ভাবতে গিয়ে আপন মনেই হেসে ফেলল সোমেন। তাই কি হয়? চেনা মানুষই পাঠিয়েছে টিকিট। একটু শুধু রহস্য জড়িয়ে দিয়েছে টিকিটের গায়ে। তাই শৈশবের সব হারিয়ে যাওয়া রহস্যের গন্ধ আজ মেট্রোর তুচ্ছ টিকিটটার গা থেকে শুঁকে নিচ্ছিল সোমেন।
ননীবালা এসে বললেন—পাগল ছেলে, একা-একা হাসছিস কেন?
সোমেন গম্ভীর হয়ে বলল—ও কিছু না।
ননীবালা বললেন—একবার শীলার বাড়ি যা। ছেলে হওয়ার পর থেকেই মেয়ের বড় খিদে হয়েছে। ঝি-ছুঁড়িটা কী ছাইমাটি রেঁধে দেয়, ও দিয়ে কি আর পোষ্টাই হয়! এখন হুড় হুড় করে বুকের দুধ নামাতে হলে বাটি বাটি দুধ-সাগু খাওয়াতে হয়, ফলি মাছের ঝোল, লাউ। তা সে-সব আর কে করছে! কয়েকটা গোকুল পিঠে করে রেখেছি, বউমা কৈ-মাছ করছে, টিফিন ক্যারিয়ারে করে দিয়ে আয় গে।
সোমেন মুখটা বিকৃত করে বলে—দিদির শাশুড়ি আর কে যেন এসে ওখানে আছে শুনলাম। তারা থাকতে দিদির জন্য আমাদের ভাববার কী?
ননীবালা একটা তাচ্ছিল্যের ‘হুঁঃ’ দিয়ে বললেন—সে যেই হোক, পেটে তো আর আমার মতো ধরেনি মেয়েটাকে। তারা সব অতিথির মতো এসে আছে। আলগোছে কদিন থেকে চলে যাবে।
সোমেন বিরক্ত হয়ে বলে—তুমি খাবার পাঠালে তারা বিরক্ত হতে পারে। প্রায়ই তো পাঠাচ্ছ শুনি।
ননীবালা অবাক হয়ে বলেন—ও মা! বিরক্ত হবে কেন? বরং না পাঠালে খোঁজ না নিলে উলটে বলত। এমনিতেই নার্সিং হোমে রাখা হয়নি, হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে বলে জামাই সুদ্ধু সকলেরই গাল ফুলে আছে। বিপদের সময় সব কোথায় হাওয়া হয়েছিল, তাই ভাবি। কাজ উদ্ধার হয়ে যাওয়ার পর খুঁত ধরতে সবাই পারে।
সোমেন বেশি কথা বলতে চান না। টিকিটের রহস্যচিন্তা ছিঁড়ে যেতে চায়। বলল—উঃ বড্ড বেশি কথা বলো তুমি। খাবার দিয়ে আসতে হবে, দিয়ে আসব। অত কথায় কাজ কি?
ননীবালা আজকাল এই ছেলেটাকে বড় ভয় পান। রণোর মতো শান্ত নয়, বড্ড রাগী। অবশ্য চাকরি-বাকরি পায় না বলেই বোধ হয় মেজাজটা খিঁচড়ে থাকে। বয়সকালে স্থিতু হতে না পারলে পুরুষমানুষের ওরকম হয়ই, মেয়েদের হয় বয়সকালে বিয়ে না হলে। শীলার কিছু দেরিতে বিয়ে হয়েছিল, শেষ দিকটায় বড্ড মুখ করত।
ননীবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—তোমরা বাবা সব ভি আই পি, কথা বলতে গেলেই ভয় পাই।
সোমেন মার মুখের দিকে চেয়ে হেসে ফেলে৷ বলে—ওঃ বাবা, আজকাল যে ইংরেজি বলছ! ভি আই পি-টা কোত্থেকে শিখলে?
ননীবালা উদায় হলায় বলেন—শুনে শুনেই শেখা।
সোমেন বহুকাল পর হঠাৎ উঠে ননীবালাকে দু-হাতে জড়িয়ে মাটি থেকে তুলে নিয়ে শূন্যে একটা পাক খাওয়াল। ননীবালা ‘ছেড়ে দে, ছেড়ে দে’ বলে চেঁচালেন, হাসলেনও। সোমেন বলল—খুব আপ-টু-ডেট হয়ে যাচ্ছে, বুড়ি, অ্যাঁ?
