—তোরা মেয়ে নাকি? শাড়িপরা পুরুষ।
—মারব। বলে অপালা ফের চিমটি দেয়।
সোমেন ‘উঃ’ করে ওঠে।
ছবির পরদায় তখন এক সাহেব এক মেমসাহেবকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। হলসুদ্ধ লোক শ্বাস বন্ধ করে আছে। চুমুর পর মেমসাহেব হঠাৎ রেগে গিয়ে সাহেবের গালে একটা চড় মারল।
—ওইরকম একটা থাপ্পড় তোর গালে দিতে পারলে—অপালা বলে।
—থাপ্পড়ের আগেরটা কী হবে?
—কী বলছে রে? পূর্বা মুখ এগিয়ে জিজ্ঞেস করে।
—ওই একটু আগে যা হল তাই চাইছে। অপালা বলে।
—থাপ্পড় দে না।
—দেব, ছবিটা শেষ হোক।
ছবিটা টপ করেই শেষ হয়ে গেল। বাইরের লবিতে বেরিয়ে এসে অনিল রায় পাইপ ধরালেন। তামাকের ধোঁয়ার সঙ্গে অ্যালকোহলের গন্ধ পাওয়া গেল। বললেন—ওঃ সোমেন, তোমার কাছে একটা ক্ষমাপ্রার্থনা বাকি আছে।
—কেন স্যার?
—একদিন তুমি আমার বাড়ি গিয়েছিলে। আমি তোমার সঙ্গে রিয়্যাল খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। আই ওয়াজ ড্রাঙ্ক।
—ও কিছু না স্যার। আমি ভুলে গেছি।
—না, না। আমি সত্যিই খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। ইদানীং মাত্রাটা বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছিল। একা-একা বড্ড ফাঁকা লাগত তো! আমার আবার খানিকটা ভূতেরও ভয়ও আছে।
—বলেন কী? বলে সোমেন অবাক।
—সত্যি স্যার? বলে চেঁচিয়ে ওঠে পূর্বা। অপালাও চেঁচায়।
—আস্তে। অনিল রায় বলেন—সবাই শুনতে পাবে। আমার ভূতের ভয়ের ব্যাপারটার বেশি পাবলিসিটি দিয়ো না। চলো রেস্টুরেন্টে বসে বলছি।
দঙ্গলটা পার্ক স্ট্রিটের দিকেই এগোয়। আগে আগে শ্যামল আর মিহির বোস। বোধ হয় আগামী নাটকের ব্যাপার নিয়ে ওরা খুব উদ্বিগ্ন আর মগ্ন হয়ে কথা বলতে বলতে দলছুট হয়ে হাঁটছে। একটু পিছনে অনিল রায়ের দুপাশে সোমেন আর অপালা, পিছনে ম্লানমুখ অণিমা, সেই অচেনা মেয়েটি, পূর্বা। মেয়েটাকে লক্ষ্য করল সোমেন। সুন্দরী নয়, রোগা বেঁটে। তবে বয়স খুব অল্প। কুড়ি বাইশের মধ্যেই মুখখানায় খুব একটা হাসিখুশি আনন্দের ভাব। গেঁয়ো বলে মনে হয়।
অনিল রায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে বললেন—বাই দি ওয়ে। অপালা সোমেনকে কি আর রহস্যের মধ্যে রাখা ঠিক হচ্ছে? ও হয়তো এ দলে একটি নবাগতাকে দেখে খানিকটা বিমূঢ় না কি যেন বলে হয়ে আছে। না?
—না স্যার, ওকে বলবেন না। চেঁচিয়ে ওঠে অপালা—ওর কাছ থেকে আগে খাওয়া আদায় করি তারপর বলব।
অনিল রায় স্মিত হেসে বললেন—খুব তো খাওয়া খাওয়া করো, কিন্তু খাওয়ার সময়ে তো দেখি সব পাখির আহার। তোমাদের তো আবার ডায়েট কন্ট্রোল না কি ছাই যেন আছে, তবে অত খাওয়ার আওয়াজ কেন?
—সোমেনটা হাড় কিপটে স্যার, খরচ করে না। অপালা বলে।
—থাকলে তো করব। সোমেন মৃদু হাসি হেসে বলে—দেখছিস তো চাকরি নেই।
—চাকরি হলেই বুঝি খাওয়াবি?
