—কত খাব রে? শীলা হেসে লক্ষ্মণের দিকে চেয়ে বলল—একে চেনেন? আমার ভাই।
—চিনি, ছোট দেখে গেছি। সেদিনও আবার পরিচয় হল। বড় হয়ে গেছে। লক্ষ্মণ বলে।
লক্ষ্মণদার গলার স্বরটা অদ্ভুত সুন্দর লাগে সোমেনের। এত ভদ্র, আন্তরিক আর ভরাট গলা যে, শুনলেই মানুষটার দিকে আকর্ষণ জন্মায়। চেহারাটা খুব লম্বা চওড়া, কিন্তু কোথাও কোনও কর্কশতা নেই। মুখে সরল একটা হাসি। সেদিনও দেখেছে সোমেন, শীলার খবর পাওয়া মাত্র কেমন চটপট সব খবরাখবর নিল, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলল, চেহারা এবং কথাবার্তায় সকলের সম্ভ্রম এবং মনোযোগ আকর্ষণ করার নিহিত একটা গুণ আছে লক্ষ্মণদার। শরীরে একবিন্দু আলস্য নেই, বরং খুব কেজো লোকের লঘু গতি আছে।
লক্ষ্মণ তাকে কাছে ডেকে বসাল। বলল—কী করছ?
সোমেন তার উত্তরে বলে—আমাকে আমেরিকা থেকে একটা জব ভাউচার পাঠাবেন লক্ষ্মণদা?
শুনে লক্ষ্মণ চমৎকার করে হেসে বলে—পালাতে চাও? বলে দুহাতে মুখটা একটু ঘষে নিয়ে বলে—সবাই পালাতে চাইছে কেন বলো তো!
—এখানে থেকে কী করব? কিছু হচ্ছে না।
লক্ষ্মণ ফের হাসে। বলে—ওখানে গিয়েই বা কী হবে? কদিন একটু ভাল খাওয়াপরা জুটবে। গুড লিভিং। তারপর দেশে ফিরে এলে বড্ড মুশকিল হয়। বড়লোকের দেশ থেকে এসে নিজের গরিব দেশকে আর ভাল লাগতে চায় না। সেটা ভাল নয়। ও এক ধরনের ব্যাঙ্করাপসি। তারচেয়ে নিজের দেশটাকে বড় করার চেষ্টাই ভাল।
সোমেন কথাটার উত্তর দেয় না।
লক্ষ্মণ তার কাঁধে হাত রেখে বলে—আমিও চলে আসছি।
—কবে?
—এবার গিয়েই চলে আসব।
সোমেন কিছু উৎসুক হয়ে বলল—অত বড় চাকরি ছেড়ে আসবেন?
লক্ষ্মণ মাথা নেড়ে বলে—আসব। আসতেই হবে।
—বউদিকে নিয়ে আসবেন?
লক্ষ্মণ একটু থমকাল। ফের সেই অপকট হাসি হেসে বলল—না। সে আসবে না। ও ঠিক আমাকে বোঝে না, আমি ওকে বুঝি না। আমাদের বিয়েটা ভেঙে গেছে সোমেন।
॥ চৌষট্টি ॥
সোমেন যাবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছিল, অজিত মুখ তুলে বলল—শালাবাবু, ভাগ্নেটিকে কেমন দেখছ? তোমার মতো সুন্দর হবে?
সোমেন লজ্জা পেয়ে বলে—আমি আবার সুন্দর নাকি? ও আরও বেশি সুন্দর হবে।
অজিত খুব একটা তৃপ্তির হাসি হেসে বলল—তা হলে বলছ বয়সকালে আমার ছেলের পিছনে বিস্তর মেয়ে লাইন দেবে?
শীলা ভ্রূ কুঁচকে বলে—অত আদেখলাপনা কোরো না তো! লোকে হাসবে।
অজিত উঠে নতুন কেনা একটা দামি নাইলনের মশারি খাটের স্ট্যান্ডে টাঙাতে শুরু করলে শীলা বলল—বাব্বাঃ, পারোও তুমি। এখন মশারি টাঙালে দমবন্ধ লাগবে না?