যখন শীলার বাড়ি যাবে বলে বেরোতে যাচ্ছে সোমেন তখন বীণা টিফিন ক্যারিয়ার দিতে এসে বলল—হই-হুজ্জুতে মনে পড়েনি সোমেন, সেই যে টাকাটা চেয়ে রেখেছিলে সেটা নাওনি এখনও। লাগবে নাকি?
বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ে সোমেনের। অণিমার সেই শাড়ির দাম।
বলল—লাগবে বউদি। দেবে? নইলে প্রেস্টিজ থাকবে না।
—দেব না কেন? বহুদিন ধরেই খামে ভরে রেখে দিয়েছি। এক মিনিট দাঁড়াও এনে দিই।
—তোমার কষ্ট হবে না তো বউদি?
বীণা একরকম অদ্ভুত ঠাট্টা আর বিষণ্ণতা মাখানো হাসি হেসে বলল—প্রেস্টিজটা তো এখন রাখি। আর কষ্ট? সে তো আছেই। দেড়শো টাকায় তার কিছু সুরাহা হবে না।
ননীবালা কথাবার্তা শুনে এগিয়ে এসেছিলেন—কী কথাবার্তা হচ্ছে রে সোমেন? ও বউমা, টাকার কথা কী বলছ?
—ও কিছু নয়। বীণা বলল। এক ঝটকায় কোত্থেকে একটা পুরনো চিঠির খামে ভরা দশটাকার নোটের গোছা এনে সোমেনের প্যান্টের পকেটে গুঁজে দিল।
অণিমা এখনও কলকাতায় আছে কিনা সোমেন জানে না। কয়েকদিন গাব্বুকে পড়াতে যায়নি।
অজিত কদিন ছুটি নিয়ে আজকাল বাড়িতেই থাকে। একটা ইজিচেয়ার টেনে শীলার বিছানার পাশেই বসে থাকে। আঁতুর টাঁতুর বড় একটা মানে না। নিজের মা আর এক বুড়ি বিধবা খুড়িমা এসে আছে কদিনের জন্য, তাদের সামনেই লজ্জাহীনের মতো বসে থাকে বউয়ের কাছে।
আজও ছিল। জানালার ধারে একটা চেয়ারে লক্ষ্মণ বসে আছে।
শীলার বাচ্চাটা দিব্যি মোটাসোটা হয়েছে, ফরসা রং, নাকমুখ এখনও ফোলা-ফোলা, তাই আদল বোঝা যায় না। বাচ্চাটা কাঁদে না, কেবল ঘুমোয়। আর পাঁচ সাত মিনিট অন্তর অন্তর কাঁথা ভেজায়।
শীলা কিছু কষ্টে নেই। হাসপাতাল থেকে ডাক্তাররা এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে চায়নি। কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই অজিত প্রায় জোর করে নিয়ে এসেছে। বত্রিশ টাকা ভিজিটের গায়নোকোলজিস্ট প্রতিদিন এসে দেখে যাচ্ছে, হামেহাল পাশ করা নার্স বহাল আছে। ফ্রিজ ভরতি ফলটল কিনে রেখেছে অজিত, রাশি রাশি ওষুধ, ভিটামিন, কৌটোভরতি গুঁড়ো প্রোটিন আর পুষ্টিকর সব ফুড আসছে রোজ। প্রতিদিন বিকেলের দিকে কিছু ঘরে-করা খাবার নিয়ে ননীবালা, বীণা বা রণেন দেখতে আসে।
সোমেন এসব লক্ষ করে ননীবালার কথা ভেবে মনে মনে রাগ করে। বড়দি কিছুমাত্র অযত্নে তো নেই-ই, উপরন্তু খুব বেশি যত্নে আছে, তবু ননীবালা খুঁত বের করবেনই।
সোমেন ঘরে ঢুকতেই শীলা তাকিয়ে হাসল—আয়।
সোমেন বলল—তোর জন্য মা খাবার পাঠিয়েছে, রান্নাঘরে দিয়ে এসেছি।
