হঠাৎ বিদ্যুৎ স্পর্শে চমকে ওঠে অজিত। তাই তো! আজ লক্ষ্মণ এসেছে। বহুকাল পরে, বহু যুগ পরে। সম্ভবত জন্মান্তর থেকে এসেছে লক্ষ্মণ। তার কাছেই কি চলে যাবে অজিত। লক্ষ্মণের কাছে গেলে মাঝখানের এই কটা বছর মুছে যাবে। সেই কলেজের ছোকরা হয়ে যাবে অজিত! লক্ষ্মণের কাছে গেলে আর চিন্তা নেই, বয়স নেই। দুজনে চিনেবাদাম ভাঙতে ভাঙতে আজ ময়দানে হাঁটবে। আর লক্ষ্মণ তাকে আকাশতত্ত্ব বোঝাবে। বলবে অসীম শূন্যতা আর নিরবধি সময়ের কথা। সংসারের স্মৃতি থাকবে না, মৃত্যুর ভয় থাকবে না, শীলার কথা মনে পড়বে না! অজিত উঠে জামা পরল। ঝিকে ডেকে বলল—আমি বেরোচ্ছি। সদর বন্ধ করে দে।
—ও মা! চা করতে বললে যে!
—করতে হবে না।
বলে অজিত বেরিয়ে গেল।
রাস্তায় বেরিয়েই তার মনে হল, সে বড় অপরাধ করেছে শীলার প্রতি। সে চার দিন বাড়ি ফেরেনি। চারটে দিন সে উপেক্ষা করেছে, অবহেলা করেছে। শীলা তো তেমন কিছু অন্যায় করেনি। বড় ভাল মেয়ে শীলা। ভাবতে বুকের মধ্যে এক চৈত্রের ফাঁকা মাঠে হু হু করে যেন শুকনো খড়-নাড়া তৃণের জঙ্গলে আগুন লেগে গেল। বড় দহন। বড় জ্বালা। চার দিন সে কি করে আসন্নপ্রসবা শীলাকে ভুলেছিল?
এ সময়ে বাস-টাস চোখেই পড়ে না অজিতের। বড় রাস্তা থেকে ট্যাক্সি নিল। কোথায় যাবে তা হঠাৎ এখন আবার ঠিক করতে পারছিল না অজিত। শীলা কোন হাসপাতালে আছে তা জানে না। জানলেও লাভ নেই। ভিজিটিং আওয়ার সব হাসপাতালেই শেষ হয়ে গেছে। ভাবল, কালীঘাটে লক্ষ্মণের বাসায় যায়। পরক্ষণেই মনে হয়, শীলার একটা খোঁজ পেলে। নিশ্চিন্ত হওয়া যায়, তারপর লক্ষ্মণের কাছে যেতে ভাল লাগবে।
দু-তিনবার মত পালটে অবশেষে ঢাকুরিয়ার শ্বশুরবাড়ির কাছেই চলে আসে অজিত। ভিতরে ঢুকতে সাহস হয় না। ট্যাক্সিটা দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে নামে। ওপরদিকে তাকিয়ে উৎকর্ণ বুঝতে পারে না। তারপর মনে হয়, একটা মেয়ে-গলার কান্নার আওয়াজ খুব ক্ষীণ শোনা যাচ্ছে। মনটা নিভে গেল। তা হলে শীলা…! ওপরে আলো জ্বলছে, জানালায় পরদা, বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। কিন্তু কান্নার শব্দটাই জানান দিচ্ছে, এ বাড়ির কেউ…।
মাথাটা গরম। ফের ট্যাক্সিতে বসে সে বলল—গাড়ি ঘুরিয়ে নিন। কালীঘাট যাব। একটু তাড়াতাড়ি।
ট্যাক্সি চলে। অজিত চুপ করে বসে থাকে। তার চারধারে কলকাতার কোলাহল নেই, আলোর অস্তিত্ব নেই, বর্তমান নেই। এক নিস্তব্ধ, সময়হীন অনন্ত পরিসরে ভিতরে কেবল তাকে গতিময় রেখেছে বেঁচে থাকাটুকু। নিস্তব্ধতায় ভাসমান শব্দহীন একটা স্পেসক্রাফটে বসে আছে সে। সে বেঁচে আছে, কিন্তু কিছু বোধ করছে না।
