শীলা মাথা নেড়ে বলল-বুঝেছি।
সুভদ্র বেখেয়ালে আবার সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিল, শীলার চোখে চোখ পড়ায় ‘সরি’ বলে আবার প্যাকেটে ঢুকিয়ে রাখল সিগারেট। বললে—ওই লোকটা, ওই কুমারস্বামীর এরকম কিছু গুণ আছে। খুব স্মার্টও বটে। একবার শুনেছি কালকা মেল-এ কোথাও যাওয়ার জন্য। হাওড়ায় গেছে। টিকিট-ফিকিট নেই। করল কী, গার্ডের ব্রেকের সামনে গিয়ে পায়চারি করতে লাগল। পরনে গেরুয়া পোশাক, গেরুয়া পাগড়ি, ভাল চেহারা। গার্ড সাহেব বোধ হয় গাড়ি ছাড়বার আগে কাগজপত্র দেখছিলেন। গার্ডকে জানালা দিয়ে ভাল করে স্টাডি করে নিল লোকটা। মানুষকে স্টাডি করার ক্ষমতা এদের অসাধারণ। বুঝল গার্ড লোকটা দুঃখী, চিন্তাগ্রস্ত।কী একটু অনুমান করে নিয়ে হঠাৎ গার্ডের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল—ভাবছিস কেন, সেরে যাবে। শুনে গার্ড আত্মহারা হয়ে এসে চেপে ধরল কুমারস্বামীকে—বাবা, তুমি কে? আমাকে বাঁচাও বাবা। কুমারস্বামী তখন ভারী মজার হাসি হেসে বললেন—তোর টানে আটকা পড়েই এখানে ঘোরাফেরা করছিলাম। আমি সাউথ ইস্টার্নের গাড়ি ধরতে যাব, কিন্তু কিছুতেই তোর কামরা আর ছাড়তে পারি না। এই শুনে গার্ড কি আর ছাড়ে! জোর করে নিজের ব্রেকভ্যানে তুলে নিল কুমারস্বামীকে। বলল—বাবা, ওসব হবে না। আমি তোমাকে মাথায় করে রাখব। আমার সব সমস্যার কথা তোমাকে শুনতেই হবে। কুমারস্বামী তখন কেবলই কাতরভাবে বলে—ওরে, এগারো নম্বর প্ল্যাটফর্মে আমার শিষ্যরা সব দাঁড়িয়ে আছে ফার্স্ট ক্লাশের টিকিট কেটে, আমাকে আজ রাতেই জগন্নাথধাম রওনা হতে হবে যে! কে শোনে কার কথা! গার্ড সাহেব কুমারস্বামীকে ব্রেকভ্যানে তুলে নিয়ে গেল। পরে শুনেছি, সেই গার্ডের বউ ভাল হয়েছে, গার্ডেরও প্রমোশন হয়েছে। কাকতালীয় ব্যাপার। কিন্তু তাতে কুমারস্বামীর নাম যা ফেটেছিল!
শীলা খুব মৃদু একটু হেসেই গম্ভীর হয়ে গেল। খুব চাপা কিন্তু দৃঢ়স্বরে বলল—সুভদ্র, আপনাদের অজিতদা কিন্তু গার্ড সাহেব নন। ওঁকে ঠকানো অত সোজা নয়।
সুভদ্র ঈষৎ গম্ভীর হয়ে ঘাড় হেলিয়ে বসে বলল—বুঝলাম, আপনি পতিগর্বে গরবিনী। অজিতদাকে আমিও খুব শ্রদ্ধা করি ওঁর পলিটিক্যাল আইডিয়ালের জন্য। তাই খুব অবাক হয়েছি। কিন্তু আমি জানি শীলাদি, কুমারস্বামী ইজ এ ফ্রড।
ট্যাক্সি ঢাকুরিয়া ব্রিজ পার হতেই শীলা বল—সুভদ্র, আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন আমার বাপের বাড়িতে?
