মধুমিতার মুখখানা আর একবার ভাল করে দেখে নিল সোমেন। দেয়ালের গায়ে টেলিফোন বাজছে। মধুমিতা চমকে উঠে দাঁড়াল, বলল—কে ডাকছে!
বলে ছুটে গেল। কী গভীর আগ্রহে তুলে নিল টেলিফোন, বলল—জয়! ওঃ জয়! কমরেড, কাল চলে যাচ্ছি। আই লাভ ইউ ডারলিং, ইউ নো…
ঠান্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছে কণ্ঠনালী বেয়ে। তবু ভিতরের জ্বর উপশম হচ্ছে না সোমেনের।
সোমেন উঠে দাঁড়াল। টেলিফোন রেখে চলে এল মধুমিতা, অবাক হয়ে বলল—চলে যাচ্ছ! আড্ডা মারবে বললে যে!
—না, যাই। বেলা হল, মা বসে থাকবে।
মধুমিতার চোখ একটু ছলছলে হয়ে এল, কিন্তু হাসিটা অনাবিল রইল মুখে হঠাৎ ডান পাশের গালটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল—কিস মি গুডবাই।
সোমেন ঠোঁট দিয়ে স্পর্শ করল না, হাত দিয়ে ছুঁল ওর গাল, বলল—ভাল হবে। তোমার ভাল হবে।
মধুমিতা তার হাতটা দুহাতে চেপে নিজের গালে ঘষল খানিক। আবেগে, ভালবাসায়। বলল—আর কখনও দেখা হবে না। মধুমিতাকে মনে রেখো।
কোনওদিন কাঁদে না সোমেন। আজ রাতে একা শুয়ে চোখের জলে বালিশ ভেজাল। নিজের মনে নিজেকে ডেকে বলল—কিল ইয়োরসেলফ, কিল ইয়োরসেলফ রাস্কেল।
॥ আটান্ন ॥
কুমারস্বামী সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন—কি খাবি তোরা? অ্যাঁ! আম খাবি, নাকি রসগোল্লা? অজিত, তুই?
অজিত আজকাল একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। জলে ডুব দিলে যেমন চারদিক আবছায়া দেখায়, তেমনি তার বাস্তববোধ বড় আবছা। সে অপলকে কুমারস্বামীর দিকে চেয়েছিল। প্রশ্ন শুনে একটু নড়ে উঠে গভীর শ্বাস ছেড়ে বলে—আপনি যা দেবেন।
ভক্তবৃন্দ অপলকে চেয়ে আছে কুমারস্বামীর দিকে। সবাই জানে, এবার বাবা বিভূতি দেখাবেন। কারও শ্বাস পড়ে না। কুমারস্বামী খুব সপ্রতিভ হেসে হাতটা শূন্যে তুলে এত দ্রুত আঙুলের একটা ঘূর্ণায়মান মুদ্রা তোলেন যে আঙুলগুলো যেন অদৃশ্য হয়ে যায় বাতাসে। পরমুহূর্তেই দেখা যায় তাঁর হাতে একটা ভ্যাকুয়াম প্যাকড রসগোল্লার টিন।
—জয় বাবা! জয় বাবা! ধ্বনি করে ওঠে ভক্তেরা। সেই প্রথম দিন এসে অজিত যে ম্যাজিস্ট্রেটকে চিত হওয়া অবস্থায় দেখেছিল আজ সে পাশেই বসেছে। সে লোকটা অজিতের উরু খামচে ধরে বলে উঠল—দেখেছেন! ইনিই হচ্ছেন দি গড। দি গড!
এই বলে লোকটা সম্মোহিতের মতো এগিয়ে গিয়ে কুমারস্বামীর পা ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু তাঁর সব সময়ের জন্য যাঁরা সেবায় নিযুক্ত আছেন এমন অন্তরঙ্গ শিষ্যদের একদল ধমক দিয়ে বলল—ছোঁবেন না! ছোঁবেন না!
লোকটা ফিরে এসে অজিতের পাশে বসে বলল—মনে ছিল না, হাইপারসেনসিটিভ অবস্থায় ওঁকে ছুঁতে নেই।
কুমারস্বামী আবার হাত বাড়িয়ে একই মুদ্রায় দ্রুত কয়েকটা আম পেড়ে আনলেন শূন্য থেকে। ডাকলেন—অজিত!