লক্ষ্মণ লক্ষ্মণ ঠিক ফিরেছে তো! নাকি গিয়ে দেখবে যে লক্ষ্মণ গিয়েছিল তার নির্মোক পরে অন্য একজন সুখী মোটা সাহেবি মানুষ এসেছে! লক্ষ্মণকে নিয়ে তার বড় ভয়।
ট্যাক্সি ঠিক জায়গায় থামল। অজিত ভাড়া মিটিয়ে নামল। কিন্তু রাস্তার নির্দেশ দেওয়া থেকে ভাড়া মেটানো, বা দরজা খুলে নামা, এ সবই সে করেছে এক অবচেতন অবস্থায়। সে। টের পাচ্ছে না যে সে কী করছে।
লক্ষ্মণদের দরজা খোলাই রয়েছে। খুব আলো জ্বলছে আর অনেক লোকের ভিড়। অজিত দরজায় দাঁড়িয়ে ভিতরে তাকাতেই একদম সোজা লক্ষ্মণের চোখে চোখ পড়ল। খালি গা, একটু ধুতি পেঁচিয়ে বসে আছে। তাকে দেখেই লাফিয়ে উঠল—এলি? এসকেপিস্ট কোথাকার! এয়ারপোর্টে তোকে কত খুঁজেছি।
একলাফে এসে লক্ষ্মণ তাকে জড়িয়ে ধরল। কানের কাছে মুখ, বলল—চলে এলাম। বুঝলি?
অজিত চোখের জল কষ্টে সামলায়। হেসে বলে—চলে এলি মানে? পার্মানেন্টলি?
লক্ষ্মণ মাথা নাড়ল—না, আর একবার যাব। তারপর ফিরে আসব।
অজিত নিবে গিয়ে বলে—তোকে বিশ্বাস নেই। গেলে যদি আর না আসিস!
ঠিক বটে, লক্ষ্মণ কিছু মোটা হয়েছে, একটু ফরসাও। কিন্তু মুখচোখের সেই দীনভাব আজও যায়নি। ওর ঠোঁটের গঠনে লুকনো আছে একটা চাষির সরলতা, চোখ এখনও স্বচ্ছ ও অকুটিল। সেই লক্ষ্মণ।
লক্ষ্মণ বলল—আমি ভাবছিলাম, তুই তো এসকেপিস্ট, বরাবর ঘটনা এড়িয়ে চলিস। তাই বুঝি এয়ারপোর্টে ভিড়ের মধ্যে পাছে দেখা হলে একটা সিন হয় সেই ভয়ে যাসনি।
অজিত মাথা নেড়ে বলে—না রে। আমি আজ বিকেলে ফিরেছি। তখন চিঠি পেলাম।
লক্ষ্মণ চারদিকে চেয়ে বলল—এখানে বড় ভিড়। খবর পেয়ে সবাই এসেছে। এখানে তো কথা হবে না।
অজিত খুব আন্তরিকতার সঙ্গে বলল—শোন লক্ষ্মণ, শীলা হাসপাতালে। অবস্থা খুব খারাপ। হয়তো এতক্ষণ বেঁচেও নেই বলতে বলতে অজিতের গলা বন্ধ হয়ে গেল।
লক্ষ্মণ চরকির মতো ঘুরে দাঁড়াল—বলিস কী? তুই এই অবস্থায় শীলাকে ফেলে এসেছিস?
—এলাম। বলতে গিয়ে চোখ ভেসে গেল অনিচ্ছাকৃত অশ্রুতে। ঠোঁট কাঁপল, তবু হাসবার চেষ্টা করে অজিত বলে—এলাম। তোর কাছে। তোকে দেখতে। আজ চলি। পরে দেখা হবে।
অজিত বেরিয়ে এল। এখন বয়স হয়ে গেছে। এখন কি আর সেই বয়ঃসন্ধির কালের মতো বন্ধুর আশ্রয় ভিক্ষে করতে হয়! এই বয়সে নিজের আশ্রয় হতে হয় নিজেকেই।
বেরিয়ে আসছিল, পিছন থেকে লক্ষ্মণ চেঁচিয়ে বলল—দাঁড়া। এক মিনিট।
অজিত দাঁড়াল। লক্ষ্মণ তার সেই লুঙ্গি করে পরা ধুতির ওপর একটা পাঞ্জাবি চড়িয়ে বেরিয়ে এল, পিছন ফিরে কাকে যেন বলল—আমি অজিতের সঙ্গে যাচ্ছি। আজ হয়তো ফিরব না।
