ব্রজগোপাল হেসে বলেন—পরমপিতা খোদার নাম করুন।
ফকিরসাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন—শিব স্বয়ম্ভু।
এক রাতে শীলাকে স্বপ্ন দেখলেন। ঘুম বড় একটা হয় না। তবু ভোরবেলার তন্দ্রায় এক আলো-আঁধারিতে শীলা যেন সামনে এসে দাঁড়াল। কোলে একটা বাচ্চা। বাচ্চাটার মুখ হুবহু শীলার মতো। শীলা বলল, বাবা আমার ছেলের নাম রাখবে না?
ব্রজগোপাল কষ্টের সঙ্গে বললেন—আমি নাম রাখলে কি তোদের পছন্দ হবে? পুরনো দিনের মানুষ আমরা। রণোর বড় ছেলের নাম রেখেছিলাম, তা সে ওরা পালটে দিয়েছে।
শীলা বলল—না বাবা, এ ছেলের নাম তুমিই রাখো। তুমি তো ভগবানের লোক বাবা, তুমি নাম রাখলে ও বাঁচবে।
ব্রজগোপাল বললেন—তবে নাম রাখো ঋতম্ভর।
—মানে কী বাবা?
—সত্যপালক। বিষ্ণু।
এই দেখে ঘুমের চটকা ভাঙল, উঠে বসলেন। ভোরের স্বপ্ন। ভাবলেন, নামটা আজই লিখে পাঠাবেন শীলাকে। আবার ভাবলেন, নাতির মুখশ্রী একবার দেখে আসবেন গিয়ে। হয়তো শেষ কথা। শরীরটা এখনও পড়ে যায়নি। এইবেলা না দেখে এলে আর হয়তো দেখাই হবে না। ওরা তো আর আসবে না বুড়ো বাপের কাছে।
॥ তেষট্টি ॥
দিন দুই আগে সোমেন ডাকে একটা খাম পেয়েছিল। তাকে চিঠি বলা যায় না। খামের মুখ ছিঁড়তে একটা কেবলমাত্র রঙিন সিনেমার টিকিট বেরিয়ে এল। দু-দিন পরের তারিখ। সঙ্গে একটা চিরকুটও নেই যে বোঝা যাবে টিকিটটা কে পাঠিয়েছে।
পঁচিশ বছরে পা দিয়ে সোমেন আজকাল টের পায় তার জীবনে খুব একটা রহস্য বা চমকে ওঠার মতো কিছু নেই। এই তো সেদিন সে মোটে তার শৈশব পেরিয়ে এল। শীতের সকালে মা একটা ছোট্ট ছেঁড়া আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে পিঠের দিকে গিঁট বেঁধে দিত, আর সোমেন একটা বড় টিনের কৌটো আর খুচরো পয়সা মুঠো করে নিয়ে মুদির দোকান থেকে মুড়ি আনতে যেত। ঢাকুরিয়ার রেল লাইনের ওপর ওভারব্রিজটা তখনও হয়নি। যোধপুরের দিকে ফাঁকা জমি পড়ে আছে। শীতের সকালে কুয়াশামাখা ঝিল-এর মলিন জল ছুঁয়ে কনকনে বাতাস আসত। সেই দূরটুকু কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া দিগন্তটা আর রেল ইঞ্জিনের কহুধ্বনি সবই গায়ে কাঁটা-দেওয়া রহস্য জাগিয়ে দিতে যেত। লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে বাস থেমে আছে, গেট বন্ধ, আর ঠিন ঠিন করে দূরের দমকলের মতো ঘণ্টি বাজছে। সেই ঘণ্টির শব্দ কি একটা অজানা আনন্দের সংবাদ নিয়ে আসত মনের মধ্যে। মুদির দোকানে একটা কেমন মশলাপাতির ঝাঁঝাল গন্ধ উঠত। বুড়ো মুদিচরণ সাহা একটা রঙিন খদ্দরের চাদরে মাথা মুখ ঢেকে জিনিস ওজন করে দিত। চরণ সাহা কখনও ফাউ দিত না, বরং মাপা জিনিস থেকে এক চিমটে তুলে রাখত বরাবর। তার ওপর একটা রাগ ছিল সোমেনের। কিন্তু খুব বেশি দোকান তখনও ওদিকে ছিল না। রাস্তাঘাট অনেক ফাঁকা ছিল, এত