অজিত মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিল। পামিং নেই পাসিং নেই, কোটের ভিতর থেকে কোনও গুপ্ত ইলাস্টিকের ব্যান্ড দিয়েও আনা হচ্ছে না, তবু কোথা থেকে আম আসছে। রসগোল্লার টিন আসছে! এই কি তা হলে বহুশ্রুত অলৌকিক? এই কি সিদ্ধপুরুষ!
—আজ্ঞে। অজিত নীলডাউনের ভঙ্গিতে বসে বলল।
—কী খুঁজছিস? পামিং আর পাসিং? বলে চমৎকার ভরাট প্রাণময় হাসি হাসেন কুমারস্বামী। মাথা নেড়ে বলেন—ওসব নয় রে!
বলে কুমারস্বামী খুব অন্যমনস্ক হয়ে বসে রইলেন। যিশুর মতো সুন্দর মুখশ্রী কেমন বিষন্ন হয়ে গেল! তাঁর অন্তরঙ্গ শিষ্যরা কৌটো খুলে রসগোল্লা বিতরণ করছে সবাইকে, আম ভাগ করে দিচ্ছে। মহাপ্রসাদ বলে সবাই কাড়াকাড়ি করে। ঠিক এই সময়ে কুমারস্বামী খুব নিচু, অদ্ভুত কান্নায় ভরা মাদক গলায় গাইতে থাকলেন—হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে…। কোথা থেকে একটা ছোট্ট খঞ্জনির শব্দ হতে লাগল। ঘরের আলোটা পালটে সবুজ হয়ে গেল। কী সুর! কী সুর! বুক নিঙড়ে যেন কান্না আর ভালবাসা তুলে আনা হচ্ছে।
অজিত চোখ মুছল। তার সমস্ত মনপ্রাণ জুড়ে একটা উতরোল ঢেউ। সব ময়লা আবর্জনা ধুয়ে গেছে, একাকীত্ব মুছে গেছে! আর সংসারে ফিরতে ইচ্ছে করে না অজিতের। কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না।
গান শেষ হল। কুমারস্বামী অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। রাত হয়েছে, একে একে প্রণাম করে চলে যাচ্ছে সবাই। অজিত একটু এগিয়ে বসে বলল—বাবা, আমার যেতে ইচ্ছে করে না। আর কোথাও এমন শান্তি নেই।
কুমারস্বামী হাসলেন। বললেন—থাকবি? বলে অন্তরঙ্গ একজন শিষ্যের দিকে চেয়ে বললেন—অজিত আজ থাকবে ব্যবস্থা করে দিস।
অজিত একটা শ্বাস ফেলল। শীলা ভাববে, সে কথাটাও খোঁচা দিচ্ছে মনে কুমারস্বামী সেটা টের পেয়েই যেন যারা চলে যাচ্ছিল তাদের একজনকে ডেকে বললেন—অরুণ, তুই তো টালিগঞ্জের দিকেই থাকিস, অজিতের বাড়িতে একটা খবর দিয়ে যাস। ও আজ আমার কাছেই থাকবে।
বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কুমারস্বামী বিদায়ী মানুষজনের দিকে চেয়ে বললেন— কারও বাড়িতে আমি বেশিদিন থাকতে পারি না। পচা সংসারের নষ্ট গন্ধ পাই। অন্তরাত্মা ঘুলিয়ে ওঠে। তাই ভাবছি এবার চলে যাব।
ম্যাজিস্ট্রেট সুষ্ঠু সব লোকজন ফিরে দাঁড়ায়। চলে যাবেন? কুমারস্বামী চলে যাবেন?
অরুণ ঘোষাল ফিরে এসে প্রায় আছড়ে পড়ে সামনে—কেন বাবা? আমরা কার কাছে যাব তা হলে?
কুমারস্বামী মিষ্টি করে হেসে বলেন—কলকাতায় একটা আশ্রম তৈরি করে দে। থাকব।
—দেব। কথা দিলাম। দেব। ম্যাজিস্ট্রেট বলল।
