বলে অপেক্ষা করল না। চলে এল।
সেই লক্ষ্মণ। ডাকলে বরাবর বেরিয়ে আসত।
অজিত এইটুকুই চায়। আর কিছু নয়। আর কেউ না হলেও খুব ক্ষতি নেই। কেবল লক্ষ্মণ হলেই চলে যায়। ডাকামাত্র সে আসে। যাকে বলতে হয় না হৃদয়ের দুঃখ বিষাদের কথা। বুঝে নেয়।
ট্যাক্সিতে লক্ষ্মণের পাশে বসে, নিজের হাতের আঙুলে কপাল ছুঁইয়ে জিত তার কান্নার বাঁধ ভেঙে দিচ্ছিল। নিঃশব্দ কান্না। কেবল লক্ষ্মণ টের পায়। চুপ করে থাকে। অজিতের ভিতরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। চৈত্রের সেই আগুন লাগা ক্ষেতের ওপর ঘন মেঘ। ধারাজলে নিভে যাচ্ছে আগুন।
॥ একষট্টি ॥
এইখানে এক পিরের কবর। তার চার ধারে বাঁশঝাড়, আর শিমূল আর শিরীষ গাছের জড়াজড়ি। একটা ভাঙা বাড়ির ইটের স্তূপের ওপর সবুজ শ্যাওলা জমেছে। তার ভিতর দিয়েই মেঠো রাস্তা। ভাঙা বাড়িটার ভিতরবাগে এখনও গোটা দুই নোনা-ধরা ঘর খাড়া আছে। ছাদ ধসে পড়ে গেছে, তাই ওপরে টিনের ছাউনি। মেঝেতে অজস্র ফাটল, অশ্বথের শিকড় দেখা যায় দেওয়ালের ফাটলে। দিনে-দুপুরে ঘরের চারপাশে পায়রা ডাকে, রাতে চামচিকে আর বাদুড়। হাতখানেক লম্বা পাকা তেঁতুলের রঙের তেঁতুলবিছে লসলস করে হেঁটে যায় এক ফাটল থেকে অন্য ফাটলে। বর্ষায় উঁচু হুল বাগিয়ে তুরতুর করে তেড়ে যায় কাঁকড়া বিছে। আর ইটের স্থূপে ইদুরের গর্তে, ভিতের ফাটলে বাস্তু সাপের প্রকাণ্ড সংসার। মুহুর্মুহু দেখা যায় ধূসর রঙের গোখরো দাওয়া পেরিয়ে যাচ্ছে, বর্ষার রোদ উঠলে অজস্র জাত সাপের বাচ্চা ফাঁকায় বেরিয়ে কিলবিল করে, মাটির ওপর ঢেউ খেয়ে খেয়ে ধীরে ধীরে চলে যায় চন্দ্রবোড়া।
এইখানে থাকেন ফকিরসাহেব, হাজি শেখ গোলাপ মহম্মদ ওস্তাগার। ব্রজগোপাল ছাড়া এ নাম আর কেউ জানে না। সবাই জানে ফকিরসাহেব বলে। এই ভাঙা বাড়ি তাঁর নয়। এক ভক্ত মুসলমান মরবার আগে সমস্ত সম্পত্তি দিন দুনিয়ার মালিক আল্লাহর নামে ওয়াকফ করে দিয়ে যায়। সম্পত্তি বলতে অবশ্য ভাঙা বাড়িটাই—যা একসময়ে প্রকাণ্ড ছিল, জাঁকজমকও ছিল হয়তো। এখন দাবিদার কেউ নেই। সেই ভক্তজনই ফকিরসাহেবকে এখানে বসিয়ে দিয়ে যায়। ফকির থাকেন। প্রতি পদক্ষেপে সাপের দাঁত, বিছের হুল, পাখি-পক্ষীর পুরীষ। ফকিরসাহেব গ্রাহ্য করেন না।
সন্ধেয় আজ প্রকাণ্ড পূর্ণিমার চাঁদ উঠল। ফকিরসাহেব মোমবাতি নিভিয়ে দিয়ে বললেন—চলুন, দাওয়ায় গিয়ে আল্লার আলোতেই বসি, সেই ভাল।
ব্রজগোপাল গম্ভীর ভাবে বললেন—হুঁ।
দুজনে বাইরের খোলা চাতালে এসে বসলেন। ফকিরসাহেব জ্যোৎস্নার আভায় ব্রজগোপালের মুখখানা দেখে নিয়ে বলেন—কীরকম আওয়াজ শোনেন ধ্যানের সময়ে।
