অচেনা মেয়েটি আর অনিল রায় পাশাপাশি।
অনিল রায় জিজ্ঞেস করেন—কেউ ড্রিঙ্কস নেবে?
সোমেন মাথা নাড়ল। নেবে না। শ্যামল আর মিহির প্রায় একসঙ্গে বলল—জিন।
সেই রহস্যময়ী মেয়েটি বলল—আবার খাচ্ছো কেন?
অনিল রায় বললেন—খাচ্ছি কোথায়? এ ঠিক মদ্য পান নয়। জাস্ট অ্যাপেটাইজার।
মেয়েটা মুখটা একটু বিকৃত করে বলে—বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছে। রাতে তো বাসায় খাবার খেতেই পারো না।
সোমেন হঠাৎ হেসে বলল—স্যার, আমি কিন্তু বলতে পারি উনি কে!
—কে বলো তো!
—নতুন মিসেস রায়।
—অপালা বলল—আহা! কী বুদ্ধি তোর!
—কী ভীষণ বোকা রে বাবা! বুঝতে এত সময় লাগল? পূর্বা বলে।
—ঠিক বলেছি স্যার? সোমেন একটু বোকা-হাসি হেসে জিজ্ঞেস করে।
অনিল রায় একটু ভেবে বলেন—ঠিক! হ্যাঁ সেন্ট পারসেন্ট। এ হচ্ছে আমার স্ত্রী মিলু রায়। আর এই হচ্ছে সোমেন লাহিড়ি।
সোমেনের মনে হল অনিল রায় একটা অদ্ভুত বিয়ে করেছেন। বয়সে মেয়েটি প্রায় অর্ধেক, দেখতেও তেমন কিছু নয়। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করার মতো। মেয়েটি বেশি সাজেনি। নতুন বউরা যেমন সাজে মোটেই সেরকম নয়। একটা হালকা ক্রিম রঙা শাড়ি পরেছে, মুখে প্রসাধন নেই, একটা এলো খোঁপায় চুল বাঁধা, বেশি সাজলে তাকে ভাল দেখাত না। একটু অহংকারী মেয়েটি। নমস্কার করে একটু হাসল মাত্র। কথা বলল না।
অনিল রায় বললেন—তুমি কিছু নিলে না সোমেন? একটু জিনও নয়!
—বড্ড মাথা ধরে স্যার।
—একটু বেশি করে খাও, সেরে যাবে। নাহলে বরং হুইস্কি নিতে পারো।
সোমেন একটু দ্বিধা করে বলল—আচ্ছা, একটু খাই।
সোমেনের ডান ধারে ম্লানমুখী অণিমা বসেছে। আজ বিকেলে সে প্রায় কথাই বলছে না! অনেকক্ষণ ধরে তাকে লক্ষ্য করছে সোমেন। বুকটা মাঝে মাঝে শূন্য লাগছে।
হঠাৎ অণিমা সোমেনকে কনুই দিয়ে অল্প একটু ধাক্কা দিল।
সোমেন প্রথমে বুঝতে পারেনি। তাই একটু সরে বসে। তারপর নির্ভুল টেবিলের তলায় অণিমার হাত সোমেনের হাঁটু স্পর্শ করে। অণিমা প্রায় শ্বাসবায়ুর শব্দে সোমেনের দিকে না ফিরে বলে—খেয়ো না।
সোমেন ফের দ্বিধায় পড়ে। মদ খেতে বারণ করছে নাকি অণিমা? একবার মুখ ফিরিয়ে নতমুখী ও লাজুক মুখখানা দেখে নেয় সোমেন। অণিমা খুব গম্ভীর, মুখে ভ্রূকুটি।
সোমেনও আস্তে করে বলে—খাবো না।
—না।
—কেন?
—কেন আবার! আমি বলছি তাই খাবে না।
সোমেন সামান্য হাসল। বুকের মধ্যে, মনের মধ্যে আজও কেন যে একটা থেমে যাওয়া ঝড় জেগে ওঠে।
সোমেন বলে—আচ্ছা।
বেয়ারা সোমেনের সামনে হুইস্কির গেলাস রেখে গেল। সোমেন সেটা হাতে নিল, দেখল, রেখে দিল আবার। বলল—স্যার, ভূতের গল্পটা বলবেন না?
