এই বলে ব্রজগোপাল দা হাতে বেরিয়ে গোটা দুই মস্ত আখ কেটে আনেন। আগার পাতাটাতাগুলো ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে নেন। রসে টসটস করছে মিষ্টি লাঠি। তা শহুরে ছেলেরামেয়েরা এ সব তেমন পছন্দ করে না বেশি। অথচ ব্রজগোপালের যৌবন বয়সে এ সবই ছিল প্রিয়। ক্ষেত থেকে কাঁচা ছোলা গাছ থেকে এক ঝড় তুলে খোসা খুলে মুখে ফেলতে ফেলতে মাইল মাইল পার হয়ে গেছেন। এমনকী দণ্ডকলস গাছের ফুলের মধুটুকুও চুষে খেতে কত ভালবাসতেন। দেশ মাটির সঙ্গে ওইরকমভাবে বাঁধা পড়ে যেতেন গভীর মায়ায়। কলকাতায় বড় হওয়া তার ছেলেপুলেরা জীবনের এ সব মজা কখনও উপভোগ করেনি, কিছুটা করেছিল কেবল রণেন। গাছের ফুটি কিংবা মাদারফল, পানিফল কতবার দিয়ে এসেছেন কলকাতার বাসায়। কেউ খায়নি, পচে ফেলা গেছে। এই সরস আখের স্বাদও ওরা বুঝবে কি?
না বুঝুক, তবু নিজের হাতে করা এই সব ফলপাকুড় প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছে না দিয়েও পারেন না তিনি। দেওয়া নিয়ে কথা। ওরা যদি ফেলে দেয় তো দেবে।
ষষ্ঠীচরণ আর তার বাপ বিশাল ধামা ভরতি রাজ্যের পেয়ারা নিয়ে আসতেই ব্রজগোপাল রেগে উঠে বলেন—গাছশুদ্ধ পেড়ে নিয়ে এলি নাকি বোকারা?
—তাই তো বলেছেন শুনলাম। কালিপদ মাথা চুলকে বলে।
—দূর ব্যাটা! পাখিপক্ষীর জন্যও তো কিছু রাখতে হয় গাছে, না কি! তোরা বড় স্বার্থপর হয়েছিস, সব কেবল নিজে দখলাতে চাস। এরকম কৃপণ হলে তোদের সব বাড়িঘরে আর পাখিটাখিও আসতে চাইবে না, ভূতের বাড়ি হবে সব। যা, সবাইকে বিলি করে দে। আমি এত নিয়ে কী করব, গুটি দশেক বেছেছে রেখে যা। যাদের জন্য নিয়ে যাই তারা এ সব আদর করে খাবে কিনা কে জানে!
ব্রজগোপাল পোঁটলাপুঁটলি বেঁধে তৈরি হচ্ছিলেন। সেদ্ধ ভাত খেয়ে নিয়েছেন এক চিমটি। হাতেকাচা পরিষ্কার ধুতি পরেছেন, ফতুয়ার ওপর পাঞ্জাবিটা চাপাবেন কেবল, এই সময়ে বহেরু এসে রাগারাগি শুরু করল—কর্তা, এই শরীর নিয়ে বেরোচ্ছেন, ভালমন্দ কিছু হলে তখন সবাই বলবে, বহেরু কর্তাকে দেখেনি। এই তো সেদিনও বুকের ব্যথাটা উঠল আপনার।
সত্য বটে, কদিন আগেও ব্যথাটা উঠেছিল। সেদিনও শীলার ছেলের নামটা দিয়ে আসবেন বলে একটা পরিষ্কার কাগজের উপরে ঠাকুরের নাম লিখে, নাতির নামটা গোটা গোটা অক্ষরে মাঝখানে লিখেছিলেন। কোষ্ঠীর ছকটাও করেছিলেন সেই সঙ্গে। কোষ্ঠীপত্র তৈরি করতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। ছকটা বিচার করেও একটু ভাবনায় পড়েছিলেন। নাতিটার ভবিষ্যৎ খারাপ নয়, কিন্তু ছবছর বয়স থেকে কেতুর দশা পড়বে, তখন ভোগাবে। এ সব বিষয়ে আগে থেকেই শীলাকে সতর্ক করে আসাও দরকার।
সেদিড়ও এরকম তৈরি হয়ে বেরোবার মুখে হঠাৎ যেন একখানা ভারী দৈত্যের হাত এসে বুকটাকে চেপে ধরল। সে কি শ্বাসকষ্ট, ব্যথা। সেই হাতটাই তাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল বিছানায়। দিন চারেক উঠতে দেয়নি। যাদের কাছে কলকাতায় যাচ্ছেন, তারা জানেও না। জানার চেষ্টাও নেই।
ব্রজগোপাল একটু গম্ভীর হয়ে বলেন—শুয়ে মরার চেয়ে হেঁটে মরা ভাল। যা তো এখন, দিক করিস না। আমার কোনওখানে যাওয়ার নাম হলেই তোর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
বহেরু খুব কূট চক্ষে চেয়ে আছে। মনে মনে নানারকম প্যাচ কষছে, যাতে ব্রজঠাকুরকে আটকানো যায়, এটা ওর মুখ দেখেই বুঝতে পারেন ব্রজগোপাল। তবে চাষাড়ে মাথায় বেশি বুদ্ধি খেলে না। তাই কিছুক্ষণ ভেবে হাল ছেড়ে দিয়ে বলে—তবে যান, আমাদের ওপর তো আপনার মায়া নাই। মানুষ না কি আমরা!
