সোমেন কথা বলতে পারল না। নিঃশব্দে উঠে এল।
ঝকঝকে শেভারটা নিয়ে যখন নিজের ঘরে দাড়ি কামাতে বসেছে, তখন কী জানি কেন তার দুচোখ ভরে জল এল। উঁচু নিচু, অসমান হয়ে গেল তার প্রতিবিম্ব। আবছায়ায় কাঁপতে লাগল। ভাবল, দাড়িটা কামাবে না আজ। থাক। সিনেমায় যাবে না।
এক গালে সাবান লাগানো হয়ে গিয়েছিল। সেটা গামছায় মুছে ফেলল সোমেন। শেভারটা দাদার ঘরে রেখে এল। সিগারেট খেতে লাগল শুয়ে শুয়ে। আর ঠ্যাং নাচাল। বাস্তবিক সে না ভেবেচিন্তে বলেছে ও কথাটা সত্যিই তো দাদার অসুখের জন্য তার তেমন মাথাব্যথা নেই। সে কেমন দিব্যি আছে, খাচ্ছেদাচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন দাদার সব দায় বউদিরই। আর কারও নয়। মাঝে মাঝে দাদার কথা মনে করে কষ্ট হয় বটে। কিন্তু যৌবনের নানা দিকের ডাক এসে সব ভুলিয়ে দেয়। এবার এখন থেকে সে দাদার কথা একবু বেশি ভাববে।
খাওয়ার পর দুপুরে শুতে গিয়ে সোমেন মার সঙ্গে ঝগড়া করল। বলল—বউদি ঠিক বলে। আমরা কেউ দাদার জন্য কিছু করছি না। দাদার জন্য আমাদের একটুও সিমপ্যাথি নেই। একা বউদি কত দিক সামলাবে?
শুনে ননীবালা অবাক। বলেন—বলিস কী! কে ভাবছে না? দিনরাত ঠাকুরের কাছে মাথা কুটছি। এই সেদিন গোবিন্দপুর নিয়ে গেলাম। ফকিরবাবার ওধুধ খাইয়ে আনলাম। তোর বাবা কোষ্ঠী বিচার করল ভাল করে। ওর এ সময়টা ভাল নয়, বলে দিল। ভাবছি না বললেই হল!
সোমেন খুশি হল না। বলল—আমি তো শুনি কেবল বাড়ি-বাড়ি আর টাকা-টাকা করছ দিনরাত। দাদার কথা ভাবলে কখন?
ননীবালা বলেন—তা বাড়ি বা টাকাই কি ফ্যালনা নাকি! সংসারে থাকতে গেলে নিজের একটা কুঁড়েঘর হলেও লাগে। সে হল সংসারের স্থিতু: লক্ষ্মীর থান। আর টাকার জোরেই মানুষ চলে, বড় হয়।
—তত্ত্ব কথা রাখো তো মা। সংসারের সবকিছুই মানুষের জন্য। মানুষটাই যদি কষ্ট পায় তো ওসব দিয়ে কী হবে!
