ফকিরসাহেব মাথা নেড়ে বলেন, ইটিন্ডাঘাটে এক বুজরুক ছিল, ঘরে বসে সে নাকি কলকাতার নামি দোকানের রসগোল্লা কিংবা অসময়ের ল্যাংড়া আম খাওয়াত। লোকে বলত, তার পোষা ভূত আছে, সে-ই সব এনে দেয়। খবর পেয়ে দেখতে গেলাম লোকটাকে, কিন্তু আমার ফকিরি চেহারা দেখেই লোকটা ঘেবড়ে গেল। কিছুতেই আর রসগোল্লা বা আম আনারস আনতে রাজি হয় না। লোকজনের বিস্তর ঝোলাঝুলি সত্ত্বেও বলে আজ আমার শরীর ভাল না। পরে আমাকে আড়ালে ডেকে বলল—আপনি তো সবই জানেন, ভাঙবেন না। বলে ফকিরসাহেব হাসলেন, বললেন—ব্রজঠাকুর, আদতে কিন্তু আমি কিছুই জানি না। আমি লোকটার ঐশী শক্তি দেখতেই গিয়েছিলাম, ভাল হাতসাফাই হলে ধরতেও পারতাম না।কিন্তু লোকটা ভয় খেয়ে সব স্বীকার করে ফেলল।
ব্রজগোপাল বলেন—আমার বড় জামাইও কার পাল্লায় পড়েছে শুনছি। ছোকরার ধর্মকর্মের ওপর খুব রাগ ছিল, এখন নাকি পথে পথে কেত্তন করে চাঁদা তোলে, কোথায় আশ্রম করবে। ঘরে পোয়াতি বউ পড়ে থাকে, আর সে বাবা বাবা’ বলে গুরুর নামে চোখের জল ফেলে নামগান করে। তা গুরুর নামে চোখের জল আসে সে ভালই, কিন্তু এসব তপ্ত আবেগ তো বেশিক্ষণ টেকে না। একদিন চটকা ভাঙলেই ছিটকে যাবে। তখন হয় ধর্মকর্মের ওপর মহা খাপ্পা হয়ে উঠবে, নয়তো সাত গুরু ধরে বেড়াবে। এও বড় ভয়ংকর অবস্থা। তারচেয়ে নাস্তিক ছিল, সে ঢের ভাল ছিল। নিষ্ঠাবান নাস্তিকেরও উদ্ধার আছে, দুর্বলচিত্তরাই উদ্ধার পায় না।
ফকিরসাহেব নিমীলিত চোখে চেয়ে রইলেন।
পিরের কবর অনেক দূর। গাছগাছালির আড়াল পড়েছে। সেই দূর থেকে কে যেন হাঁক পাড়ে—ব্রজকর্তা, ও ব্রজকর্তা!
কোকা কিংবা কালিপদ হবে। আজকাল একটুক্ষণ বাইরে থাকলে বহেরু চারধারে লোকজন পাঠাতে থাকে। তা সেই লোকজনেরা কেউ এতদূর আসতে সাহস পায়নি। গাঁ গঞ্জের মানুষ সব, এমনিতে সাহসের অভাব নেই। কিন্তু ফকিরসাহেবের আস্তানায় সন্ধের পর ঢুকতে চায় না কেউ। পায়ে পায়ে সাপ ঘোরে। তার ওপর লোকে জানে, এ সময়টায় ফকিরসাহেব ভূত আর পরি নামান। অনেকে দেখেছে ক্ষুদে ক্ষুদে পরি গাছের পাতায় পাতায় দোল খায়। জিন ঘুরে বেড়ায়, ভূত এসে ফকিরসাহেবের পা দাবায়, পাকা চুল বেছে দেয়। সেইসব ভয়ে কেউ ঢোকে না। ভূতের গায়ের গন্ধ অনেকটা বুড়ো পাঁঠার গায়ের গন্ধের মতো, সেই বিদঘুটে গন্ধে নাকি তখন জায়গাটা ম ম করে। মরার পর মেঘু ডাক্তারও নাকি এখানে থানা গেড়েছে। তাই কেউ আসে না।
একমাত্র ব্রজগোপাল আসেন। সঙ্গে একটা টর্চবাতি থাকে, আর একটা মজবুত লাঠি।
ফকিরসাহেব বললেন—ওই আপনার শমন এসেছে।
—হ্যাঁ। যাই।
ফকিরসাহেব হেসে বলেন—আমরা দুই ফকির এক ঠাঁই থাকতে পারতাম তো বেশ হত। তাঁর দয়ায় কথা বলতে বলতে একটু কাঁদতাম দুজনে। কী বলেন?