ব্রজগোপাল বলেন—সে বড় ভীষণ আওয়াজ। সহস্র ঘণ্টার ধ্বনি, সহস্র শাঁখের আওয়াজ। পাগল করে দেয়। আর একটা নীল আলোর পিণ্ড হঠাৎ ফেটে গিয়ে চারধারে আলোর ফুলঝুরি ছড়াতে থাকে। তখন বড় ভয় করে, আবার আনন্দও হয়।
ফকিরসাহেব মাথা নেড়ে বলেন—গুরুর কৃপা।
ফিসফিস করে ব্রজগোপাল বলেন—যত দিন যাচ্ছে তত স্পষ্ট হচ্ছে। কান বন্ধ করলে একরকমের শব্দ শোনা যায়, ছেলেবেলায় শুনতাম সে নাকি রাবণের চিতার শব্দ। বলে। হাসলেন ব্রজগোপাল। ফকিরসাহেব মাথা নাড়লেন। ব্রজগোপাল বলেন—আসলে তা তো নয়। আমাদের দেহযন্ত্রের মধ্যে যে অবিরল বেঁচে থাকার কারখানা চলছে ও হচ্ছে তারই শব্দ। আমাদের বহির্মুখী ইন্দ্রিয়গুলি তা ধরতে পারে না। তেমনি ধ্যানে বসে মনটা কূটস্থে ফেলে দিলে সৃষ্টির মূল শব্দ পাওয়া যায়। আপনি বিশ্বাস করেন না?
ফকিরসাহেব মৃদু হাসলেন, বললেন—ব্রজঠাকুর, পথ একই, বিশ্বাস করব না কেন? আমি কি অবিশ্বাসী বিধর্মী? শব্দ শব্দেই তাঁর লীলা টের পাই।
বলে একটা শ্বাস ফেললেন ফকিরসাহেব। মুখে পান ছিল। সেটা আবার চিবোতে চিবোতে এক টিপ দোক্তা ফেললেন মুখে। জ্যোৎস্নায় একটা মোরগ ভুল করে ডেকে উঠল। হাত কয়েক দূরে জ্যোৎস্নায় একটা সাপকে দেখা গেল খোলা হাওয়ায় বেড়াচ্ছে। ফকিরসাহেব একটা হেঁচকি তুলে বললেন—যা যা…
সাপটা আস্তে ধীরে ইটের পাঁজার ওপর উঠে গাছের ছায়ায় মিলিয়ে গেল। সেদিকে চেয়ে থেকে ফকিরসাহেব নিমীলিত নেত্রে বললেন—ব্রজঠাকুর, শব্দের কথা মানুষকে বলবেন না। ওরা বিশ্বাস করবে না, ভাববে বুজরুকি।
—বুজরুকেরও অভাব নেই। ব্রজগোপাল উদাস গলায় বলেন—এখন শুনি অনেক ম্যাজিকওয়ালা সব গুরুঠাকুর সেজে বসেছে। আহাম্মকেরা তাদের কাছে ভগবান বলে ধেয়ে যায়। বুদ্ধিমান লোকে তাই বুজরুকি বলে পুরো ধর্মকেই অগ্রাহ্য করে। এ বড় ভীষণ অবস্থা।
জ্যোৎস্নাতে কাক ডেকে উঠছে। নিঃশব্দ বাদুড় ঝুলে পড়ল শূন্যে, চাঁদের চারধারে পাক খেয়ে মিলিয়ে গেল। ভারি নিঃঝুম চারদিক। কেবল মাঝে মাঝে রাতের শব্দ হয়। পাখির অস্পষ্ট ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ, ঝিঁঝি ডাকছে অবিরল, গাছে গাছে ফিসফিস কথা, আর কখনও টিকটিকি ডাকে, কখনও তক্ষক। চারধারে গাছগাছালির ছায়া নিবিড় হয়ে পড়ে আছে। পাতানাতা মাড়িয়ে একটা শেয়াল দৌড়ে গেল, পিছনে দূরে কোনও গেরস্তর কুকুর তাড়া করে এল খানিক দূর।
দুজনেই আসনপিঁড়ি হয়ে মুখোমুখি বসে আছেন। চারধারে মানুষের সাড়া নেই কোথাও। কিন্তু পৃথিবীর গভীর ও রহস্যময় প্রাণস্পন্দনে সজীব আবহ। আকাশে বৃক্ষে ও মাটিতে কত কোটি কোটি প্রাণ বেঁচে আছে। টের পাওয়া যাবে।