ব্রজগোপাল মৃদু হাসেন। বহেরু অভিমান করে চলে যায়। অত বড় মানুষটার অভিমানী মুখ দেখলে মজা লাগে।
গাড়ির এখনও ঢের দেরি আছে। কদিন হল বহেরু একটা ঝকঝকে রিকশা কিনেছে। খুব বাহারি রিকশা। তার হুড-এ নানারকম রঙিন কাপড়ের ফ্রিল লাগান। বেলদার সাইনবোর্ড লিখিয়ে অম্বিকাচরণ নানা রঙের আঁকিবুকি নকশা করে দিয়েছে গায়ে। রিকশার পিছনে একটা আকাশের গায়ে বক উড়ে যাওয়ার ছবি এঁকে তলায় লিখে দিয়েছে—পথবান্ধব, বহেরু গ্রাম। সেই রিকশাটা এনে দরকারমতো ব্যবহার করে এখানকার লোকেরা, কে চালায় তার ঠিক নেই। কখনও কোকা বা কপিল, কখনও কোনও মুনিশ কিংবা কালিপদ। আজকাল ওই রিকশাতেই স্টেশনে বেশ যাওয়া চলে। অবশ্য ব্রজগোপাল হাঁটতেই ভালবাসেন। কিন্তু বহেরু হাঁটতে দেয় না। ডাক্তারের বারণ।
কিছুক্ষণ বাদে রিকশাটা এসে দরজার সামনে ঘণ্টি মারে। মুনিশটা সিট থেকে নেমে এসে জানান দিয়ে যায় যে, রিকশা তৈরি আছে। ব্যাগ আর একটা পোটলা নিয়ে গিয়ে রিকশায় তুলে রাখে।
ঠাকুরের ছবির কাছে একটি সর্বাঙ্গীণ প্রণাম করলেন ব্রজগোপাল। প্রণাম রোজই করেন, কিন্তু প্রণাম কি আর রোজ হয়? মাথা নিচু হয় বটে, কিন্তু মনটা তার সর্বস্ব নিয়ে ওই পায়ে ঢেউয়ের মতো ভেঙে পড়ে না তো! দেহ প্রণাম করে তো মনটা আলগা আনমনা হয়ে সরে বসে থাকে। সংসারী মানুষের এ বড় বাধা। যদিও সংসার বলতে কিছুই নেই তাঁর। তবু মনের মধ্যে কেবলই এক সংসারের ছায়া ঢুকে বাস করে। কত কী চিন্তা আসে, কত উদ্বেগ, কত দখলসত্ত্ব, কত অভিমান ও ক্ষোভ আজও মনের মধ্যে ইঁদুরের গর্তের মতো রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গেছে। সবাইকে পরিপূর্ণ ক্ষমা করে নেওয়া হল না আজও। এখনও কত পাওনাগণ্ডা যেন আদায় হয়নি, কত প্রতিশোধ নেওয়া হয়নি, কত ঋণ শোধ করেনি লোকে। এই সবই বাধা হয়ে দাঁড়ায়, পিছুটান প্রণামকে প্রণাম হতে দেয় না। আজ বহুকাল বাদে একটা সুন্দর প্রণাম হল। যখন মাথা নিচু করলেন তখন যেন তার সঙ্গে পূর্ণ জগৎটাও ঝুঁকে পড়ল ঠাকুরের পায়ের উপর। ঢেউ উঠে ভিজিয়ে দিল তাঁর পা।
