রাজ্যের মার্কেটিং করেছে অণিমা, স্তূপাকার সব জিনিস পড়ে আছে সিটে, সিটের পিছনে পিছনের উঁচু থাকটায়, সামনের সিটেও।
—বাব্বাঃ, কতক্ষণ ধরে হর্ন দিচ্ছি, শুনতেই পাচ্ছিলে না? কার কথা ভাবছিলে সোমেন?
—তোমার কথা।
—বাজে বোকো না, কোনওদিন ভাবোনি।
—সত্যি বলছি। তোমাকে ছুঁয়ে—
বলেই চমকে গেল সোমেন।
অণিমা অমনি তার একখানা অপরূপ রঙিন, সুন্দর ডৌলের হাত বাড়িয়ে বলল—ছোঁও। ছুঁলে কিছু হয় না। জাত যায় না।
—দূর! আমি ওসব ভাবিনি। আমার মনে হল, তোমাকে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করে লাভ কী? তুমি আমার কে?
অণিমা মুখ টিপে হেসে বলে—এ জন্মে তুমি আমার কেহ নও অমরনাথ, কিন্তু যদি পরজন্ম থাকে—
সোমেন মুখ তুলে অণিমার চোখে চোখ রেখে বলল—কিন্তু যদি পরজন্ম না থাকে অণিমা? এ জন্মেই যদি শোধবোধ হয়ে যায়?
—বোলো না সোমেন, বোলো না।
সোমেন ভ্রূ কুঁচকে বলে—বলা হল না অণিমা। এখনও চাঁদটাঁদ ওঠে, ফুলটুল ফোটে, লোডশেডিংও হয় মাঝে মাঝে…
অণিমা হাসল।
সোমেন হঠাৎ বলল—আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি অণিমা।
—ওমা! কেন?
—দুঃখে, এদেশে কেউ পাত্তাই দিল না। নিজের ভ্যালুয়েশনটাই বুঝতে পারলাম না।
অণিমা চোখ বড় বড় করে বলে—কেউ দেয়নি?
সোমেন হেসে ফেলে, বলে—তুমি একটু দিয়েছিলে, তারপর সুট করে কেটে পড়েছ, সেটাই তো দুঃখ।
—ইয়ারকি হচ্ছে?
সোমেন প্যান্টের পকেট থেকে খামটা বের করে হাতে রেখে বলে—অণিমা, বাড়িতে কদিন ধরে একটা ক্রাইসিস চলছিল বলে আসতে পারিনি, ভেবেছিলাম, তুমি বুঝি চলে গেছ।
অণিমা পা নাচিয়ে পা-তোড়ার একটা ঝুমুর ঝুমুর শব্দ তুলে বলল—বিয়ের প্রথম বছরে শ্বশুরবাড়িতে শ্রাবণের জল মাড়াতে নেই। তাই শ্রাবণ মাসটা কাটিয়ে যাচ্ছি।
সোমেন অবাক হয়ে বলে—এটা কি শ্রাবণ মাস অণিমা, আশ্বিন নয়?
অণিমা সেই ইউনিভার্সিটির সময়কার মতো হেসে বলে—তুমি আমেরিকা যাওয়ার আগেই আমেরিকান হয়ে গেছ। বাংলা মাস জানো না। আজ পয়লা ভাদ্র, আমি কাল চলে যাচ্ছি।
সোমেন বলল—খুব লাকি অণিমা। তুমি চলে গেলে একটা ঋণ শোধ হতে আবার দেরি হত।
—কীসের ঋণ?
—সে তুমি বুঝবে না। বলে খামটা অণিমার কোলে ফেলে দিয়ে বলল—এটা আমার আড়ালে খুলো, আর আমাকে এখানে নামিয়ে দাও।
অণিমা খামটা খুলল না, কেবল হাতে ছুঁয়ে একটু গম্ভীর হয়ে বলল—আমি জানি সোমেন এতে কী আছে।
সোমেন একটু লাল হল। এখন তার হঠাৎ খুব লজ্জা করছিল। বলল—গাড়িটা থামাতে বলো।
—ঋণটা না হয় থাকত সোমেন, সব ঋণ শোধ করে ফেললে আমেরিকা গিয়ে তুমি সব ভুলে যাবে।
—ভুলব না অণিমা। সোমেনের গলাটা ধরে বসে গেল। কতকটা ফিসফিসানির মতো করে বলল—টাকা পয়সার প্রসঙ্গটা বড্ড বাজে, তবু বলি, ওই ঋণটা আমাকে বড় জ্বালাতন করত। কিছু মনে কোরো না।
অণিমা একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলল—তুমি ভীষণ বাজে হয়ে গেছ। এমন জানলে কক্ষনো ভাবই করতাম না তোমার সঙ্গে।
বলে অণিমা চোখে চোখ রেখে ম্লান হাসল। সোমেনের হাসতে খুব কষ্ট হচ্ছিল, তবু হাসল। বলল—থ্যাঙ্ক ইউ।
—কেন?
