সোমেন হেসে ফেলে, বলে—স্ব প্লাস অধীন।
—হল না। লক্ষ্মণ মাথা নাড়ে—নিজের অধীন হওয়া মানে যথেচ্ছাচারের অধীন হওয়া। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হল স-এর অধীন। স্বাধীনতা তাই শুভ বা মঙ্গলের অধীনতা। সে যাকগে। যেখানে মেয়েরা স্বাধীন, তারা সমাজে পুরুষের সমান সব অধিকার ভোগ করে, পুরুষের সঙ্গী হয়, বন্ধু হয়, পার্টনার হয়। তাদের ভাবপ্রবণতা খুব কম। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান জিনিসটা প্রায়ই দেখা যায় না। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হলে বাবা কিংবা কাকিমার সঙ্গে ঝগড়া করে কাকা ভাতের ওপর রাগ করেছে, খায়নি। আর মা কাকিমা কত সাধ্যসাধনা করে খাইয়েছে, ওদেশে এটা ভাবাই যায় না। অভিমান করে থাকলে লোকে অবাক হয়, রাগ ভাঙানোর সময় কারও নেই। বিয়ে করলেই বউ আপন হয়ে গেল, এই আমরা জানি। আমার তা হয়নি। সোমেন, তুমি তো যোলো বছর বয়স পার হয়ে এসেছ, তোমাকে বলতে আপত্তি কী যে ও দেশে সবাই বড্ড বেশি অ্যাডাল্ট। আদর ভালবাসার ক্ষেত্রেও কেউ খুব ছেলেমানুষ বা ইললজিক্যাল হয়ে যায় না। আমার স্ত্রী চাকরি করত, ক্লাবে যেত, তার আলাদা পুরুষ আর মেয়ে বন্ধু ছিল, আলাদা একটা জীবনও ছিল যেখানে আমি ঢুকতে পারতাম না। অর্থাৎ স্বামীর অধিকারও সীমাবদ্ধ ছিল। হয়তো এরকমই হওয়া উচিত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। কিন্তু আমি তো ওদের মতো করে ছোট থেকে বড় হইনি, তাই আমার পদে পদে নিজের ভুল চোখে পড়ত। আমার দাবি-দাওয়া ছিল বেশি। আর একটা কথা, আমাদের দেশে যেমন সাধারণত বিয়ের পরই ছেলেমেয়েদের প্রথম সেক্সের অভিজ্ঞতা হয় ওখানে তো তা নয়। অল্পবিস্তর যৌন অভিজ্ঞতা ওখানে প্রায় সকলেরই বয়ঃসন্ধিতে ঘটে যায়। অন্তত যৌনতার কারণে বিয়ে সেখানে আবশ্যিক নয়। বিয়ে হচ্ছে কমপ্যানিয়নশিপ, সঙ্গ, বন্ধুত্ব—যা বলো। সবই আবার পারস্পরিক সম্মান ও অধিকার বজায় রেখে। সে ভারী জ্বালা হয়েছিল আমার। তাকে ভালও বাসতাম খুব, সেও বাসত, কিন্তু পরস্পরের গভীরে যাওয়ার কোথায় যেন বাধা হচ্ছিল। উই হ্যাড রিলেশন, বাট উই ওয়্যার নট রিলেটিভস। তুমি ঠিক বুঝবে না। সোজা কথা, আমার ভিতরকার একটা ভারতীয় মনোভাবই সব ভণ্ডুল করছিল। আর সেই মনোভাবটাই আমাকে ওখানে পাকাপাকিভাবে থাকতে দেয় না। কেবলই বলে—মন, চলো নিজ নিকেতনে।।
রাস্তাটুকু ফুরিয়ে গেল চট করে। লক্ষ্মণ গলিতে ঢুকবে, তার আগে সোমেনকে বড় রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে বলল—অনেক কথা বলে ফেললাম, এসব মনে রেখো না।
সোমেন হেসে বলল—সেই যাই বলুন, আমার কিন্তু আপনার মতো হবে না। আমি আমেরিকায় গেলে ঠিক ওদের মতো হয়ে যাব।
—বটে! বলে লক্ষ্মণ হাসে খুব।
সোমেন বলে—আমাকে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করুন, জব ভাউচার দিন, দেখবেন আমি কীরকম ওই লাইফ অ্যাডপ্ট করে নিই।
—তা হলে তো তোমাকে কিছুতেই যেতে দেওয়া যায় না। লক্ষ্মণ ট্যাক্সির দরজাটা বন্ধ করবার আগে বলল—খুব যদি যেতে ইচ্ছে করে তা হলে একটু সিরিয়াসলি ভেবে আমাকে বোলো, চেষ্টা করব।
এই বলে লক্ষ্মণ দরজা বন্ধ করে দিল। ট্যাক্সি মোড় নিল। সোমেন রাস্তাটা পার হতে হতে বুকের মধ্যে বহুদূর ছুঁয়ে আসা সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে টের পেল। তার চেতনার বেলাভূমি ভেসে যাচ্ছে। যাওয়া হবে কি? বড় বেশি অল্পের মধ্যে আটকে আছে সোমেন। জীবনটা বড় ছোটের মধ্যে ছবির ফ্রেমে আটকানো। ফ্রেমটা ভাঙা দরকার। লক্ষ্মণদার মনে থাকবে তো?
আজকাল বর্ষার মেঘ কেটে গেলেই কেমন আচমকা চারধারে একটা শরৎকালের আভা এসে পড়ে। চারদিকে একটা পুজোর আয়োজন। এসময়ে গ্রাম গঞ্জে নদীর ধারে কাশফুল আসছে, শিউলি ফুটি-ফুটি করছে। কলকাতাতেও বাতাস বৃষ্টির পর পরিষ্কার। আকাশের ময়লা ধুয়ে গভীর নীল দেখা যায়। মনটা হঠাৎ ভাল হয়ে যায়।
বাস থেকে নেমে বালিগঞ্জ সারকুলার রোডের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সোমেন সিগারেট ধরাল। আর তক্ষুনি মনে পড়ল, মা বলেছিল খাবার দিয়ে বড়দির বাসা থেকে টিফিন ক্যারিয়ারটা ফেরত আনতে। বাসায় একটা বৈ দুটো টিফিন ক্যারিয়ার নেই। কাল ফের খাবার দেওয়ার দরকার হলে কে তখন টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে যেতে আসবে? মা খুব রাগ করবে হয়তো।
কিন্তু এই চব্বিশ পূর্ণ পঁচিশে-পা জীবনে বেশিক্ষণ টিফিন ক্যারিয়ারের চিন্তা মাথায় থাকতে চায় না। কত আনন্দে শিউরে ওঠার মতো আচমকা চিন্তা মাথা ভাসিয়ে দিয়ে যায়। অনিল রায়ের বাড়িতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় দেখা হাজার হাজার সুন্দর দৃশ্যের ছবি চোখের সামনে বৃষ্টিপাতের মতো ঝরে পড়ছে! চারদিকে শরৎকালের মতো আলো। একটা রহস্যময় সিনেমার টিকিট। সব মিলিয়ে বড় অদ্ভুত আজকের দিনটা। এক-একটা দিন আসে এরকম। খুব ভাল দিন।
মেট্রোতে আজ কার সঙ্গে দেখা হবে?
অন্যমনস্ক সোমেন পিছনে একটা মোটরের হর্ন শুনে ফুটপাতে উঠে এল। গাড়িটাও তার পাশাপাশি ধীরে ধীরে হাঁটছে। সোমেন ভেবেছিল, গাড়িটা থামবে বুঝি। থামল না, চলছিল।
সোমেন সম্বিত পেয়ে তাকিয়ে দেখল, গাড়ির জানালায় অণিমা তারদিকে তাকিয়ে খুব হাসছে।
—কার কথা ভাবছ সোমেন? উঠে এসো।
গাড়িতে একা অণিমাই, সামনে শুধু ড্রাইভার।
—ওঃ, তোমাদের বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। বলে সোমেন উঠে বসল অণিমার পাশে।
