—তোর মাটি ছাড়া চাষের দরকার কি? তোর কি মাটির অভাব?
বহেরু ঝুপ করে সুমুখে বসে পড়ে। লাজুক হেসে বলে—তা হতেও পারে একদিন। শুনি, এই সেদিন তারাদাস মাস্টারমশাই কচ্ছিলেন যে, এত মানুষ জন্মাবে পৃথিবীতে যে সব গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। শোওয়া বসার জায়গাটুকুও থাকবে না। তা তখন পৃথিবীর জমিতে তো টান পড়বেই। শিখে রাখা ভাল।
ব্রজগোপাল গম্ভীর হয়ে বলেন—তুই যে সেই মোড়লটার মতো কথা বলিস। আমার সেই যজমান মোড়লকে একদিন বলেছিলাম—বাপু হে, মাছ মাংস খেলে শরীরে টকসিন হয়, রোগবালাই হলে সহজে ছাড়তে চায় না, ওসব আর খেয়ো না। সে তখন হাতজোড় করে বলে—দাদা, মাছমাংস খাওয়া সবই ছেড়ে দিলে যে নদী পুকুর সমুদ্দুর সব মাছে মাছে মাছময় হয়ে যাবে, ঘটি ডুববে না জাহাজ চলবে না। আর ডাঙায় পাঁটা ছাগল মোরগে সব ভরে যাবে, দিনরাত চারধারে ভ্যা-ভ্যা ম্যা-ম্যা কোঁকর কোঁ আওয়াজে কান ঝালপালা। যেন বা সেই ভয়েই ব্যাটা মাছমাংস খাওয়া ছাড়তে পারে না।
বহেরু হেসে বলে—তা হলে তত্ত্বটা কী কর্তা?
—তুই তো কেবল চিরকাল তত্ত্ব শুনতে চাস। মাথায় তো কিছুই সেঁধোয় না। তবে জেনে রাখিস এই দুনিয়াটা যার সে সব দিক নিয়ে ভেবে রেখেছে। তোর আমার ওপর দুনিয়াটা পুরো ছেড়ে দেয়নি। গায়ে গায়ে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকবে, শোওয়া বসার জায়গা থাকবে না—তাই হয় নাকি রে হারামজাদা? তার অনেক আগেই মানুষে মানুষের মাংস খেতে শুরু করবে।
বহেরু বুঝল। ব্রজঠাকুরের কথা শুনলেই তার বুকের মধ্যে একটা বলভরসা এসে যায়।
ব্রজগোপাল তার হাতে কুড়িটা টাকা দিয়ে বললেন—একটু মিষ্টিটিষ্টি কিনে বাচ্চাগুলোকে খাওয়াস। আমার নাতি হয়েছে একটা, বড়মেয়ের ঘরে।
বামনবীরটাকে এনে ফেলেছে বহেরু। তার খুব ইচ্ছে ছিল লম্বা সাঁওতাল আর বেঁটে বামনকে জোড় মিলিয়ে বহেরু গাঁয়ে ছেড়ে দেবে। তারা যেখানে যাবে হাঁ করে দেখবে সবাই। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। সাঁওতালটা শয্যাশায়ী রয়েছে কমাস, এখনও মরেনি বটে কিন্তু গোবিন্দপুর আর বৈঁচী থেকে ডাক্তার এসে দেখে বলে গেছে যে, এ আর খাড়া হবে না। যে কদিন বাঁচে বিছানাতেই বাঁচবে। তাই বামনবীর লোকটা একা-একাই ঘোরে। তার ধারণা লোক হাসানোই তার একমাত্র কাজ। রঙচঙে জামা কাগজের টুপি পরে সে নানা কসরত করে তোক হাসায়। ব্রজগোপাল তাকে ভাল চোখে দেখেন না। তোক হাসানোর তাগিদে সে একবার ব্রজগোপালের কাছা টেনে আলগা করে দিয়ে দৌড়েছিল। বহেরু তাকে মারতে গেলে ব্রজগোপালই ঠেকিয়েছিলেন। কিন্তু লোকটাকে এড়িয়েই চলেন তিনি। নিজের শরীরের খুঁত বাজিয়ে ব্যাবসা করে যে লোক তাকে তাঁর পছন্দ নয়।
ব্রজগোপাল ঘরমুখো হতেই কোত্থেকে একটা শিশুর মতো বামনটা ছুটে এল। সামনে দাঁড়িয়ে একটা স্যালুট ঠুকল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে একধরনের অদ্ভুত সরু মেয়েলি গলায় বলল—ব্রজকর্তা, আপনাকে একটা কথা বলব।
ব্রজগোপাল একটু অবাক হয়ে বলেন—কী?
