ব্রজগোপাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন—বাপু, তোমাকে দেখে আমার হাসি পায় না।
মতিরাম ভারী অবাক হয়ে বলে—পায় না? অ্যাঁ! পঁয়ষট্টি বছর বয়সে এইটুকুন একটা মানুষ, বামনবীর—বলে নিজের লম্বার মাপ হাত দিয়ে দেখিয়ে মতিরাম বলে—এ দেখেও হাসি পায় না।
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—বেঁটে লম্বা কতরকম মানুষ আছে, মানুষের শরীরের খুঁত দেখে হাসি পাবে কেন? আমার পায় না।
—এই যে এত কেরানি দেখালাম তাও হাসি পেল না?
—না।
—তোমার বাপু ব্যারাম আছে।
ব্রজগোপাল সে কথার উত্তর না দিয়ে বলেন—লোক হাসানোর অত দরকার কি তোমার?
মতিরাম একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ অভিমানভরে বলে—সার্কাসে এক জন্ম এই তো করেছি। কাজ বাজ কেউ তো আর দেয়নি। তোক না হাসালে পেট চলে কেমন করে? সাকাসটা উঠে গেলে হাটে-বাজারে এইসব করে ভিক্ষেসিক্ষে জুটত।
—আর কিছু করোনি?
—করেছি। মতিরাম পা দোলাতে দোলাতে বলে—পদ্য-টদ্য লিখতে পারতাম, বুঝলে ব্ৰজকর্তা? উদ্বাস্তু আর নেতাজি নিয়ে পদ্য ছাপিয়ে ট্রেনে বিক্রি করতাম। লোকে আমাকে দেখে হাসত, পদ্য কিনত না। দুই বাড়িতে দুবার চাকরের কাজও করেছি। সে সব পোষায় না। তারপর পাণ্ডুয়ার বাজার থেকে বহেরু ধরে নিয়ে এল, খোরাকি দেবে আর হাত খরচা। তো ভাবলাম বুড়োবয়সে আর যাই কোথা! মরার আগে কিছু জিরেন নিয়ে হাঁফ ছাড়ি বাবা। সকাল থেকে আর পেটের চিন্তা করতে হবে না। এইটুকুন তো মোটে পেট, একমুঠো ভাত দিলে ভরে যায়। তা এইটুকুনের জোগাড় করতেও কত নাচনকোঁদন লাগে বাবা।
ব্রজগোপাল বললেন—তা থাকো, এইখানেই থেকে যাও।
মতিরাম অভ্যাসবশত ফের চোখ নাচায় মুখ বিকৃত করে। বলে—তা হলে আর ভাবনা কী ছিল? এ বেশ জায়গা, কাজকর্ম নেই, ঘোরোফেরো, লোক হাসাও, খাও দাও বগল বাজাও। বহেরু বিশ্বেস মানুষের চিড়িয়াখানা খুলেছে, নতুন রকমের গ্রামপত্তন করবে—এ সবাই জানে। কিন্তু ছেলেরা বড় হারামজাদা। যেখানে যাই কপিল শালা আর ওই কোকা খুনে হুড়ো দেয়। ওরাও তোমার মতো, হাসে না। কেবল বলে—যা যা, নিষ্কর্মা গতরখাস। বহেরু পটল তুললে এরা ঠেঙিয়ে তাড়াবে। পারলে এখনই তাড়ায়। কাক শালিক, শেয়াল কুকুরেও গেরস্তর ভাত খেয়ে যায় বাবা, তেমনি কাঙাল ফকির অভাগাও খায়। এদের সহ্য হয় না। বড্ড ছোট মানুষ। আমার চেয়েও। বলে হাসে মতিরাম।
ব্রজগোপাল উত্তর দেন না। ব্যাপারটা তিনি জানেন।
মতিরাম বলে—তাই তো ভাবি বসে বসে। আমার বয়স সত্যিই পঁয়ষট্টি। লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি আর তেমন পারি না। চোখেও ছানি পড়ছে। দেখবে? দেখো না!
