—জমির দলিল! একটু অবাক হয়ে সোমেন বলে—না তো। বললাম যে শেভিং সেটটা!
—ও! বলে রণেন উদাস হয়ে বলল—আমার কাছে নেই। তোর বউদিকে জিজ্ঞেস করিস।
—না হলেও চলবে। বলে একবার গালে হাত বোলায় সোমেন, বলে—না হয় বেরনোর সময়ে সেলুনে কামিয়ে নেব।
—তুই কী করিস আজকাল? রণেন যেন খানিকটা জবাবদিহি চাইবার মতো করে বলে—শুধু ঘুরে বেড়াস?
সোমেন দাদার দিকে তাকিয়ে থাকে। দুপুরে রোদে ঘোরা শরীরটা তেতে আছে। মাথাও গরম। একটু চুপ করে থেকে বলল—কিছুই করি না। কী করব বল?
খুব বিরক্তির সঙ্গে রণেন বলে—এতগুলো ইন্টারভিউ আর রিটন টেস্ট দিলি, কিছু হয় না কেন? সকলের হয়, তোর হয় না?
সকলের হয় না, কারও কারও হয়। এ সত্য রণেনও জানে। তবু তার মুখে একথা শুনে বিস্মিত সোমেন বলে—না হলে কী করব?
—কিছু তো করতেও হবে। বসে থাকা কি ভাল? নানারকম বদ দোষ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তোকে যে আই এ এস দিতে বলেছিলাম।
বদ দোষ কথাটা কানে খট করে লাগল। তবু মাথাটা স্থির রেখে সোমেন বলে—সে সব আমার দ্বারা হবে না। কম্পিটিটিভ পরীক্ষা কি সকলের দ্বারা হয়? তা ছাড়া বয়সও বোধ হয় নেই।
রণেন চশমাটা খুলে তার দিকে গম্ভীর চোখে চেয়ে বলে—তোর বয়স কত হল যেন?
—পঁচিশ-টচিশ হবে। ভাসা ভাসা উত্তর দেয় সোমেন। সঠিক উত্তর দিলে যদি আই এ এস পরীক্ষাটা আবার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয় দাদা!
—পঁচিশ! বলে রণেন ভাবনায় পড়ে—তোরও পঁচিশ হয়ে গেল? অনেক বয়স হল তো তোর। সেদিনও ছোট্ট ছিলি। আমার তা হলে কত হল? মাকে একবার জিজ্ঞেস করে আয় তো।
—জিজ্ঞেস করার দরকার কী? তুমি আমার চেয়ে কত বছরের বড় সেটা হিসেব করলেই তো হয়।
—তোর কি সার্টিফিকেটে বয়স বাড়ানো আছে?
—না তো! বরঞ্চ কমানো আছে বোধ হয়।
রণেন অবাক হয়ে বলে—তাই বা হয় কী করে! সার্টিফিকেটেও তো বয়স বেশি বা কম থাকবার কথা নয়। বাবা নিজে ইস্কুলে ভরতি করে দিয়ে এসেছিলেন। বাবা তো আর বয়স ভাঁড়ানোর লোক নয়। তোর সার্টিফিকেটটা একটু দেখিস তো, ওইটেতেই ঠিক বয়স আছে। আচ্ছা দাঁড়া—
বলে রণেন উঠে খাটের তলা থেকে একটা পুরননা কব্জাভাঙা তোরঙ্গ টেনে আনল। তার ভিতরে গুচ্ছের পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটে কয়েকটা পাকানো কোষ্ঠীপত্র বের করে আনল। খুলে খুলে দেখতে লাগল।
মাথা নেড়ে বলল—তোরটা নেই। আমারটাও দেখছি না। মাকে একটু জিজ্ঞেস করিস তো কোথাও রেখেছে কিনা।
—করব।
—এত বয়স হওয়ার কথা তো তোর নয়। পঁচিশ। বলিস কী? তা হলে আমি কি চল্লিশ পার হলাম নাকি? তোরঙ্গটা খাটের তলায় ঠেলে দিয়ে রণেন খাটে উঠে বসে বলল— এখানে বোস।
সোমেন বসে। কিন্তু রণেন কিছু বলে না। কেবল অন্যমনস্কভাবে কী ভাবতে ভাবতে বিষণ্ণমুখে আঙুল মটকাতে থাকে।
এ সময়ে স্নান করে বউদি ঘরে আসে। শায়া ব্লাউজের ওপর শাড়িটা ভার করে পরা হয়নি, স্তূপ করে ধরে রেখেছে। চুলে গামছা জড়ানো। সেটা খুলতে খুলতে বলল—যাও তো, বাথরুম খালি আছে এখন, তাড়াতাড়ি স্নান সেরে এস। আমি ঠাকুরকে ফুলজল দিই।
রণেন সে কথায় কান না দিয়ে খুব অসহায়ভাবে বীণাকে বলে—সোমেন বলছে ওর বয়স না কি পঁচিশ!
