দুপুরের আগেই সুভদ্র চলে গেল, ইস্কুল আছে। সোমেন কোথাও গেল না। খোলা মাঠের মধ্যে বসে ভাবতে লাগল, বড়দিকে সে বরাবর খুব অবহেলা করেছে। কত ডাকত বড়দি, কতবার বলেছে—একা থাকি, আমাদের কাছে এসে কদিন থাক না সোমেন! কতবার বড়দি তাকে দামি জামা প্যান্ট দিয়েছে, নগদ টাকাও দিয়েছে অনেক। সেই বড়দি কোথায় কোন বিপুল অলক্ষ্যে মিশে মিলিয়ে যাবে! আর কখনও, কোনওদিন দেখা হবে না।
দুপুরে শীলার খাবার নিতে একবার বাসায় ফিরল সোমেন। খাবার নেওয়া বৃথা। বড়দি তো খায় না, আয়াই খেয়ে নেয়। তবু খাবার নিতে বাসায় না গেলে ননীবালা চিন্তা করবে। বাসায় এসে কোনওক্রমে কাকস্নান সেরে দু-গ্রাস অনিচ্ছের ভাত খেয়ে নিল সোমেন। ননীবালা উদ্বেগের গলায় জিজ্ঞেস করেন—কেমন আছে রে?
ভেঙে বলল না সোমেন। কেবল বলল—ওইরকমই।
টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ফের হাসপাতালে এসে ওয়ার্ডে ঢুকে ভয়ংকর চমকে গেল সোমেন। বড়দির বিছানার পাশে স্ট্যান্ডে সেই স্যালাইন বা গ্লুকোজের ওলটানো শিশি, রবারের নল ঝুলছে। লাল কম্বলে দিদিকে চেপে ধরে আছে বুড়ি আয়া। আর বড়দির প্রচণ্ড একটা কাঁপুনি উঠেছে। মুখ সাদা, ঠোঁট মরা মানুষের মতো ফ্যাকাশে, দুটো চোখে দৃষ্টি নেই। কেবল মুখে একটা অবিরল ‘হু—হু—হু—হু’ শব্দ করছে। আয়া বলল, শিরায় ছুচ ফোটানোর সঙ্গে সঙ্গে রিগার উঠেছে। তাই উঁচ খুলে ফেলা হয়েছে। কিন্তু একটু বাদেই আবার দেবে। ইঞ্জেকশনটা ওই শিশির তরল পদার্থের সঙ্গে মেশানো আছে।
সোমেন দৃশ্যটা দেখতে পারল না। খাবার রেখে বেরিয়ে এল। কী অমানুষিক কষ্ট পাচ্ছে বড়দি, ভেবে বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সোমেন ফের চোখের জল মুছল।
বিকেলের দিকে ওয়ার্ড ভরে গেল লোকে। রণেন, ননীবালা, সুভদ্র, আর সুভদ্রর সঙ্গে শীলার স্কুলের আরও পাঁচ ছজন দিদিমণি। এত লোককে ঢুকতে দেয় না। কিন্তু সুভদ্র কী করে ম্যানেজ করেছে। শীলার জ্ঞান প্রায় নেই। মুখে গ্যাঁজলা উঠছে। আর গভীর বেদনার দীর্ঘ ধ্বনি বুক থেকে উঠে আসছে কখনও।
একবার সেই অবস্থাতেই বড় বড় চোখ মেলে কাকে যেন খুঁজল চারদিকে। পেল না। ব্যথায় প্রচণ্ড মুখ বিকৃত করে চোখ বুজল। দুটো হাতের মুঠো মাঝে মাঝে ভীষণ শক্ত হয়ে যাচ্ছে। বালিশের ওয়াড় খিমচে ধরে টানছে এক-একবার। ফের নরম হয়ে যাচ্ছে শরীর। আবার ব্যথার ঢেউ আসছে।
ননীবালা শীলার হাতের আঙুল টেনে দিচ্ছেলেন। মাঝে মাঝে মেয়ের কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলছেন—ও শীলা, ব্যথাটা কি একটু অন্যরকম টের পাস? ঝলকে ঝলকে ব্যথা আসছে কি?