ব্রজগোপাল একটা শিহরিত আনন্দের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—ওই হচ্ছে কথা। তাঁর কথাই হচ্ছে কথা।
টর্চবাতি আর লাঠি নিয়ে উঠলেন। টর্চ ফেলতেই একটা বিশাল দৌড় দিল। চাতালের ঠিক নীচেই মাথা তোলা দিল বাদামি রঙের গোখরো। টর্চ আর লাঠি দু-বগলে চেপে নিয়ে হাততালি দিলেন ব্রজগোপাল। সাপটা ধীরেসুস্থে উত্তরবাগে সরে গেল। ব্রজগোপাল মুখ ঘুরিয়ে বললেন—এ জায়গায় বড় মধু। পরম পিতা খোদার ভক্ত থাকেন তো, ইতরজীবও তাই টের পায় এ জায়গায় ভালবাসার তাপ রয়েছে।
—আল্লা মালিক। ফকিরসাহেব বললেন।
ব্রজগোপাল হাঁটতে থাকেন।
ঘরে এসে একটা পোস্টকার্ড পেলেন তিনি। লণ্ঠনের আলোটা উসকে পড়তে লাগলেন। বুধবার রাত বারোটা কুড়ি মিনিটে শীলার একটি ছেলে হয়েছে। প্রসবে খুব কষ্ট পেয়েছে শীলা, রক্ত দিতে হয়েছে। শীলার কষ্টের কথা আরও অনেকখানি লিখেছেন ননীবালা। জামাই বাড়ি ছিল না। ছেলে হওয়ার পর সে খবর পেয়েছে। তারপর জামাইয়ের সাম্প্রতিক স্বভাবের ওপরেও অনেকটা লেখা, ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষর পড়তে গিয়ে চোখে জল চলে আসে। আরও লিখেছেন, ছেলেরা আজকাল তাঁর খোঁজখবর করে না। বীণার ব্যবহার ভাল নয়। ইত্যাদি।
ব্রজগোপাল চিঠি রেখে পঞ্জিকা খুলে বসলেন। কাগজ কলম নিয়ে নিবিষ্টমনে কোষ্ঠীর ছক তৈরি করতে লাগলেন নাতির। মনটায় বেশ একটা ফুর্তির হাওয়া খেলছে। নাতি হয়েছে। আরও তো কটা নাতি-নাতনি আছে তাঁর, তবু এই যে একটা রক্তের সম্পর্কিত মানুষছানা জন্মাল, এই খবরটাই কেমন একটা মায়া সৃষ্টি করে বুকের মধ্যে।
একটা লোক এনেছে বহেরু যে মাটি ছাড়াই গাছ গজিয়ে দিতে পারে। সেই শুনে বহেরু তাকে হাওড়া না কোত্থেকে ধরে এনে কদিন জামাই আদরে রেখেছে। একটা বেশ বড়সড় জায়গা বাঁশ-বাঁখারি দিয়ে ঘিরে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কী সব কাণ্ড মাণ্ড হচ্ছে। এই রাতেও সেখানে দু-দুটো ডে-লাইট ঝুলছে জাম আর সজনে গাছের সঙ্গে। মেলা লোকজন তামাশা দেখতে ভিড় করেছে। এখন সেখানে মাটি কেটে কেটে সিমেন্ট জমিয়ে চৌখুপি করা হচ্ছে সেইখানেই চাষ হবে।
ব্রজগোপাল বাইরে এসে দূর থেকে ভিড়টা দেখলেন। সেই ভিড়ে একমাথা উঁচু বহেরু কোমরে হাত দিয়ে জমিদার-টমিদারের মতো দাঁড়িয়ে।
ব্রজগোপাল ডাকতেই বহেরু ছুটে আসে।
—কর্তা ডাকলেন নাকি?
—তুইও ছেলেমানুষ হলি নাকি?
বহেরু হাসে, বলে—না, কায়দাটা দেখে রাখছি, কী করে করে। দরকার হলে নিজেরাই করতে পারব।