ঘরে এসে লোকটা টিনের চেয়ারে হামা দিয়ে উঠে বসল। বলল—আমার বয়স কত বলুন তো!
ব্রজগোপাল অনেকক্ষণ চেয়ে থাকলেন। কোনও আন্দাজ করতে পারলেন না। বললেন—কত আর হবে। বেশি নয়।
॥ বাষট্টি ॥
বামনবীরের পেটটি নাদা। দু-হাতে ঢোলের মতো চাটি মেরে পেট বাজিয়ে খি-খি করে হেসে বলে—বেশি নয়? অ্যাঁ! বেশি নয়? বেঁটে বলে সবাই ভাবে মতিরামের বয়স বুঝি বারো তেরো। তা নয় গো!
বলে বামনবীর মতিরাম খুব হাসে।
ব্রজগোপাল কিছু বিরক্ত হন। মুখে কিছু বলেন না।
মতিরাম হাসতে হাসতে চোখের জল মুছে বলল—তা ব্রজকর্তা, তোমার বয়স কত শুনি!
একটু আগে আপনি আজ্ঞে করছিল, এখন স্রেফ তুমি বলছে। তাতে ব্রজগোপাল অসন্তুষ্ট হন না। সাধারণ মানুষেরা ওরকমই বেশিক্ষণ আপনি আজ্ঞে চালাতে পারে না, মানা মানুষ দেখলে কিছুক্ষণ প্রাণপণে আপনি আজ্ঞে করে, তারপরই তুমি বেরিয়ে পড়ে।
ব্রজগোপাল বলেন—তা পঁয়ষট্টি ছেষট্টি হবে।
মতিরাম হেসেটেসে চোখ কুঁচকে, ছোট দু-খানা হাতে ব্রজগোপালকে বক দেখিয়ে বলে—দুয়ো! হেরে গেলে।
ব্রজগোপাল অসহায় ভাবে চেয়ে থাকেন।
মতিরাম মাথা নেড়ে বলে—পাল্লে না তো!
ব্রজগোপাল শান্ত গলায় বলে কীসে পারলাম না?
—বয়সে। বলে মতিরাম আবার বিকট মুখভঙ্গি করে বলে—আমারও পঁয়ষট্টিই।
কথাটা ব্রজগোপাল বিশ্বাস করলেন না। কিন্তু কিছু বললেনও না।
মতিরাম চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে এক পা তুলে দু-খানা হাত নুলোর মতো পেটের দুদিকে ভাঁজ করে, দাঁত বের করে চোখ পিটপিট করল কিছুক্ষণ। তারপর হুপ করে মেঝেয় লাফিয়ে নেমে বিচিত্র কায়দায় হাতের ওপর ভর করে পা দুটো পিছন দিকে ঘুরিয়ে নিজের কাঁধের ওপর তুলে দিয়ে ব্যাঙের মতো লাফাল খানিক। মুখে অবিরল ব্যাঙ ডাকার শব্দ। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাতটাত ঝেড়ে বলল—দেখলে, মতিরামের বয়স হলে কী হয়। এখনও অনেক খেলা দেখাতে পারে।
—দেখলাম। ব্রজগোপাল উদাস উত্তর দেন।
মতিরাম আবার হামাগুড়ি দিয়ে চেয়ারে উঠে বসে ঠ্যাং দোলাতে দোলাতে খুব বিরক্তির সঙ্গে বলে তুমি হাসো না কেন বললা তো! সার্কাসে আমি বিশ বচ্ছর জোকার ছিলাম, কত লোককে হাসিয়েছি। এখনও গাঁয়েগঞ্জে সব জায়গায় আমাকে দেখলেই লোকে হাসে। আর যখন মজাটজা বা খেলাটেলা করি তখন তো কথাই নেই। হাসতে হাসতে গর্ভবতীর প্রসব হয়ে যায়, মানুষ পুত্রশোক ভুলে যায়, মরা মানুষ পর্যন্ত শ্মশানে যাওয়ার পথে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে ফেলে। তুমি হাসো না কেন বাবু? ব্যারাম-ট্যারাম নেই তো?