—সোমেন চাপা গলায় বলে—আমারটা তো তুই-ই সারাজীবন খাবি বাবা!
—ইস, কী অসভ্য স্যার, দেখুন সোমেন আমাকে অসভ্য কথা বলছে! অপালা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে।
—বলেছ সোমেন? অনিল রায় স্মিত হেসে জিজ্ঞেস করেন।
—না স্যার, যা বলেছি তা ওর বাপের জন্মে ওকে কেউ বলেনি। অসভ্য কথা! এঃ। বলে সোমেন মুখ ভেঙিয়ে বলল—কেউ বলবে না, ওই মিহির বোসও না। এই শৰ্মাই বলল। যখন কেউ জুটবে না তখন এসে আমার দোরগোড়ায় বসে কাঁদবি।
—বয়ে গেছে। কাকের ঠোঁটে কমলালেবু! শখ কত!
—আমি কাক? তুই কমলালেবু? শুনুন স্যার, কত বড় আস্পর্দা!
অনিল রায় হাত তুলে দুজনকে থামান। বলেন—তুমি কি অপালাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলে সোমেন?
সোমেন মাথা চুলকে বলে—ঠিক তা নয় স্যার।
—এর আগেও যেন কয়েকবার তুমি কাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছ বলে শুনেছি। ওটাই কি তোমার ‘হবি’ নাকি?
সোমেন ম্লান মুখ করে বলল—কেউ রাজি হয় না স্যার, তাই সবাইকে বাজিয়ে দেখছি। যদি কেউ রাজি হয়ে যায়! বান্ধবীরা সব এসে একে খসে পড়ছে। এরপর আর কে থাকবে।
অনিল রায় অন্যমনস্ক হয়ে বলেন—তাও বটে। আমিও অনেককে দিয়েছিলাম প্রস্তাব। কিন্তু আমি বড় ফান্টুস টাইপের ছেলে ছিলাম বলে কেউ রাজি হত না। তোমার অবশ্য অন্য প্রবলেম, কাউকেই বোধ হয় কনভিনসড করাতে পারছ না যে তোমারও ভবিষ্যৎ আছে!
—ঠিক স্যার।
অনিল রায় উদার কণ্ঠে বললেন—অপালা, বি জেনেরাস। ওর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাও। যদি বোঝো ও সত্যিই অপদার্থ তা হলে বরং পরে একটা ডিভোর্স করে নিয়ো।
অপালা গম্ভীর মুখ করে বলে—শুভদৃষ্টির সময়ে ওকে দেখলেই যে আমার হাসি পাবে!
—হেসো। তবু রাজি হয়ে যাও।
—ভেবে দেখি স্যার। অপালা গম্ভীর মুখে বলে—না হয় একটা জীবন আত্মত্যাগ করেই কাটবে।
সোমেন চোখ তাকিয়ে বলে—এঃ, আত্মত্যাগ!
অপালা চোখ গোল করে বলল—তারচেয়েও বেশি। প্রাণত্যাগও করতে হতে পারে। তোকে বিয়ে করে শেষ পর্যন্ত সুইসাইড না করতে হয়।
পূর্বা পিছন থেকে করুণ স্বরে ডাকছিল—স্যার, স্যার, আপনারা কোথায়? এঃ মা, আমি কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।
এসপ্ল্যানেডের অফিস-ভাঙা ভিড়ের শব্দের মধ্যে ডাকটা খুব ক্ষীণ হয়ে সকলের কানে পৌঁছায়। ফুটপাথে নাচুনি পুতুল দেখে কিনতে বসে গিয়েছিল পূর্বা। পিছিয়ে পড়েছে।
সোমেন গিয়ে তাকে ধরে আনতে আনতে অনিল রায়কে বলে—এদের সব সময়ে একজন করে গাইড দরকার। তবু ছাড়া গরুর মতো ঘুরবে, কাউকে অ্যাকসেপ্ট করবে না।
পার্ক স্ট্রিটের দারুণ একটা রেস্তোরাঁয় সবাই এসে বসে হাঁপাচ্ছিল। অনেক দূর হাঁটা হয়েছে।