বীণা একটু ভ্রূ ভঙ্গি করে বলে—পঁচিশ! যাঃ বলে আয়নার সামনে দাড়িয়ে মুখে কোল্ড ক্রিম মাখতে মাখতে বলে—বাইশ-তেইশ হবে বড়জোর।।
সোমেন বলল—বাঃ রে, তুমিই তো সেদিন হিসেব করে বললে আমার চব্বিশ পূর্ণ হয়ে পঁচিশ—
আয়নার ভিতর দিয়ে বীণা তাকে চোখ টিপে একটা ইশারা করল।
রণেন খুব টালুমালু চোখে এদিক-ওদিক চাইছিল। বলল—পঁচিশ হলে আমারও তো অনেক হয়ে গেল। ওর চেয়ে আমি বয়সে—
বীণা ধমক দিয়ে বলল—স্নান করতে যাবে না কি! তোমার আদুরে মেয়ে বাথরুমে ঢুকলে কিন্তু একটি ঘণ্টা। সে আজকাল খুব সাজুনী হয়েছে। যাও।
—যাচ্ছি। রণেন বলে—তুই যেন কি খুঁজছিলি সোমেন?
—তোমার রেজারটা।
—আমার রেজারটা ওকে দাও তো। বলে কী যেন বিড়বিড় করতে করতে রণেন উঠে যায়।
বউদি ড্রেসিং টেবিলের আয়নার পিছন দিক থেকে শেভিং সেটটা বের করে দিয়ে বলে—ওর সামনে বয়সটয়সের কথা কখনও তুলো না। বয়স হওয়াকে ও ভীষণ ভয় পায়। কেবল মৃত্যুচিন্তা করে তো, তাই বয়সকে ভয়।
সোমেন আলটপকা কিছু না ভেবেই বলে ফেলল—দাদাকে বাবার কাছে পাঠিয়ে দাও না। বাবা মন্ত্র-টন্ত্র দিলে ভাল হয়ে যেতে পারে।
বীণা একবার মুখটা ফেরাল। ভ্রূ কুঁচকে একটু তাকে দেখে মুখঠা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল— সোমেন, শ্বশুরমশাই তাঁর গুরুর মন্ত্র বিলিয়ে বেড়ান। অনেকে তাঁকে বিশ্বাসও করে। এসব আমি জানি। কিন্তু তুমি কি তাঁর মন্ত্রে বিশ্বাস করো? কিংবা তাঁর আদর্শে? ঠিক করে বলো তো!
সোমেন একটু লজ্জা পেয়ে বলে, ঠিক ভেবে দেখিনি। তবে থাকতেও পারে কিছু।
আয়নাতেও বীণার কোঁচকানো ভ্রূ দেখা যাচ্ছিল, বলল—তা হলে ওরকম বললে কেন? আজকাল সবাই না ভেবে না চিন্তে বড্ড আলটপকা কথা বলে। বলে হোমিওপ্যাথি করাও, কেউ বলে জ্যোতিষের কাছে যাও, কিংবা দীক্ষা দাও। আমি জানতে চাই, কোনটা ঠিক রাস্তা! কোন চিকিৎসাটা ঠিক চিকিৎসা। যে যা বলছে করছি, কিছু তো হল না। এখন ঘরের মানুষ তুমিও ওরকম সব উপদেশ দেবে নাকি?
সোমেন বড় অপ্রতিভ হয়ে বলে, দাদার অসুখটা তো আমি জানি না বউদি।
বীণা খুব ব্যথাতুর মুখে বলে—জাননা না কেন? এক ছাদের তলায় থাকো, এক রক্তের সম্পর্ক, তবু কেন জানো না? তোমরা যদি একটু জানবার চেষ্টা করতে তা হলে আমাকে এত ভেবে মরতে হত না। একা আমিই ভাবছি, ছোটাছুটি করছি, আর সবাই বাইরে থেকে কেবল ‘এটা করো সেটা করো’ বলে। আমার মাথার ঠিক থাকে না। শ্বশুরমশাইয়ের কাছে মন্ত্র নিলেই যদি ভাল হত তো উনি সেটা দিয়ে দিলেই পারতেন। আমার অনুমতির দরকার ছিল না। তোমরা যদি ওর এত পর হয়ে যাও তো কী করে হবে?
