যখন উঠলেন তখন দুই চোখে জল, মুখটা তৃপ্ত, মনটা বড় শান্ত ও উদাস। তুমি আজ প্রণাম নিয়েছ, সে তোমারই দয়া। ঠাকুর, আর কিছু না, রোজ যেন একবার আমার প্রণাম প্রণামের মতো হয়।
কপালের আড়াল থেকে ছোট্ট একটা মাথা সাবধানে উঁকি দিচ্ছে।
উদার আনন্দে ব্রজগোপাল ডাকলেন—কে রে, ষষ্ঠী? আয়।
—না। আমি মতিরাম।
এই বলে বামন মতিরাম ঘরে ঢোকে। মুখটা বিষন্ন। ওকে ঠিক এরকম গম্ভীর মুখে মানায় না সব সময়ে ফষ্টিনষ্টি ইয়ারকি করে, তাই ওটাই ওর স্বাভাবিক ব্যাপার।
—কী গো মতিরাম? বলো।
—আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবেন ব্রজকর্তা? আমি পালাব।
—সে কী?
—বড় মারে এরা। কালও কপিল লাথি মেরেছে। তাদের কেবল ওই কথা, চলে যা, বসে খেতে পারবি না। আমি খাই কতটুকু ব্ৰজকর্তা? পেটটা দেখুন না, কতটুকু।
—তাই পালাবি? বহেরুকে বলগে যা না।
—ও বাবা, সে বড় কড়া মনিব। তার ওপর ছেলেদের ভয় খায়। আপনি রিকশায় যান, আমি বেলদার বাজার পর্যন্ত ছুটে চলে যাব, সেখানে আমাকে রিকশায় তুলে নেবেন। কলকাতার রাস্তায় ছেড়ে দেবেন। ঠিক পেট চালিয়ে নেব। কলকাতার লোকে মজা দেখতে ভালবাসে।
—বহেরু শুনলে রাগ করবে।
—করুক রাগ। তখন তো আমাকে খুঁজে পাবে না
ব্রজগোপালের মনটা খারাপ হয়ে যায়। ডাকাত বহেররুও একটা গৃহস্থ মন ছিল। সে কাউকে ফেলত না। তার সময় শেষ হয়ে গেছে। এখন যারা তার জায়গায় দখল নিচ্ছে তারা লম্বায় চওড়ায় কম নয়, কিন্তু মনুষ্যত্বে ওই মতিরামের মতোই বামন।
ব্রজগোপাল বললেন—যাবি তো চল।
—একগাল হেসে মতিরাম চলে যায়।
ব্রজগোপাল ঘড়ি দেখে রিকশায় উঠতে গিয়ে দেখেন বহেরু সাজগোজ করে এসেছে। গায়ে পিরান, পরনে পরিষ্কার ধুতি, পায়ে একটা দেশি মুচির তৈরি চটিও। ব্রজগোপাল উঠতেই সেও উঠে রিকশার পা রাখার জায়গায় ব্রজগোপালের পা ঘেঁষে বসে পড়ে বলল— চলুন আমিও যাচ্ছি। একা আপনাকে ছাড়ব না।
॥ উনসত্তর ॥
একটা দানোর মতো বিশাল বহেরু উবু হয়ে পায়ের কাছে বসে আছে। এবড়ো-থেবড়ো রাস্তায় রিকশাটা জোর ঝাকুনি দিচ্ছে মাঝে মাঝে, বহেরু গাড়োয়ান যেমন তার গরুর গাড়ির গরুকে ধমকায়, ঠিক তেমনই ধমক মারে রিকশাঅলাকে’—র’, র’, হেই!
মুনিশটা রিকশা চালাচ্ছে, সে তেমন পাকা লোক নয়। রাস্তাটা খারাপ৷ বর্ষার পর রাস্তার খানাখন্দ সব বেরিয়ে পড়েছে। কবে যে কে এ রাস্তা মেরামত করবে তার ঠিক নেই।
বহেরু মুখটা তুলে ব্রজগোপালের দিকে চেয়ে বলে—বহুকাল কলকাতায় যাই না।
ব্রজগোপাল ভ্রুকুটি করে বলেন—যাওয়ার দরকারটা কী ছিল?