—ও! হ্যাঁ! বলে হাসলেন অনিল রায়। বললেন—কে বিশ্বাস করবে বলো যে আমার ভীষণ ভূতের ভয় আছে! খুব ছেলেবেলা থেকেই ছিল অবশ্য, কিন্তু ইদানীং সেটা খুব বেড়েছিল। কাউকে বোলো না।
—না স্যার।
—সেদিন রাতে শুয়েছি, বেশ নেশা ছিল, তবু কেন যেন ঘুম আসছিল না। যতবার ঘুমোই ততবার চটকা ভেঙে যায়। কে যেন জাগিয়ে দিচ্ছে। চাকরটার বাড়িতে অসুখ বলে একবেলার ছুটি নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেও রাতে ফেরেনি। বার বার জেগে উঠে কান পেতে শুনছি যদি চাকরটা রাতের শেষ গাড়িতেও আসে বারুইপুর থেকে। একদম একা একাটা ফ্ল্যাটে আমি, এটা ভাবতেই ভারী গা ছমছম করে। খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরে, বেশ ভূতুড়ে দেখাচ্ছে সবকিছু। খুব নিস্তব্ধও চারদিক। এক-একবার চোখ খুলে ঘরটার আলোছায়া দেখি। ফের চোখ বুজে ফেলি ভয়ে। পাছে কিছু দেখা দেয়! এরকম কয়েকবার হল। বালিশের কাছেই রিভলভার থাকে, সেটা হাতে নিয়ে শুয়ে রইলাম। আবার ভয়ও করছে, যদি ওটা হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ি তো ঘুমের মধ্যে ট্রিগারে চাপ দিলে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে। কিন্তু কী করি! জেগে চোখ বুজে রিভলভার হাতে শুয়ে আছি। এমন সময়ে ঠিক একটা টরেটক্কার মতো শব্দ পেলাম। না, শব্দটা বাইরে কোথাও নয়, আমার মাথার মধ্যে, বুকের মধ্যেই কোথাও হচ্ছিল। সে খুব নিস্তব্ধ শব্দ। যেন আমাকে চোখ খুলতে বলছে। একবার চোখ চাইলাম। ফাঁকা ঘর। কিন্তু মনে হল, কে যেন এসেছে। সে এসে বসল আমার বিছানার একটা ধারেই। আমি রিভলভারটা তুললাম। ফের সেই টরেটক্কার ভাষা শুনলাম, অস্ত্র নামাও। নামালাম। যে এসেছে সে আমার দিকে চেয়ে আছে। তাকে দেখতে পাচ্ছি না। ঘরে শুধু ভূতুড়ে চাঁদের আবছা আলো। খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম—কে? ফের সেই টরেটক্কা বলল—তোমার একাকীত্ব। আজ রাতে সেই একাকীত্বের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে।
সবাই হেসে ওঠে।
অনিল রায় হাসলেন না। হাত তুলে বললেন—শোনাই না। খুব সিরিয়াস ব্যাপার।
॥ সাতষট্টি ॥
অনিল রায় বড় চট করে মাতাল হয়ে যান।
টপাটপ চার পাঁচ পেগ খেয়ে আজও গেলেন। গেলাস রেখে বললেন—কী যেন বলছিলাম! একটা ভূতের কথা না!
—হ্যাঁ স্যার। সোমেন বলে।
অনিল রায় সামান্য ভ্রূ কুঁচকে ভেবে নিয়ে বলেন—খুব অদ্ভুত। পরিষ্কার সেই ভূতটাকে টের পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি না। ভয়ে পাগল হয়ে যাই আর কী! ভীষণ ভূতের ভয় আমার। তো ভূতটাকে টের পেয়েই আমি ভর ভরতি রিভলভার থেকে গুলি ছুঁড়তে থাকি। চেম্বার খালি হয়ে গেল, সটাক সটাক বুলেট বেরিয়ে আমার ক্যাবিনেট ফুটো করছে, দেওয়ালের ছবি ভাঙছে, শার্শি চৌচির করছে, চুনবালি খসাচ্ছে—সব টের পাচ্ছি। আর নিস্তব্ধতার মধ্যেই এক নিঃশব্দ হা-হা হাসি টের পাচ্ছি। আমার পিস্তলের গুলিতে তার কোনও রি-অ্যাকশনই হল না। কলকাতায় সব সময়ে বোমা বন্দুকের শব্দ হয় বলে লোকে গা করে না, তাই প্রতিবেশীরাও কেউ দৌড়ে আসেনি। সে যে কী ভয়ংকর অবস্থা! আমার একটা খাওয়ার টেবিল আছে, পুরনো। এক সাহেবের কাছ থেকে সেটা কিনেছিলাম। আসল মেহগিনী। সেই টেবিলটাকে আমার বরাবর কিছু ভয় ছিল। সন্দেহ হয়, সেই টেবিলটার সঙ্গে এক মেমসাহেবের আত্মার কিছু যোগাযোগ আছে। সোমেন, তুমি মুখ লুকিয়ে হাসলে নাকি?
