তো তাই হল। অজিত গানবাজনা প্রায় জানেই না। তবু এক ভক্তের কাছ থেকে ধুতি চেয়ে নিয়ে পরল, খালি গায়ে খুঁটটা জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল দলের সঙ্গে। সে কী উল্লাস! কী আনন্দ! দুধারে গৃহস্থ মানুষেরা দোকান পসারে ঘুরছে, সওদা করছে, বিষয়কর্মে রত রয়েছে, আর সে এক সুমহান উদ্দেশ্যে পথের ধুলোয় নেমে মহানন্দে ভিক্ষা করতে করতে চলেছে। নিজেকে এই প্রথম বড় মহৎ লাগল অজিতের। কীর্তনের সঙ্গে গলা মেলানোর কষ্ট নেই। সেই উদ্দণ্ড কীর্তনে গলা ছাড়লেই মিলে যায়। চোখে জল আসে। গায়ের কাপড় খসে খসে পড়ে। আর মনে হয়, আমিই তো নিমাই। ঘরে শচীমাতা কাঁদছেন, বিষ্ণুপ্রিয়া মূৰ্ছিতা, তবু নিমাই চলেছে প্রেম বিতরণে। নদীয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছেন নদের নিমাই।
সেই যে ভাব এল অজিতের তিন দিন সে আর স্বাভাবিক অজিত ছিল না। অফিস থেকে এসে কুমুদ বোস আর সেনদাও দেখে বলে গেছে—তাজ্জব! অজিতের মধ্যে যে এত বড় ভক্ত লুকিয়ে ছিল কে জানত! তুমি বড় ভাগ্যবান হে অজিত আমরাই পিছটান ছিঁড়ে আসতে পারলাম না। এই বলে কুমুদ বোস কেঁদেও ফেলেছিল।
তিন দিন অফিস করেনি অজিত। বাড়িতে আসেনি। তিন দিন বাদে বিকেলের দিকে সে ট্যাক্সিতে ফিরছিল টালিগঞ্জে। বুকটা অল্প কাঁপছে। যদিও নিশ্চয়ই শীলাকে কেউ না কেউ খবর পাঠিয়েছে, তবু মনটা বড় অশান্ত লাগে। শীলাকে ছেড়ে সে কখনও থাকেনি। একা বাড়িতে শীলা ভয় পায়নি তো! পা পিছলে পড়েটড়ে যায়নি তো! শীলা কি ভাল আছে? বুকটা কাঁপে, একটা শ্বাসকষ্ট হয়। আবার কুমারস্বামীকে দেওয়া পাঁচ হাজার টাকার কথা ভাবে। এ টাকাটার কথা শীলার কাছে গোপন করতে হবে। শীলা টের পেলে…।
বাড়িতে এসে অজিত অবাক। বাচ্চা ঝিটা দরজা খুলেই সরে গেল। অজিত ঢুকে দেখে ঘরদোর খাঁ খাঁ করছে। অজিত বলল—কী রে? তোর বউদি কোথায়?
মেয়েটা খুব বিপন্ন মুখ করে বলে—বউদি নেই।
—কোথায় গেছে?
—হাসপাতালে।
অজিত স্তম্ভিত হয়ে থাকে। কিছু জিজ্ঞেস করতে আর সাহস হয় না।
মেয়েটা নিজ থেকেই বলে—সোমবার সেই যে দাদাবাবু আসে, তার সঙ্গে ট্যাক্সিতে চলে গেল। আর আসেনি। বউদির ছোট ভাই রাতে এসে খবর দিল—বউদি হাসপাতালে। বউদির ভাই এসে রাতে থাকে, আর সারাদিন আমি একা।
অজিত ধপ করে বসে চোখ বুজে বলল—কী হয়েছে জানিস?
—না। বউদির ভাই শুধু বলে, খুব খারাপ অবস্থা।
অজিতের শরীরে বিদ্যুৎ খেলে আতঙ্কের। একবার তড়িৎ গতিতে উঠে বসল ও। যাবে! এক্ষুনি যাবে! পরমুহূর্তেই বুঝল, তার হাত পা কাঁপছে, অবশ লাগছে। তিন দিনের সুগভীর ক্লান্তি কাকের কালো ডানার মতো শরীর আর মনের সব শক্তিতে ঢেকে রেখেছে। সে একবার ককিয়ে উঠল যন্ত্রণায়। চুপ করে বসে রইল। ঘড়িতে সময় দেখল, কিন্তু কটা বেজেছে তা বুঝতেও পারল না। ঢক ঢক করে অনেক জল খেয়ে গেল, তবু বুকটা যেমন শুকনো ছিল তেমনই রইল। শীলা কি বেঁচে আছে এখনও?
টেবিলের ওপর কয়েকটা চিঠি পড়ে আছে। তার মধ্যে একটা লক্ষ্মণের এয়ারোগ্রাম। সেটা খুলে অজিত আরও অবাক। প্রথমেই লিখেছে—বুধবার সকালে দমদমে পৌঁছেছি। এয়ারপোর্টে থাকিস।
ফের লাফিয়ে উঠল অজিত। বুধবার! বুধবারটা কবে?
তারপরই হতাশ হয়ে বসে পড়ল ফেরা সময় নেই। আজই বুধবার। লক্ষ্মণ আগে এসে গেছে।
তিনদিন ধরে রোজ ননীবালা তিন বেলা খাবার সাজিয়ে টিফিনের বাক্সে ভরে দেন। তিনবেলা খাবার বয়ে নিয়ে হাসপাতালে আসছে সোমেন। কিন্তু খাবে কে? শীলার ভাল করে চেতনা আসছে না। যতক্ষণ ভাল থাকে ততক্ষণ যন্ত্রণায় চিৎকার করে। দম ফুরিয়ে গেলে গোঙায়। মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যায়। বিকেলের ভিজিটিং আওয়ারসে ননীবালা। এসে বসে থাকেন মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে। জ্ঞান থাকলে শীলা মায়ের হাঁটু চেপে ধরে ফুপিয়ে উঠে বলে—মাগো, আমাকে বিষ এনে দাও। নয়তো ডাক্তারকে বললা বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দিক। এ যন্ত্রণা সহ্য হয় না।
ননীবালা পাঁচবার মা হয়েছেন, তার মধ্যে একটা সন্তান বাঁচেনি। সেই রণো হওয়ার সময়ে একরকমই চার-পাঁচদিন ধরে ব্যথায় কষ্ট পেয়েছেন তিনি। আঁতুড়ঘরের চারধারে সে এক গেঁয়ো বর্ষা নেমেছিল সেবার। অকালের বর্ষা, সৃষ্টি রসাতলে যায় যায়। ব্রজগোপাল বাউণ্ডুলেপনা করতে কোন মুলুকে উধাও হয়েছেন, সাতদিন ধরে পাত্তা নেই, শ্বশুর-ভাসুরদের উকি দেওয়া বারণ, এক জগদ্ধাত্রীর মতো শাশুড়িই তখন আগলে রেখেছিলেন ননীবালাকে। একজন হোমিওপ্যাথ ওষুধ দিত। আর ধাই ছিল মোতায়েন,কিন্তু হুট বলতেই পেট কেটে ছেলে বের করে দেবার যে রেওয়াজ এখন চালু হয়েছে সে সব তখন কারও মাথাতেও আসেনি গাঁয়েগঞ্জে, ছেলে হতে গিয়ে কত মা মরেছে। চারদিন ধরে নাগাড়ে ব্যথা সহ্য করার পর পাঁচদিনের দিন চাঁদমুখ দেখে সব জ্বালা জুড়িয়ে গেল। কোলজোড়া শান্তশিষ্ট ছেলে। শাশুড়িকে এইটুকুই দেখাতে পেরেছিলেন ননীবালা। সেই অকালের বর্ষা থামল, আর শাশুড়িও চলে গেলেন। যেন রণোকে নিজের আত্মা দান করে গেলেন।
ননীবালা মেয়ের মাথায় জপ করে দিতে দিতে বলেন—ওসব বলিস না। হলে দেখবি, বাচ্চার কত মায়া। চাঁদমুখ দেখলে সব ব্যথার কথা ভুল পড়বে।
শীলা ব্যথায় নীল হয়ে মার গায়ে কিল মেরে বলে—উঃ মা, ওসব বোলো না, বোলো না এ ব্যথা যেন শত্রুরও না হয়। আমি বাচ্চা চাই না, আমার ব্যথা সারাতে বলো ডাক্তারদের। আবার ওই ব্যথার মধ্যেও অনুযোগ দেয় শীলা—আমাকে কেন নার্সিং হোমে রাখোনি তোমরা? হাসপাতালে কেউ থাকতে পারে? আমি ঠিক মরে যাব। তোমাদের জামাইকে খবর দাও, সে ঠিক এসে ভাল নার্সিং হোমে নিয়ে যাবে আমাকে, সে কখ্খনো এভাবে হাসপাতালে ফেলে রাখত না আমাকে? কেন তোমরা ওকে খবর দিচ্ছ না? নিশ্চয়ই ওর কিছু হয়েছে। বলতে বলতে ফের জ্ঞান হারায় শীলা। আবার যখন চেতনা আসে তখন পূর্বাপর কিছু ভাবতে পারে না, যন্ত্রণার কথা বলে, আবার যখন মনে পড়ে তখন অজিতের কথা বলে কেঁদে ওঠে—ওর ঠিক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আমার এ সময়ে নাহলে ও আসছে। না কেন? ওর এত সাধের সন্তান, ও আসছে না কেন?
