পেটের মধ্যে বাচ্চাটা নড়েচড়ে। মাঝখানে বর্ষাকালটা শরতের গোড়ার দিকেই ছেলে হওয়ার কথা। বর্ষাটাও এবার জোর নেমেছে। কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। সন্ধের কিছু পর একটা লোক গাড়ি করে এসে খবর দিয়ে গেল অজিত আজ ফিরবে না। কুমারস্বামীর কাছে থাকব।
রাতে শীলার ভাল ঘুম হয়নি। দুশ্চিন্তা। কুমারস্বামীর কথা সে আজকাল খুব শোনে অজিতের মুখে। অজিত বলে—এতদিনে একটা যথার্থ মানুষ দেখলাম, যার ক্ষমতা আছে।
শীলা দেখেনি। কিন্তু মনের ভিতর কেমন একটা সন্দেহ মাথা চাড়া দেয়। সে শুনেছে এই ধরনের মানুষেরা সম্মোহন জানে, গুপ্তবিদ্যা জানে। মারণ উচাটন কত কী করতে পারে। তাই একটা অনির্দিষ্ট ভয় আর সন্দেহ হয়। অজিত আজকাল সন্ধের পর ওইখানেই থাকে, অনেক রাতে ফেরে। কাল ফিরল না। তার মানে এখন প্রায় রাতেই এরকম হবে। মাঝে মাঝে ফিরবে না। কালক্রমে একেবারেই ফিরবে না হয়তো। কে জানে!
আজ সকাল থেকেই শরীরটা খারাপ করেছে। অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে শীলা অনেক বেলায় উঠল। পেটের মধ্যে সারারাত দস্যি ছেলে ফুটবল খেলে আজকাল। পরিষ্কার টের পাওয়া যায়, ছেলেটা একবার পেটের এপাশে ঠেলে উঠছে, একটু বাদেই আবার ওপাশে মাথা চাড়া দেয়। ওর কি গরম লাগে পেটের ভিতর? ওর কি খিদে পায়? ও কি মাকে দেখার জন্য খুব অস্থির?
পরদিন রবিবার। সারাসকাল অজিত এল না। দুপুর গড়িয়ে গেল। শীলা অল্প একটু খেয়ে এসে শুয়ে রইল। খাওয়ার ইচ্ছেই ছিল না, কিন্তু সে না খেলে ছেলেটাও পেটের মধ্যে উপোসী থাকবে, সেই ভয়ে খেল। প্রাণটা বড় আনচান করে আজ। বিয়ের পর কখনও এমন হয়নি যে তারা প্রায় বিনা কারণে পরস্পরকে ছেড়ে থেকেছে। খুব ভেবে দেখল শীলা, না তারা একদিনও কেউ কাউকে ছেড়ে থাকেনি। কাল রাতেই প্রথম।
ঠিক দুপুর গড়িয়ে সদরের কড়া নড়ে উঠল। একটু ঝিমুনি এসেছিল শীলার, তবু ঝাঁকি খেয়ে উঠল। এতই ত্রস্ত পায়ে ছুটে এল যে আঁচলটা পর্যন্ত কুড়োনোর সময় হয়নি। দীর্ঘ আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছিল। আগ্রহে ব্যর্থতায় সে তাড়াতাড়ি ছিটকিনি খুলে খুব হতাশ হল। অজিত নয়। সুভদ্র।
সুভদ্র একমুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে। অথচ শীলা তখন হাঁ করে তাকিয়ে। যেন বা তার বিশ্বাস হচ্ছে না যে, অজিত আসেনি। শীলার মুখের দিকে চেয়েই সুভদ্রর হাসি মিলিয়ে গেল। বলল কী হয়েছে?
শীলা সচেতন হয়ে তার আঁচল কুড়িয়ে নিল। কোনও কথা না বলে পিছু ফিরে চলে এল ভিতরে। পিছনে সুভদ্র। একবার অস্ফুট গলায় সুভদ্রকে বসুন’ বলে শীলা বাথরুমে চলে গেল সোজা। দরজায় ছিটকিনি তুলে দিল। দুপুরে যা খেয়েছে সব অম্বল হয়ে উঠে আসছে গলায়। বুকে চাপ ব্যথা। গলায় আঙুল দিয়ে টক জল বমি করল শীলা। ঠান্ডা জলে মুখচোখ ঘাড় গলা ভিজিয়ে নিল।
অনেকক্ষণ বাদে ফিরে এসে বলল—সুভদ্র, আমাকে একটা ট্যাক্সি ডেকে দেবেন?
