে না করবে না। কিন্তু মুনিশ ব্যাটাদের আমাকে দেখলেই নানারকম মজা চিড়বিড়িয়ে ওঠে। ঠিক মাঝপথে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে। নয়তো এই বেলদার বাজারেই লোক জড়ো করে আমাকে বাঁদর নাচ নাচাবে। তার ওপর বহেরু যদি টের পায় যে পালিয়ে এসেছি তো বড্ড রেগে যাবে। রিকশায় কাজ নেই ব্রজকর্তা, হেঁটেই মেরে দেব।
এই বলে মতিরাম কোথায় যেন লুকিয়ে পড়ল সট করে। ব্রজগোপাল দেখলেন বহেরু আটাচাক্কির দোকান থেকে বেরিয়ে আসছে। মুনিশটাও রিকশার ভেঁপু বাজাচ্ছে প্যাঁ প্যাঁ করে।বহেরু বলল—কর্তা, সময় গড়িয়ে গেছে, গাড়ি এল বলে।
ভিড়ের গাড়ি। অফিসের লেক ঠেসেটুসে উঠেছে। তার মধ্যেই বহেরু একটা চেনা লোক পেয়ে হেঁকে বলল—ওঠো তো কালাচাঁদ, উঠে এই বুড়ো মানুষটাকে বসতে দাও। ব্রাহ্মণ মানুষ দাঁড়িয়ে যাবেন নাকি!
কালাচাঁদ নামে লোকটি তাড়াতাড়ি উঠে ব্রজগোপালকে সত্যিই জায়গা ছেড়ে দেয়।
ব্রজগোপাল লজ্জা পান, বিরক্তও হন, বলেন—তোর যত গা-জোয়ারি ব্যাপার বহেরু। লোকটাকে ওঠালি, দরকারটা কী ছিল?
—না না, ও দাঁড়িয়ে যাবেন আমার সঙ্গে গল্পগাছা করতে করতে। আপনি বুড়ো মানুষ। ব্রজগোপাল হেসে ফেলেন। বলেন—বয়েস কি তোরই কম নাকি!
—চাষার আবার বয়েস! বলে বহেরু মাথা চুলকোয়।
সারাক্ষণ দরজার কাছে বসে ব্রজগোপালের চোখের আড়ালে ওরা গাঁজা টানল দুজনে। ব্রজগোপাল স্পষ্টই টের পেলেন। হাওড়ায় নেমে দেখেন, বহেরুর চোখ দুটো ভারী ঝলমল করছে, মুখখানা টসটসে। তার অর্থ বেশ নেশা হয়েছে।
—কোনদিকে যাবি? ব্রজগোপাল জিজ্ঞেস করেন।
—কালিমায়ের থানটাই আগে দেখে আসি।
বাইরে বেরিয়ে এসে বহেরু অবাক মানে।
বলে কর্তা, এ শহর যে থিক থিক করছে লোকে!
—হুঁ।
—ই বাবা, কতদিন, কতদিন পরে এলাম! তা এত পালটে গেছে বুঝব কী করে! সবই অন্যরকম লাগছে।
বাসে উঠবার হুড়োহুড়ি চলছে। একটা বাস চলে গেল। আর নেই। লোকজন হাপিত্যেশ করে দাড়িয়ে আছে।।
—এত গুঁতোগুঁতি আপনার সইবে না কর্তা, চলুন হেঁটে মেরে দিই। কতদূর আর হবে!
ডালহৌসি পর্যন্ত হেঁটেই এলেন ব্রজগোপাল বহেরুর সঙ্গে। সেখান থেকে বাসে উঠে কালিঘাট পর্যন্ত একসঙ্গে। বহেরু নেমে যাওয়ার আগে বলল—ছটা পাঁচের ট্রেনে থাকব কিন্তু কর্তা।
ব্রজগোপাল স্নিগ্ধস্বরে বলেন—আচ্ছা। দুপুরে কোথাও দুটি খেয়ে নিস।
বেশ লাগছে। শরৎকালটা বেশ সুন্দর গোবিন্দপুরের তুলনায় কলকাতায় একটু গরম বেশি। তা হোক, তবু এই বর্ষার ভারী চমৎকার লাগে চারদিক। মনটাও ভাল, কারণ এখন আর কারও কাছে কোনও প্রত্যাশা নেই।
ঢাকুরিয়ার বাড়িতে পা দিয়েই কিন্তু বড় থতমত খেয়ে গেলেন ব্রজগোপাল। দরজা খুললেন ননীবালা নিজেই। খুলে বিষন্ন অদ্ভুত একটা মুখ বের করে খুব অবাক হয়ে দেখলেন ব্রজগোপালকে। চিরকালের সেই বড় বড় টানা চোখ ননীবালার, এই চোখই পেয়েছে সোমেন। এই বুড়ো বয়সেও ননীবালার চোখ দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।
কিন্তু সেই বড় বড় চোখ দুটো হঠাৎ জলে ভরে টসটস করছিল। ননীবালা আঁচলে আড়াল করলেন মুখ। কথা বলতে পারলেন না। একবার কেবল ফুপিয়ে উঠলেন।
বুক কাঁপছিল। তবু ব্রজগোপাল গুলা ঝেড়ে বলেন—কী হল?
৭০. একমুহূর্তের কান্না নয়
॥ সত্তর ॥
এ ঠিক একমুহূর্তের কান্না নয়। ননীবালা বহুকাল আগে তাঁর ছেলেবেলায় হাজারিবাগের ওদিক বেড়াতে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে একটা কুণ্ড দেখেছিলেন। পাথরের ভিতরে গর্তমতো, নানা ফাটল দিয়ে চুইয়ে জল বয়ে এসে সেইখানে জমছে নিরন্তর। ননীবালারও তাই। সংসারের কত ফাটা ভাঙা গুপ্তপথ দিয়ে কান্না চুইয়ে এসে বুক ভরে রাখে। ব্রজগোপালের হঠাৎ দেখা পেয়ে সেই কান্নাটাই বেরিয়ে এল।
আজ কেউ বাড়িতে নেই। সকালেই ছেলেমেয়ে নিয়ে রণেন আর বীণা গেছে দক্ষিণেশ্বরে। সোমেনও এ সময়ে বাড়ি থাকে না। ননীবালা একা। সেই একা থাকার মধ্যে হঠাৎ পর মানুষটা এল। বুকটা ভার হয়েই ছিল, ব্রজগোপালকে দেখে সেই ভারটা নড়ে উঠল, ফুলিয়ে তুলল বুক।
দরজা ছেড়ে ভিতরে পিছিয়ে এসে ননীবালা বললেন—এস।
ব্রজগোপাল ইতস্তত করেন। বুকটা বেসামাল লাগে। ননীবালা কঁদছে কেন? কোনও খারাপ খবর নেই তো? রণেন, সোমেন, শীলা, ইলা নাতিনাতনিরা সব ভাল আছে তো?
গলাখাঁকারি দিয়ে ব্রজগোপাল বলেন—খবরটবর কী?
—এস, বলছি।
ব্রজগোপাল ঘরে এলে ননীবালা দরজা বন্ধ করে দেন।