—খুব বেশি প্রশ্ন করোনি বলে। ঋণ শোধ করতে দিয়েছ বলে। আর, সারাজীবন ধরে ভাববার জন্য আমাকে একটা অদ্ভুত আচমকা জিনিস দিয়েছিল বলে!
অণিমার বাড়ির দরজার কাছে নেমে চলে এল সোমেন। মনটা বড় খারাপ লাগছে।
॥ পঁয়ষট্টি ॥
অনেকদিন এমন এক সুন্দর দিন আসেনি। বাদল-মেঘ ছিঁড়ে মাঝে মাঝে শরৎকালের মতো আকাশ দেখা যাচ্ছে। শরৎকালই তো! ভাদ্র পড়ে গেল। বরাবরই শরৎকাল সোমেনের সবচেয়ে প্রিয় ঋতু। শরতের আবহাওয়া তো আছেই, তা ছাড়া বহু দিনকার লজ্জাকর ধারটা শোধ দেওয়া গেল। ফের অবশ্য ধার হয়েছে বউদির কাছে। তো সোমেনের জীবনটা বোধ হয় এইভাবেই যাবে। একজনের কাছে ধার নিয়ে অন্যজনকে শোধ করবে। তবু দিনটা আজ ভালই। যদি লক্ষ্মণদা চেষ্টা করে, যদি হয়ে যায় আমেরিকায় একটা চাকরি!
দাড়িটা কামানো দরকার। আজ সেই ভূতুড়ে সিনেমার টিকিটের দিন। মনে পড়লেই বুকটা লাফিয়ে ওঠে রহস্যের গন্ধে।
পাড়ার সেলুনে আজ বড্ড ভিড়। চেনা নাপিত ফুলেশ্বর দুঃখ করে বলল—সারা সকাল দোকান খালি গেল বাবু, তখন তো এলেন না! এখন ভরদুপুরে যত ভিড়। বাবুদের সব সময় হয়েছে।
অগত্যা বাসায় ফিরে দাদার রেজারে কামিয়ে নেবে বলে রণেনের ঘরে ঢুকেছিল সোমেন। দাদা একটা ঝকঝকে নতুন জিলেট-এর ওয়ান পিস সেট কিনেছে। পুরনো সেটটা দিয়েছিল সোমেনকে। কিন্তু সেটার প্যাঁচফ্যাঁচ কেটে গেছে। পড়েছিল, বুবাই টুকাই খেলতে নিয়ে কোথায় ফেলেছে কে জানে! নতুন সেটটায় কামিয়ে আরাম, দারুণ সব উইলকিনসন ব্লেডও আছে দাদার।
রণেন বিছানার একপাশে গম্ভীর হয়ে বসে আছে। খালি গা, পরনে দারুণ একটা বাটিকের কাজ-করা ছেলেমানুষি লুঙ্গি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা এঁটে বই পড়ছে। আজকাল রণেন একদম কথা বলে না। সে যে বাড়িতে আছে তা টের পাওয়াই ভার। বরাবরই সে শান্ত ছিল, কিন্তু এখানকার নীরবতা প্রায় নিশ্ছিদ্র।
সোমেনের খেয়াল হল, গত প্রায় দিন দশেক সে দাদার সঙ্গে কোনও কথা বলেনি। আজ বলল।
—দাদা, তোমার সেভিং সেটটা নেব?
—রণেন একবার তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল।
এধার-ওধার কোথাও খুঁজে পাচ্ছিল না সোমেন। ড্রেসিং টেবিলের টানায় সাধারণত থাকে।
হাতের মোটা বইটা খুব জোর শব্দ করে বন্ধ করে দিল রণেন। বিরক্ত হয়ে বলল—কী খুঁজছিস? জমির দলিল? সে তো মার কাছে।