—কেন বলুন তো! সুভদ্র খুব উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে—কী হয়েছে আপনার?
এতক্ষণ কেবল দুশ্চিন্তা ছিল। শুকনো গলা শুকনো মুখ নিয়ে সময় কাটিয়েছে শীলা। সুভদ্রর প্রশ্ন শুনে হঠাৎ বুকেরমধ্যে কান্নার বিদ্যুৎ চমকায়। বৃষ্টি আসে।
কান্নাটা কিছুতেই চাপতে পারে না শীলা। ঠোঁট কেঁপে ওঠে, চোখ ভরে নির্লজ্জ জল জমে উঠে গাল ভাসিয়ে নামে। আঁচলে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ থম ধরে থাকে সে তারপর বলে— বাপের বাড়ি যাব।
—কেন?
—ও কাল রাতে ফেরেনি। বলে শীলা শূন্যের দিকে একটু চেয়ে থাকে। সুভদ্র ‘ফেরেনি?’ বলে যে বিস্ময় প্রকাশ করে তার কোনও উত্তর দেয় না শীলা। অন্যমনস্কভাবে বলে—আমার ছোট ভাইকে পাঠাব একটু খোঁজ নিতে।
—অজিতদা কোথায় গেছেন আপনি জানেন?
—জানি। কুমারস্বামী নামে একজন সিদ্ধপুরুষের কাছে।
সুভদ্র ভারী অবাক হয়ে বলে—কুমারস্বামী? গর্চা লেনের কুমারস্বামী নাকি? ডাক্তার হেমেন বিশ্বাসের বাড়িতে যে থাকে!
শীলা বড় বড় চোখ তুলে বলে—আপনি জানেন?
মুখটা বিকৃত করে সুভদ্র বলে—জানব না কেন? একটা ফ্রড। আমার বাবাও ওর পাল্লায় পড়েছিল। অনেক কষ্টে ছাড়িয়েছি।
শীলা আগ্রহের সঙ্গে বলে—ফ্রড?
সুভদ্র হঠাৎ অদ্ভুত হেসে বলে—অজিতদা ওর পাল্লায় পড়লেন কী করে? উনি তো পলিটিক্স করা লোক, এল আই সিতে ট্রেড ইউনিয়ন করেছেন, পাক্কা মার্কসিস্ট মানুষ, উনি ধাপ্পায় ভুলবার লোক তো নন!
শীলা একটু অসন্তুষ্ট হয়। বলে—সুভদ্র, অত কথা বলছেন কেন? এখন কথার সময় নেই। দেরি হলে আমি গিয়ে সোমেনকে পাব না। ও বেরিয়ে যাবে।
সুভদ্র সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে বলে—আপনার ভাইকে পাঠানোর দরকার কী? প্রয়োজন হলে আমিই যেতে পারি, আপনিও সঙ্গে চলুন, সোজা কুমারস্বামীর ডেরায় গিয়ে কেলো করে দিয়ে অজিতদাকে ধরে আনব। ইয়ারকি নাকি! কার্ল মার্কসের ভক্তকে একটা ফ্রড হামবাগ হিপনোটাইজ করে রেখে দেবে? দরকার হলে….
শীলা ধমক দিয়ে বলল—খুব হয়েছে। এটা কার্ল মার্কস ভারসাস কুমারস্বামীর লড়াই নয় সুভদ্র। এটা আমার খুব ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি আমার স্বামীকে চিনি, ও ঝট করে কাউকে শ্রদ্ধাভক্তি করে না। হইহই করে ওকে ফেরানো যাবে না।
সুভদ্র বিরক্তির শব্দ করে বলে—সে না হয় হইচই না করলাম, কিন্তু অজিতদা তো খুব লজিক্যাল লোক, ওঁকে তো ব্যাপারটা বোঝাতে পারি! যে লোকটা রিজন মানে তাকে বোঝানো সহজ।