শীলা সে কথা শুনতে পায় কিনা কে জানে! এক-একবার ককিয়ে ওঠে। শুধু ননীবালার হাতটা খিমচে ধরে বলল—ও কোথায় মা? ও কেন আসছে না? যার জন্য আমার এত কষ্ট সে একবার এসে দেখে যাক যে আমি মরে যাচ্ছি। ও কি রাগ করেছে মা? অ্যাঁ!
বলেই ফের ব্যথায় ডুবে গেল শীলা। প্রবল ককিয়ে উঠল।
সোমেন পালিয়ে এল। পিছন থেকে সুভদ্র এসে ধরল তাকে। সামনের লনে দাঁড়িয়ে দুজনে সিগারেট ধরায়।
৬০. সরকার একটা খেলা দেখাতেন
॥ ষাট ॥
সরকার একটা খেলা দেখাতেন। বার্ডস ফ্রম নোহোয়ার। চমৎকার খেলা। একেবারে শূন্য থেকে অজস্র সজীব ডানা-ঝাপটানো পাখি ধরে আনতেন। নিস্তব্ধ মঞ্চ হঠাৎ ভরে যেত ডানার শব্দে, কাকলিতে। কী চমৎকার খেলা! তার কৌশলটা আজও অধিকাংশ ম্যাজিশিয়ানের কাছে অজানা।
অনেকবার চেষ্টা করেছে অজিত। পারেনি।
কয়েকটা পাখি কিনে রেখেছে সে। বারান্দায় খাঁচায় ঝোলানো আছে। ঝি মেয়েটা তাদের দানাপানি দেয়। অজিত সন্ধেবেলা চুপ করে সেই খাঁচাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে পাখিরা ডানা ঝাপটাল কয়েকবার। ভয়ের শব্দ করল। এখন ঝিমোচ্ছে। অজিত চেয়ে থাকে। সে পাখি দেখছে না, সে ম্যাজিকের কথা ভাবছে না। তার কেবল মনে হচ্ছে শীলাকে সে বড় অন্যায় সন্দেহ করেছিল। শীলা যদি না বাঁচে তবে তাকে অন্তত এ কথাটা জানিয়ে দেওয়া দরকার যে, অজিত বড় অন্যায় করেছিল তার প্রতি। পাখিদের দেখে কেন কথাটা মনে হল, কে জানে।
ঘরে এসে সে ঝিকে চা দিতে বলল। এই নিয়ে বোধ হয় পাঁচবার চা হল। আর সিগারেট? না, তার কোনও হিসেব নেই। বিকেল থেকে সে অবিরল সিগারেট টানছে। এখন আর ধোঁয়ার কোনও স্বাদ নেই। আলোতে একবার দুটো হাত চোখের সামনে তুলে ধরল। দেখল, আঙুল স্থির নেই। হাত কাঁপছে। একটু বাদেই কেউ আসবে। বলবে—শীলা নেই। সেই অমোঘ ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করছে সে। কী করবে? কিছু করার নেই। যা হওয়ার হোক।
মনে পড়ে, এ বাড়িটা শীলার তাগাদাতেই করেছিল সে। কত প্ল্যান করে, কত শখের নকশায় তৈরি করা বাড়ি! শীলা নিজের গয়না দিয়েছে, কষ্টের রোজগারও ঢেলেছে কম নয়। বুকের পাঁজরের মতো আগলে থেকেছে। মানুষ কী ভীষণ মরণশীল: কেমন হুট বলতেই সব রেখে চলে যেতে হয়!
গরম চায়ে জিব পুড়ে গেল অজিতের। গ্রাহ্য করল না। তিন চার চুমুক খেয়েই উঠে হঠাৎ ফুলপ্যান্ট পরতে লাগল। না, যাই গিয়ে একবার দেখে আসি। ফুলপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে। জামাটা গায়ে দিতে গিয়েই ফের মনে হয়—থাকগে। ও দৃশ্য আমি দেখতে পারব না।
ফের চায়ের কাপ নিয়ে বসে অজিত। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। আবার ঝিকে ডেকে চা দিতে বলে। সিগারেট ধরায়। হাত দুটো দেখে। আর বিড়বিড় করে বলে—তোমার ওপর নেই ভুবনের ভার…।