বলে মতিরাম লাফ দিয়ে নেমে কাছে এসে আঙুল দিয়ে চোখের পাতা তুলে দেখায়। ব্রজগোপাল দেখেন, সত্যিই বাঁ চোখের মণির মাঝখানে সাদাটে ছানি। ডান চোখেও আসছে, তবে অতটা নয়।
মতিরাম ফের চেয়ারে গিয়ে উঠে বসে বলে—আন্দাজে আন্দাজে চলাফেরা করি, কেরানি দেখাই। কোনদিন হুট করে পড়েটড়ে গেলে বুড়ো বয়সে শয্যা নিতে হবে। মাগ-ছেলে নেই যে দেখবে।
বলে ফের দুঃখের কথাতেও খি-খি করে হাসে। বোধ হয় মাগ-ছেলের কথাতেই হাসিটা আসে।
ব্রজগোপাল কোনও প্রশ্ন করেন না। মতিরাম হাসতে হাসতে নিজে থেকেই বলে—বিয়ে করতে গিয়েছিলাম দুবার। সার্কাসে থাকতে পয়সাকড়ি পেতাম কিছু এক গরিব মেয়ের বাপকে রাজি করাই পয়সাকড়ি দিয়ে। কিন্তু বিয়ে করতে যেই গেছি গাঁয়ের ছেলেছোকরা একজোট হয়ে খুব ঠ্যাঙালে আমাকে। টাকাটাও গেল। আর একবার বছর দশ আগে সিমলাগড়ের একটা পশ্চিমা ঘুঁটেউলি বিয়ে বসল। তার আগের পক্ষের বড় বড় ছেলেপুলে ছিল। তো সেই মেয়েছেলেটা আমার পয়সা হাতাত, খেতেটেতে দিতে চাইত না। শেষপর তার ছেলেরা আর সে মিলে খুব মারধর করত আমাকে। মারের চোটে পালিয়ে বাঁচি। সে কী মার বাবা!
ফের খুব হাসতে থাকে মতিরাম।
ব্রজগোপাল আস্তে করে বলেন—কেউ নেই?
মতিরাম বলে—আমিই আছি আর কাকে দরকার বাবা! একাই চলতে পারি না তো আর কেউ! বুঝলে ব্রজকর্তা, দরজির কাজ খানিকটা জানি। জামা পায়জামা বানাতে পারি, লোক হাসাতে পারি। দেখো তো একটু। কেউ রাখলে থাকব।
বলে মতিরাম উঠে দাঁড়িয়ে একটা স্যালুট করে। তারপর লেফট রাইট করতে করতে বেরিয়ে যায়। পঁয়ষট্টি বছর বয়সে ছানিপড়া চোখ নিয়ে দিব্যি আছে।
কয়েকদিনের মধ্যেই ভারী ন্যাওটা হয়ে গেল মতিরাম। এমনিতে ভাঁড়ামি করে বেড়ায়। কিন্তু ফাঁক পেলেই ব্রজগোপালের কাছে এসে বসে থাকে। পিছনে পিছনে ঘুর ঘুর করে বেড়ায়। যেমন ষষ্ঠীপদ তেমনি মতিরাম দুজনেই সারাক্ষণ ব্রজগোপালের গন্ধ শুঁকে শুঁকে তাঁর শরীরের ছায়ায় ছায়ায় ঘোরে। ব্ৰজোগাপাল তাকিয়ে মাঝে মাঝে হাসেন। প্রায় সমান মাপের দুজন। একজনের বয়স পঁয়ষট্টি, অন্যজন নেহাত শিশু। দুজনে ঝগড়াও লেগে যায় মাঝে মাঝে।
ষষ্ঠীপদ বলে—আমার দাদুকে যন্তন্না করবে না বলে দিচ্ছি।
মতিরাম মুখ ভেঙিয়ে বলে—ইঃ দাদু। বাপের সম্পত্তি নাকি রে ব্যাটা!
বড় মায়া জন্মায়। বুকের মধ্যে প্রাণপাখি ডানা ঝাপটায়। কবে খাঁচা ছেড়ে যায়। তবু কেন যে অবোধ মায়া!
শরীরটা কিছুদিন যাবৎ ভাল নেই ব্রজগোপালের। বেলপুকুরে যজমানবাড়ি ঘুরে যাজন সেরে এসে বুকে ব্যথাটা টের পেলেন ফের। ফকিরসাহেব খবর পেয়ে এসে বিছানার ধারে বসে বলেন—ওষুধ কি দেব ব্রজঠাকুর? অনুমতি পেলে দিই।