—ছাই ভগবান। বলে উঠে পড়ল সোমেন। প্রায় আড়াইটা বাজে। ঘরে থাকলে আরও মাথা গরম হবে। পোশাক পরতে পরতে বলল—আমার আর এসব ভাল লাগে না। সংসারের কথা শুনলেই মাথা গরম হয়ে যায়।
ননীবালা একটু নরম হয়ে বলেন—তো করবি কী? সংসারে থাকতে গেলেই একটু ভালমন্দ শুনতে হয়।
—আমার শুনতে বয়ে গেছে। আমি পালাচ্ছি শিগগিরই। আমেরিকায় গিয়ে আর খোঁজও নেব না, দেখো।
ননীবালার হতবাক ভাবটা তখনও যায়নি, সোমেন আর ভেঙে কিছু বলল না। বেরিয়ে গেল।
সিনেমায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু রাস্তায় বেরোনোর পর গরম মাথাটা টপ করে ঠান্ডা হয়ে গেল। আর তখন ভূতগ্রস্তের মতো তাকে সিনেমার টিকিটটা টানতে লাগল।
মেট্রোর তলায় যখন পৌঁছল সসামেন তখন তিনটে বাজতে মিনিট পাঁচেকও নেই। লবিতে বহু লোক দাঁড়িয়ে। একটা চেনামুখ দেখা গেল না। তবু যে টিকিট পাঠিয়েছে তার জন্য একটু দাঁড়ায় সোমেন। হয়তো এখনও আসেনি। নিউজরিলের পরে ঢুকলেও ক্ষতি নেই।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও যখন কেউ এল না তখন হল-এ ঢুকল সোমেন। অন্ধকারে টর্চ বাতি এসে পড়ল তার গায়ে। অচেনা হাত এসে টিকিট নিল। পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল রো-এর কাছে। প্রথম সিটটাই তার। পরদার প্রতিফলিত আলোয় সে পাশে-বসা মেয়েটাকে দেখবার চেষ্টা করল। বাইরের আলো থেকে অন্ধকারে এসে চোখ ধাঁধিয়ে আছে। ঠিক দেখতে পেল না।
বসবার পর হঠাৎ নরম, আলতো একটা হাত এসে তার হাতের ওপর চাপ দিল। মেয়েলি হাত।
॥ ছেষট্টি ॥
নরম হাতটা তার হাত ওইভাবে স্পর্শ করেই সরে গেল। সোমেন একটু অবাক হয়ে তাকায় পাশের মহিলার দিকে। আর তখনই পাশাপাশি সিটে বসা পাঁচ-ছজনের মধ্যে একটা চাপা হাসি খেলে যায়।
ওপাশের কে একজন বলে—আহা বেচারা! কত কী ভেবে এসেছিল!
আবছায়ায় পাশে-বসা অপালাকে তখন চিনতে পারে সোমেন। ভীষণ সেজেছে তাই চিনতে পারছিল না এতক্ষণ। তার ওপাশে পূর্বা, অণিমা, একটা অচেনা মেয়ে, তারপর অনিল রায়, তার ওপাশে শ্যামল আর মিহির বোস।
—জানতাম তোরাই। সোমেন নিস্পৃহ গলায় বলে।
—আহা জানতিস! বলে অপালা একটা চিমটি দিল সোমেনের উরুতে। পূর্বার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল—ও নাকি জানত! শুনলি!
—গাঁট্টা মার না। বলে পূর্বা।
অণিমা কিছু বলল না। একবার কেবল আবছায়ায় মুখ ফিরিয়ে দেখল। অণিমার পাশেই অচেনা মেয়েটি। সেইখানেই একটু রহস্য থেকে গেল। কে মেয়েটা?
সিনেমাটা ভালই। দেখতে দেখতে সোমেন রহস্য ভুলে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে কেবল অপালার চিমটি টের পাচ্ছিল। একবার চাপা গলায় বলল—বডড জ্বালাচ্ছিস তো। যা ওপাশে গিয়ে পূর্বাকে আমার পাশে দে।
—ইল্লি। তোমাকে প্ল্যান করেই এখানে বসানো হয়েছে বাবু। আমার পাশেই থাকতে হবে।
সোমেন চাপা গলায় বলে—ভাগ্যিস চিরকাল পাশে থাকতে হবে না।
—হবে না কে বলল? হতেও তো পারে!
—মিহির বোস তা হলে আমাকে আস্ত রাখবে?
পূর্বা খুক করে হেসে ফেলল। আশপাশের লোকেরা বিরক্ত হচ্ছে। অনিল রায় ওপাশ থেকে একবার বললেন—চুপ।
—মেয়েটা কে রে? সোমেন খানিক বাদে জিজ্ঞেস করে।
—হবে কেউ। তোর দরকার কী তাতে?
—কৌতূহল।
—ইঃ। যদি একদিন পার্ক স্ট্রিটে খাওয়াস তা হলে বলব।
—খাওয়াব।
—বলে যদি না খাওয়াস?
—ওয়ার্ড ইজ ওয়ার্ড। সোমেন বলে।
অপালা একটা শ্বাস ফেলে বলল—বটে! এত কৌতূহল? হ্যাংলাও বটে তুই! আমরা এতগুলো মেয়ে পাশে থাকতেও ওই একজনের কথা জানতেই হবে!
