সোমেন তাকে একটা কর্কশ ধমক দিয়ে বলে-যা তো এখন।
ননীবালা পানের রসে রসস্থ মুখটা ঊর্ধ্বপানে তুলে পানের পিক যাতে বের না হয় এরকম সতর্ক হয়ে বলেন—যাবে কোথায়! কলকাতার বাড়িঘরে থাকে, যা বললেই তো আর হুট করে বেরিয়ে যেতে পারে না। কোন মাঠঘাট ময়দানটা আছে এখানে যে যা বলতেই যাবে।
সোমেন গম্ভীরভাবে জামা পরতে পরতে বলে—তা হলে আমিই যাই।
ননীবালা বড় চোখে তাকিয়ে বলেন—কোথায় যাবি?
—তাতে তোমার কী দরকার! যাব কোথাও।
ননীবালা পিক ফেলে এসে বললেন—বাড়িতে এখনও ভাল করে পা দিইনি, ওমনি সব বিষ হয়ে গেল!
সোমেন বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়ল ফের।
কিন্তু জায়গা নেই। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
অনেক ভেবেচিন্তে মধুমিতাকে একটা ফোন করল সোমেন।
ফোনের কাছেই সারাদিন বসে থাকে মধুমিতা। হয় ওকে কেউ ডাকে, অনেকক্ষণ কেউ না ডাকলে ও-ই কাউকে ডাকে।
মধুমিতার উৎসুক গলা, বলল—কে?
—আমি সোমেন। একবার আসব? আড্ডা দিতে ইচ্ছে করছে।
—এক্ষুনি। উঃ, কতক্ষণ একা বসে আছি।
কী চমৎকার বাড়ি মধুমিতাদের! সোমেনদের পচা ভাড়াটে বাড়ি থেকে মাত্র সাত মিনিট হাঁটলেই এই স্বর্গের বাড়ি। রিখিয়াদের চেয়েও এরা অনেক বড়লোক।
মধুমিতা তার ঘরে নিয়ে গেল। চাকরকে ঠান্ডা কিছু দিতে বলে মুখোমুখি বসল সোফায়। ওর প্রিয় ভঙ্গী পা তুলে হাঁটু দুহাতে জড়িয়ে বসা। বসে বলল—ডেট ঠিক হয়ে গেছে।
—কীসের?
—ইমপ্রিজনমেন্ট টিল ডেথ। কাল ভেলোরে চলে যাচ্ছি। সব ঠিক হয়ে গেছে—
—ওঃ। বলে চুপ করে থাকল সোমেন।
মধুমিতাকে খুব বিষন্ন দেখাচ্ছিল না। ওর গোল মুখখানায় একটা চাপা হাসির আলো খেলা করছে। হঠাৎ খুব জোর একটা শ্বাস ফেলে বলল-রিলিফ। একটা একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি।
—সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো। সোমেন সান্ত্বনা দিয়ে বলে।
মধুমিতা তার বড় চোখে চেয়ে বলল—শোনো তুমি কিন্তু বড্ড মেয়েদের সঙ্গে মেশো।
—কে বলল?
—আমি জানি। তোমার অনেক মেয়ে বন্ধু।
সোমেন এই পুঁচকে মেয়েটার মুখে জ্যাঠা কথা শুনে একটু উত্তপ্ত হয়ে বলে—তাতে কী?
—পুরুষমানুষ মেয়েদের সঙ্গে বেশি মিশলে খারাপ দেখায়। অপরাজিতার সঙ্গে যেদিন তুমি ক্যারাম খেলছিলে, আমার খুব খারাপ লাগছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা মেয়ের সঙ্গে একটা পুরুষ খুটখাট ক্যারম খেলছে, এই কি পুরুষের মতো কাজ?
সোমেন আর রাগে না। হাসে। বলে—শোনো মধু, তুমি বড় পাকা। আমার বয়স কত জানো?