বাড়িঘর হয়নি। স্টিম-ইঞ্জিন ঝিক ঝিক করে কাঠের গাড়ি টেনে নিয়ে গেছে লাইন দিয়ে। সন্ধেবেলা কতদিন রেলগাড়ির শব্দ দূরে মিলিয়ে যেতে মন উদাস হয়ে গেছে সোমেনের। তখন মনে হত পৃথিবী কি ভীষণ গভীর গহীন। এর মধ্যে না জানি কত অজানা অচেনা রহস্য লুকিয়ে আছে। শীতে কত পাখি আসত, বর্ষার ব্যাঙ ডাকত। এখন আর সে-সব দেখে না, শোনে না সোমেন। আজকের যারা শিশু তারা হয়তো এই আবরণহীন, যান্ত্রিক পৃথিবীর কিছু রহস্য টের পায় এখনও। সোমেন পায় না।
টিকিটটা অনেকবার হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করল সোমেন। কোনও হদিশ করতে পারল না। কিন্তু রহস্যটা বেশ ভাল লাগছিল তার কাছে। যে-ই পাঠাক সে অন্তত দু-দিন সোমেনকে মনে মনে উদ্গ্রীব রাখছে।
আজ সকালে উঠেই টিকিটটা বের করে দেখল সোমেন। আজই ম্যাটিনি শোয়ের টিকিট মেট্রোয়। টিকিটের ওপর মেট্রো কথাটা দেখে ফের শিশুবেলার কথা মনে পড়ে সোমেনের। মেট্রো হল-এর নাম তখন মা-মাসির মুখেও শোনা যেত। সে নাকি এক আশ্চর্য মায়াপুরী। মেট্রো হল-এর চূড়ায় যে খাঁজকাটা প্যাটার্ন আছে তারই অনুকরণে তখনও মেট্রো প্যাটার্নের নেকলেস বা গলার হার গড়াত বাঙালি মেয়েরা। আজ মেট্রোর সেই কারুকাজ কেউ চোখ তুলেও দেখে না। ওই হল-এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অনেক হল হয়েছে কলকাতায়। তবু তখনও সোমেনের কাছে ওই নামটার একটা চমক আছে।
আজকাল সোমেনের বড় পুরনো কথা মনে পড়ে। একদিন অনিল রায় তাকে বলেছিলেন—দেখো সোমেন, যখনই দেখবে তোমার খুব বেশি পুরনো কথা মনে পড়ছে তখনই বুঝবে যে তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছ। নস্টালজিয়া বলো, শৈশবের স্মৃতি বলো—ওর খুব বেশি ভাল নয়। ও মানুষকে শেখায় বর্তমানকে উপেক্ষা করতে, ভবিষ্যতের প্রচেষ্টা থেকে নিশ্চেষ্ট রাখতে। বাঙালি মাত্রই বড় বেশি নস্টালজিয়ায় ভোগে। আসলে যারা নিজেরা চারপাশকে উপভোগ করতে পারে না, যারা নিজেদের জীবনকে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত করতে পারে না, যারা ঘরকুনো তারাই দেখো, বর্তমানকে উপেক্ষা করে অতীত নিয়ে থাকে।
সোমেনের আজকাল তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, পঁচিশেই বুঝি বা তার যৌবন ফুরল। আর কিছু হওয়ার নেই। কিছু করার নেই। দাদার এই দুঃসময়ে সে সংসারের কোনও কাজে আসে না। একটা পয়সাও দিতে পারে না সংসার খরচ। তাই সোমেন দুবেলা বড় লজ্জার ভাত খায়। রাতে গোপনে কখনও বা চোখের জল ফেলে।
সকাল থেকেই টিকিটটা ঘিরে তার একটা পিপাসা জেগেছিল। মনে হচ্ছিল গিয়ে যদি দেখে চেনা কেউ নয়, একজন অচেনা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রতীক্ষায়! কিংবা যদি এমন হয় যে, এই টিকিটের সূত্রেই তার জীবনের মস্ত পরিবর্তন আসছে?