—সেখানকার মচ্ছবটা দেখে আসি একটু। কালিমায়ের মন্দিরেও যাব। মাথাটা ঠুকে দিয়ে আসি। বহুকাল যাই না।
ব্রজগোপালের অবশ্য অন্য চিন্তা। মতিরাম বলেছিল বেলদার বাজারের কাছে এসে রিকশায় উঠবে। একটু কষ্ট হল ব্রজগোপালের। বহেরুকে দেখলে ভড়কে যাবে মতিরাম। বেঁটে মানুষ বলে তাকে কেউ পাত্তা দেয় না, ছেলেছোকরারা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে গাঁট্টা মারে, খামোখা চড় চাপড় দেয়। ওসবই মজা। কিন্তু মতিরামের জীবনটা এইসব মজায় তিতিবিরক্ত হয়ে গেছে। এখন আবার দোটানায় পড়ে বেচারার প্রায় যায়। বহেরু তাকে রাখে। তো ছেলেরা তাড়াতে চায়। তা আজ বোধ হয় মতিরামের পালানো হল না।
ওই সামনে বেলদার বাজারের বড় বটগাছটা দেখা যাচ্ছে।
ব্রজগোপাল বলেন—গাড়ির দেরি আছে নাকি রে?
বহেরু বলে—অনেক দেরি।
বটগাছের কাছে মুনিশটা রিকশা থামিয়া গামছা ঘুরিয়ে হাওয়া খায়। রিকশা চালিয়ে অভ্যাস নেই। হেদিয়ে গেছে। বলে—একটু চা মেরে আসি। গাড়ির দেরি আছে। বসেন!
বহেরু নেমে পড়েছে। ময়লা ধুতির ওপর ফরসা পিরানে তার চেহারায় পেঁয়ো ভ.বটা ফুটে উঠেছে। বলল—এই ঝ্যাঁকোর-ম্যাকোর করে রিকশায় আসতে মাজাটা ধরে গেল। হাঁটাচলা না করলে জুৎ পাচ্ছি না।
গাঁ-গঞ্জের লোকের স্বভাবই এই, কোথাও যাওয়ার তাড়া থাকে না, রাস্তায়-ঘাটে দশবার জিরোয়, দশবার চেনা লোকের খবর করে।
ব্রজগোপাল বিরক্ত হয়ে বলেন—মুনিশটাকে তাড়া দে। নইলে ঠিক গাড়ি ফেল করাবে। তারপর ঘণ্টাভর বসে থাকো পরের গাড়ির জন্য।
বহেরু হুমহাম করতে করতে মুনিশকে তাড়া দিতে গেল। ব্রজগোপাল জানেন বহেরু এখন বাজারের বিস্তর লোকের খবর করবে, বিষয়কর্মের ধান্ধা মেটাবে, তারপর আসবে।
ব্রজগোপালও রিকশা থেকে নেমে পড়েন। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রী বুড়ো রাম কবিরাজ বলেছিল গোলমরিচ দিয়ে একটা পেটের অসুখের ওষুধ তৈরি করে দেবে। বাজারের পশ্চিম ধারে তার একটা টিমটিমে দোকানঘর আছে।
একটা গোরুর গাড়ি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সামনেই। গরু দুটো গাছের সঙ্গে বাঁধা। গাড়িটা পেরিয়ে যাচ্ছিলেন ব্রজগোপাল। হঠাৎ শুনলেন মতিরামের গলা—ব্রজকর্তা!
ব্রজগোপাল একটু চমকে চারদিকে তাকালেন। দেখতে পেলেন না। বেঁটে মানুষ, কোথায় কোন আড়ালে পড়ে গেছে?
বললেন—সামনে এসো, অত ভয়ের কী?
গরুর গাড়ির চাকার আড়ালে দাঁড়িয়েছিল মতিরাম, ডাক শুনে বেরিয়ে এল। তার মুখ ঘামে জবজবে। একটু কেমনধারা কষ্টের হাসি হাসছে।
বলল—রিকশায় বহেরুকে দেখে ঘাবড়ে লুকিয়ে পড়লাম।
ব্রজগোপাল বললেন—বরং ফিরে যাও মতিরাম। মাথা ঠান্ডা করে ভাবো গে যাও। পরে না হয় বলেকয়ে যেও। পালিয়ে গেলে লোকে নানা সন্দেহ করে। তার ওপর ধরো যদি কোনও জিনিসপত্র বা টাকা পয়সা এধার-ওধার হয় তো তোমাকে চোর বলে সন্দেহ করবে। তারচেয়ে আমিই বরং বহেরুকে বলবখন, সে তোমাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেবে।