মধুমিতা মাথা নেড়ে বলে—সে যাই হোক, আমি জানতে চাই না। আমার ওয়েলউইশারদের সকলের ভাল হোক, মরবার আগে আমি সেটুকু চাই।
সোমেন হতাশভাবে চেয়ে থেকে বলে—আমার জন্য কী চাইলে তুমি।
—মেয়েদের সঙ্গে মিশো না। যখন একা লাগবে তখন একাই থেকো। আর একা বসে চিন্তা কোরো যে, তোমার চারদিকে একটা বিশাল দেশ। সে দেশটা কাঙাল আর ভিখিরিতে ভরা। থিংক সামথিং গুড ফর দেম।
সোমেন হেসে বলে—তুমি বড় পাকা মধু।
মধুমিতা মাথা নাড়ল। চাকর ট্রেতে করে ঠান্ডা আমের শরবত দিয়ে গেল। গেলাসটা সোমেনের হাতে তুলে দিয়ে মধুমিতা বলে—সব সভ্য দেশেই আমার বয়সি ছেলেমেয়েরা আরও অনেক বেশি কনশাস। একে পাকা বলে না, জাস্ট ওয়েল ইনফর্মড। সোমেনদা, তোমার কোনও আইডিয়াল নেই কেন? আইডিয়াল না থাকলে মানুষটা স্ট্রং ওপিনিয়ন তৈরি হয় না। ব্যক্তিত্বও থাকে না।
সোমেন ঠান্ডা শরবত খেতে খেতে আবার উত্তপ্ত হল। কান আগুনের মতো গরম। বলল—তাই বুঝি?
মধুমিতা মৃদু একটু হেসে চুলগুলো সরিয়ে দিল পিছনে। কোলের বালিশটা একবার ছুঁড়ে ফেলে ফের কুড়িয়ে নিল। বলল—তুমি টের পাও না যে তুমি কত ডিটাচড? তোমার চারদিকের সঙ্গে তোমার কোনও সম্পর্কই তৈরি হয়নি। কোনও ব্যাপারেই তোমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই। কেবল মাঝে মাঝে চাকরির কথা বলো। চাকরিই কি সব? কত ছেলে জেলখানায় পচছে তা জানো? ওরা কিছু করতে চেয়েছিল। ইউ মাস্ট বি কনশাস অ্যাবাউট ইয়োর এনভিরনমেন্ট।
—মধু, আজ তোমাকে কথায় পেয়েছে।
মধুমিতা উঠে এল সোমেনের পাশে। অনায়াসে পুরুষ বন্ধুর মতো কাঁধে হাত রেখে বলল—শোনো সোমেনদা। উই আর কমরেডস। নই কি? অ্যান্ড কমরেডস আর অলওয়েজ লাভারস। আমি সব সময়ে চাই, আমি যাদের ভালবাসি তারা সবাই আরও লাভেবল হোক। তুমি রাগ কোরো না।
সোমেন মুখ ফিরিয়ে মধুমিতার মুখ দেখল। খুব কাছেই ওর মুখ। গোলপানা, সুন্দর। এত কাছে বসে আছে বলে ওর গা থেকে মেয়েদের শরীরের অবধারিত রূপটান এবং সুগন্ধীর গন্ধ আসছে। আর সে গন্ধ ভেদ করে আরও একটা মাদক গন্ধ আসে। কিশোরীর শরীরের স্বেদগন্ধ।কিন্তু তবু ওর প্রতি কদাচিৎ শরীরের আকর্ষণ বোধ করেছে সোমেন।কোথাও যেন ওর মেয়েমানুষির মধ্যে পুরুষালির একটু ভেজাল ঢুকে আছে। প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই মনে হয়। মধুমিতার হাঁ মুখ থেকে মৃদু শ্বাসবায়ু এসে স্পর্শ করল সোমেনের মুখ। সোমেন মাথা নেড়ে বলল—ঠিক মধু। তুমি ভুল বলোনি। আই হেট মিসেলফ। নিজের ওপর আমার মাঝে মাঝে বড় ঘেন্না হয়। কিন্তু নিজের সঙ্গ কি করে ছাড়ি বলো তো।
মধুমিতা তার চুল নেড়ে দিয়ে বলে—তুমি একটু ‘নাটি’ সোমেনদা। সেইজন্যই তোমাকে ভালবাসতাম।
—বাসতে! এখন বাসো না?
মধুমিতা হেসে বলে—বাসি। এখন আমি কত লোককে যে ভালবাসতে পারি। মরে যাব তো, তাই এখন বড্ড সবাইকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে।
