শীলা মাথা নেড়ে বলে—সুভদ্র, ওসবে দরকার নেই। আমি কুমারস্বামীকেও চটতে চাই না। বহুকাল বাদে আমাদের সন্তান হতে যাচ্ছে, আমরা খুব ভয়ে ভয়ে আছি। এ সময়ে কারও অভিসম্পাত আমাদের পক্ষে ভাল হবে না।
সুভদ্র দাঁড়িয়েছিল। হতাশভাবে বসে পড়ে বলল—আপনিও এরকম? অভিসম্পাত বলে কিছু আছে, কিংবা তাতে কারও কোনও ক্ষতি হয় এটা কি আজকাল কেউ মানে?
শীলা বিরক্ত হয়ে বলে—আমি তর্ক করতে চাই না। এটা তর্কের সময় নয়। বিয়ের পর এই প্রথম আমরা একসঙ্গে থাকিনি। প্রবলেমটা আপনি বুঝবেন না। একটা ট্যাক্সি ডেকে আনুন, আমি গিয়ে সোমেনকে পাঠাব।
—যাচ্ছি। বলে সুভদ্র উঠল। দরজার কাছ বরাবর গিয়ে ফিরে বলল—আপনি নিজে যাবেন না?
শীলা মাথা নেড়ে বলল—না।
—কেন? আপনার কিন্তু যাওয়া উচিত।
—না সুভদ্র, আমার এ অবস্থায় ওসব লোকের কাছে যাওয়া উচিত নয়। ওরা কত কী করতে পারে! হয়তো রেগে গিয়ে আমার সন্তান নষ্ট করে দেবে। আমি যাব না।
সুভদ্র একটু হাসল, বলল—কিন্তু অজিতদা আপনি গিয়ে দাঁড়ালেই চেঞ্জ হয়ে যাবেন।
শীলা বড় বড় চোখে সুভদ্রর দিকে চেয়েছিল। কিন্তু সে সুভদ্রকে দেখছিল না। সে চেয়ে থেকে বহুদূর পর্যন্ত নিজের বিবাহিত জীবনটাকেই দেখতে পাচ্ছিল। ক্রমান্বয়ে একসঙ্গে এক বিছানায় থেকেও এই দীর্ঘকালে তারা যেন কিছুতেই স্বামী-স্ত্রী হয়ে উঠতে পারেনি। কোথাও একটা তার আলগা হয়ে আছে। একটা স্ক্রু ঢিলে, তারা পরস্পরের প্রতি গভীর বিশ্বস্ত নয়।
শীলার ঠোঁট কাঁপল, মাথাটা নড়ে উঠল। অস্ফুট গলায় বলল—ও আমাকে ভালবাসে না সুভদ্র। নইলে কেন কাল রাতে ও ফেরেনি? কেন ফেরেনি…।
বলতে বলতে শীলা উঠে দৌড়ে চলে গেল শোওয়ার ঘরে। বিছানায় উপুড় হয়ে শুতে গিয়েই ভুল করল শীলা। আবেগে খেয়াল ছিল না। মস্ত বড় হয়েছে পেট, তার মধ্যে ছেলে। উপুড় হতে গিয়ে বিছানার কানায় একটু ব্যথা পেল শীলা। ব্যথাটা খেয়াল করল না। কাঁদতে লাগল।
একটু বাদে ট্যাক্সির ভেঁপু বাজতে উঠে শাড়ি পালটাতে লাগল। তখনও পেটে একটা ফিক ব্যথা লেগে আছে। ব্যথার অস্ফুট শব্দ করল শীলা। সাড়ে আটমাস চলছে। আয়নায় দেখল, তার ঠোঁট দুখানা সাদা, মুখটাও কেমন যেন। ক্লিষ্ট একটু হেসে আপন মনে বলল— ও ছেলে, তোর বাপটা এমন পাগল কেন রে? আমাকে কেন একটুও ভালবাসে না বল তো! আমি কি হ্যাক ছিঃ?
ট্যাক্সির এক কোনে সুভদ্র, অন্য কোনে শীলা। মাঝখানে অনেকটা দূরত্ব। শীলার চোখ দুটো এখনও চাপা কান্নায় লাল হয়ে আছে। মাঝেমধ্যে আঁচলে চোখ মুছছে। এ সময়ে কান্না লুকনো যায় না। কাল রাতে বাসায় না ফিরে অজিত যেন শীলার পায়ের তলার মাটি ভয়ংকর ভূমিকম্পে কাঁপিয়ে দিয়েছে। ও কেন অমন করল কাল? ও কি জানে না শীলা ওকে কত ভালবাসে?