সুভদ্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল—যেতে পারি।
শীলা কিন্তু অস্বস্তি বোধ করছিল। তার বাড়িতে কেউ সুভদ্রকে চেনে না। মা, বউদি এরা সবাই একটু সেকেলে। হুটহাট ছেলেছোকরাদের সঙ্গে ওঠা বসা ভাল চোখে দেখে না। কে কী মনে করবে কে জানে! সুভদ্রই বা ওরকম বেহায়া কেন? ও কি বুঝতে পারছে না যে, এখন শীলা ওর সঙ্গ চাইছে না? পুরুষেরা চিরকালই কি একটু ভোঁতা, কম সেনসিটিভ? না শীলা ভেবে দেখল তা নয়। তার স্বামী অজিত খুব আত্মসচেতন। কখনও মেয়েদের সঙ্গে গায়ে পড়ে মেশে না। মরে গেলেও কোনও মেয়ের সঙ্গে কখনও যেচে আলাপ করেনি অজিত। শীলার মনে পড়ল, বিয়ের পর দীর্ঘকাল অজিত শীলার কাছে শরীরের দাবিই করেনি। তারা এক বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে আদরে সোহাগে গল্প করত। অজিত শরীর চাইত না। সেটা শীলার খুব ভাল লেগেছিল। প্রথম কত সংকোচ থাকে মেয়েদের। সেটা কেটে গেলে একদিন শীলাই অজিতের বুকে মুখ রেখে আধোস্বরে বলেছিল—এবার পাথরটা ভাঙুক। তুমি নাও আমাকে।
মনে পড়ার পরই শীলা আপনমনে একটু হাসল। বড় সুখের স্মৃতি। পরমুহূর্তেই মনে পড়ল, কাল রাত থেকে অজিত ফেরেনি। ঠোঁট কেঁপে উঠল শীলার। পোড়া চোখ গলে যায় বুঝি কাঁদতে কাঁদতে। এত কান্না শীলা কখনও কাঁদেনি। পেটের দুধার থেকে চিন চিন ব্যথা উঠছে।
॥ উনষাট ॥
তিন দিন যেন এই সামান্য পৃথিবীর কেউ ছিল না অজিতের। তার জীবনের সাধারণত্ব থেকে ওই তিন দিন সে বিদায় নিয়েছিল। রবিবারে অজিত ফেরেনি। সোমবারেও না। ফিরতে ফিরতে বুধ হয়ে গেল। সোমবার থেকেই সে কীর্তনের দল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। সুখচরে আশ্রমের জন্য জমি দেখা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটই খবর এনেছে। হাজার দশেকের মতো জমির দাম পড়বে, আশ্রমের জন্য আরও না হোক ষাট-সত্তর হাজার টাকা কুমারস্বামী হেসে বললেন—ওসব তোমরা বোঝো গিয়ে। টাকার হিসেব আমি জানি না। শুধু বলি, আমার বড় ইচ্ছে তোমাদের কাছে থাকি। তোমরা কীভাবে রাখবে তা তোমরা জানো।
পরের সকালেই অজিত পাঁচ হাজার টাকার চেক কেটে দিল। যখন চেক সই করছিল তখন হঠাৎ একটু দুর্বলতা এল বুঝি! এত টাকা, রক্ত জল করা টাকা চলে যাচ্ছে! কুমারস্বামী তারদিকেই চেয়েছিলেন। তীব্র কিন্তু বরদা, শঙ্কাহরণ দৃষ্টি। অজিত সই করে দিল। আরও অনেকেই দিয়েছিল। দুই দিনে জমির দাম উঠেও হাজার দশেক টাকা বাড়তি হল। ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই জমি কিনতে চলে গেলেন। সবাই বলাবলি করছিল, শুভ কাজ আটকে থাকা ঠিক নয়, জমি কিনলেই ভিতপত্তন করতে হবে। বাকি টাকা আসবে কোথেকে? একজন মেজো-মধ্যম ফিলম স্টার আসেন রোজই। বয়স্ক লোক। তার বাজার পড়তির দিকে। তিনি বললেন—এ আর বেশি কথা কী? বাবার জন্য না হয় রাস্তায় নেমে পড়ব। আমি একসময়ে স্ট্রিট সিংগার ছিলাম, সেই অবস্থা থেকে উঠেছি। আমার কোনও সংকোচ নেই। যদি সবাই রাজি থাকে তো কীর্তনের দল নিয়ে ভিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