—লাগুক। এখানে দিনের বেলাতেই মশা বেশি লাগে। আজ বেরিয়ে ওর জন্য একা ক্ষুদে ফোল্ডিং মশারি কিনে আনবে।
শীলা বাহ্যত রাগ কিন্তু অন্তর্লীন প্রশ্রয়ের গলায় বলে—আর কি কি কিনবে লিস্ট করে নিয়ে যেয়ো৷ ছেলে যেন আর কারও হয় না।
লক্ষ্মণ উঠে বলল—চলো সোমেন, আমিও যাই।
—তুই যাবি? বোস না! অজিত বলে।
—না রে, কাজ আছে। মোটে তো মাসখানেক সময়, কত লোকজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ বাকি আছে, বউঠান, আজ বিদায় হই। সময় পেলে কাল আসব।
—আসবেন। শীলা পাশ ফিরে বলে—আপনার বিরহে আপনার বন্ধু এতকাল শুকিয়ে যাচ্ছিল।
লক্ষ্মণ ম্লান একটু হেসে বলে—আমরা খুব বন্ধু বউঠান। জীবনে একজন দুজনের বেশি বন্ধু কারওই বড় একটা জোটে না। আমরা সেই রকম বন্ধু। তবে দুঃখ করবেন না, এখন তো অজিতের ছেলে হল, এবার আর বন্ধুর জন্য তেমন উতলা হবে না। মানুষ যার মধ্যে নিজেকে পায় তাকেই আঁকড়ে ধরে। এককালে অজিত আমার মধ্যে নিজেকে পেত, এবার ছেলের মধ্যে আরও বেশি সেটা পাবে। সন্তান মানে তো নিজেরই পুনর্জন্ম।
শীলা হেসে বলে—বাবাঃ, আপনার কথা ভীষণ শক্ত। বুঝতে পারি না।
লক্ষ্মণ বলে—অজিত বোঝে, না রে অজিত?
অজিত খাটের চারধারে ঘুরে ঘুরে খুব যত্নের সঙ্গে মশারি গুঁজছিল। মুখ না তুলেই বলল—সোমেন না থাকলে তোকে এমন একটা গাল দিতাম না।
লক্ষ্মণ সভয়ে বলে—ওর মুখটা বড় খারাপ বউঠান, সামলে রাখবেন।
অজিত মশারির আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলে—তুমি শালা খুব সবজান্তা হয়েছ। ছেলে কি বন্ধুর জায়গা নিতে পারে? ছেলে একরকম, বন্ধু অন্যরকম। কাল আসিস কিন্তু।
—দেখি।
বলে লক্ষ্মণ বেরিয়ে আসে, সঙ্গে সোমেন।
যে মানুষ বিদেশে থাকে তারদিকে বরাবরই আকর্ষণ সোমেনের। লক্ষ্মণের গায়ে সেই অদ্ভুত সুদূরের গন্ধ, যে রহস্যময় দূর বরাবর মানুষের রক্তে জীবাণুর মতো নিহিত থাকে। দূরত্বই রহস্য, দূরত্বই আকর্ষণ। যে মানুষ পৃথিবীর সব দূরত্ব অতিক্রম করেছে সেও আকাশের দিকে তাকালে বুঝি ফের দূরত্বের রহস্য টের পায়। আমেরিকা, ইয়োরোপ, এই শব্দগুলো শুনলেই সোমেনের বুকে অদৃশ্য ঢেউয়ের ধাক্কা এসে লাগে, তীরভূমি ভেসে যায়।
লক্ষ্মণ একটা ট্যাক্সি নিল। বলল—চলো, তোমাকে একটা লিফট দিই। কোথায় যাবে?
—আমি যাব বালিগঞ্জ সারকুলার রোড। আপনি আমাকে কালীঘাটে নামিয়ে দেবেন। ওখান থেকে চলে যাব। ট্যাক্সিতে উঠে বসে সোমেন খুব লজ্জার সঙ্গে বলল—আমরা ভেবেছিলাম আপনি আর ফিরবেন না লক্ষ্মণদা, ওখানেই থেকে যাবেন।
লক্ষ্মণ অবাক হয়ে বলে—কেন? ফিরব না কেন?
সোমেন বলে—শুনলাম ওখানে বিয়ে করেছেন, বাড়ি করেছেন। আপনার এখানকার জমিটাও তো বিক্রি করে দিলেন।
লক্ষ্মণ মাথা নেড়ে বলল—না। ফিরতাম। আমি খুব বেশিমাত্রায় ভারতীয়। কখনও পুরোপুরি বিদেশি হতে পারলাম না। অবশ্য হতে পারলেই সুখী হওয়া যেত। প্রথম গিয়ে আমি তো ঠিকই করেছিলাম হয় কানাডা কিংবা স্টেটসে সেটল করব। হুইমসিক্যালি বিয়েও করে ফেললাম। কিন্তু তারপরই কতকগুলো ভুল ধরা পড়তে লাগল। প্রগ্রেসিভ দেশগুলোতে মেয়েরা বড্ড বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। বলে লক্ষ্মণ হঠাৎ পাশে মুখ ঘুরিয়ে সোমেনের দিকে চেয়ে বলে—আচ্ছা সোমেন, বলো তো স্বাধীনতার সন্ধিবিচ্ছেদ কী হবে!