—কুমারস্বামী সম্বন্ধে আপনি কী জানেন সুভদ্র? শীলা খুব গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।
সুভদ্র সস্তা সিগারেট খায়। আজকাল কোনও কোনও গন্ধ শীলার সহ্য হয় না। ছেলেটা পেটে আসার পর থেকেই সে যেমন ভাতের গন্ধ সহ্য করতে পারে না, সেন্টের গন্ধ, সিগারেটের গন্ধ, দেশলাইয়ের গায়ের গন্ধ পেলেই বমি পায়। সুভদ্র সিগারেট ধরিয়েছে, শীলা নাকে রুমাল চাপল। একবার ওয়াক করল। সামলে গেল। সুভদ্র তাকিয়ে আছে। শীলা দ্রুত, নিচু গলায় বলল—সিগারেট ফেলে দিন, প্লিজ।
সুভদ্র সঙ্গে সঙ্গে সিগারেট ফেলে দেয়। বলে—শরীর খারাপ নয়তো শীলাদি৷
বহুকাল শীলাকে দিদি বলে ডাকে না সুভদ্র। আজ ডাকল। শীলা একবার তাকিয়ে ফের কাঁপা ঠোঁটে বলল—আমি আর বেশিদিন বাঁচব না, জানেন? এই বাচ্চাটার জন্ম দিতেই আমার সব ভাইটালিটি শেষ হয়ে যাবে।
—কী সব আবোলতাবোল বলছেন!
শীলা বাইরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে বলে—মরে গেলে খুব ভাল হবে। ও বুঝবে আমি ওর কী ছিলাম। সারা জীবন বুক চাপড়াবে। একথা বলেই শীলা আবার ভ্রু কোঁচকায়। মাথা নাড়ে। আপন মনেই বলে—অবশ্য তা হয় না। পুরুষ-মানুষদের তো চিনি। মাসখানেক কান্নাকাটি করবে, হা-হুতাশ করবে, তারপর ফের টোপর মাথায় ছাঁদনাতলায় গিয়ে দাঁড়াবে। ততদিন যদি বাচ্চাটা থাকে তো সেটা গিয়ে পড়বে সৎমায়ের হাতে। মাগো! ভাবতে পারি না
সুভদ্র খুব হাসল, বলল—কত ভাবনা ভেবে রেখেছেন! মরেই যদি যাবেন তো অত ভাবনা কেন? মরার পর যা খুশি হোক, আপনি তো দেখতে আসছেন না।
শীলা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে—কে বলল দেখতে আসব না! ঠিক আসব। দরকার হলে ভূত হয়ে এসে সতীনের ঘাড় মটকাব।
সুভদ্র বেসামাল হেসে বলে—একেই বলে উইল পাওয়ার।
শীলা গম্ভীর হয়ে বলে—কুমারস্বামী সম্বন্ধে আপনি কী জানেন বললেন না!
সি এম ডি এ আনোয়ার শা রোড খুঁড়ে ফেলেছে, চওড়া হচ্ছে রাস্তা। তাই ট্যাক্সি রসা রোড ধরে অনেক ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে।
সুভদ্র মৃদু হেসে বলে—লোক ঠকানোর জন্য যা যা দরকার এ লোকটার সব আছে। সুন্দর চেহারা, চমৎকার কথাবার্তা, খুব ভাল কীর্তন করে। একবার’ওর কীর্তন শুনে আমার মতো পাষণ্ডের চোখেও জল এসেছিল।
—বলেন কী! কীর্তন শুনে! তা হলে আপনারও ওসব দুর্বলতা আছে!
সুভদ্র মাথা নেড়ে বলল—না। কিছুমাত্র ধর্মীয় দুর্বলতা আমার নেই। একজন বাঙালি হিন্দু পরিবারের ছেলের পক্ষে যতখানি অবিশ্বাসী হওয়া সম্ভব আমি ততখানি অবিশ্বাসী। তবে কী জানেন শীলাদি, ওই কীর্তন-টির্তন যারা বানিয়েছে তারা ছিল মস্ত সাইকোলজিস্ট। মানুষের প্রবণতা এবং সেন্টিমেন্টের জায়গায় ঘা দেওয়ার মতো করেই তারা ওইসব গান তৈরি করে গেছে। তেমন তেমন কীর্তন শুনলে ঘোর নাস্তিকেরও চোখে জল আসবে। তার কারণ ধর্মভাব নয়, কতগুলি মানবিক ভাবপ্রবণতা। আর আমিও তো পাষণ্ড নই। বলে হাসল সুভদ্র, হঠাৎ চমৎকার সুরেলা গলায় একটা লাইন গাইল শীলাকে চমকে দিয়ে— রন্ধনশালাতে যাই, তুয়া বঁধু গুণ গাই, ধূয়রি ছলনা করি কাঁদি…গেয়ে উঠেই বলল—এ গান শুনলে কার না হৃদয় কোমল হয়।
