সোমেন বলল—অণিমা, এখনও চাঁদ-টাঁদ ওঠে, ফুল-টুল ফোটে, লোডশেডিং হয়…
অণিমা দুটি গায়ে হলুদের সময়কার মতো সুন্দর লালচে-হলুদ রঙের হাতের পাতায় লজ্জায় মুখ ঢাকল। বলল—অ্যাই।
সোমেন ঝুঁকে বলে— কথাটা এখনও বলা হয়নি স্পষ্ট করে। তবু জিজ্ঞেস করি—অণিমা, এখনও কি আমাকে…
অণিমা মাথা নেড়ে বলে—না অমরনাথ, লোকে পাখি পুষিলে যে স্নেহ করে, ইহলোকে তোমার প্রতি আমার সে স্নেহও কখনও হইবেনা। বলে একটু দাঁতে ঠোঁট কামড়ে বলল—বলো তো কোথা থেকে বললাম।
সোমেন মৃদু হেসে বলে— রজনী। তারপর গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলে—এই বুঝি মনের কথা?
—নয় কেন? বলে অণিমা উঠল। টেবিলে ভর রেখে ঝুঁকে বলল—তুমি আমার কে জানিতে চাও? এ পৃথিবীতে তুমি আমার কেহ নও। কিন্তু যদি লোকান্তর থাকে—
কেউই তেমন হাসতে পারল না। চেষ্টা করল অবশ্য।
অণিমা বলল—দাঁড়াও গাব্বুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
বলে চলে গেল অণিমা। আর তখন অপসৃয়মান অণিমার পরনের শাড়িটা লক্ষ করে কী যেন মনে পড়ি-পড়ি করছিল সোমেনের। ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবল সে। তারপর হঠাৎ মাথার ভিতরে বজ্রাঘাতের মতো মনে পড়ল, এ শাড়িটা সে অণিমার কাছ থেকে টাকা ধার কিনে দিয়েছিল অণিমাকেই। সেই দেড়শো টাকা আজও শোধ দেওয়া হয়নি। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল সোমেন। ওই শাড়িটা কি ইচ্ছে করেই পরে বসেছিল অণিমা, সোমেনকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য? ছি ছি, তা নয়। অণিমা ছোট মনের মানুষ ছিল না কোনওদিনই।
গাব্বু আসতেই সোমেন দাঁড়িয়ে বলল—আজ পড়ব না গাব্বু। শরীরটা ভাল নেই।
হতাশা, ব্যর্থতা আর বিস্বাদে ভরা ভিতরটাকে নিয়ে সোমেন বেরিয়ে পড়ল। উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে লাগল। দেড়শোটা টাকা এমন কিছু নয়। যখন দেওয়ার কথা মনে করেছে তখন হাতে টাকা ছিল না, যখন টাকা ছিল তখন দিতে ভুলে গেছে। এইসব তুচ্ছ কর্তব্যের অবহেলা কী ভয়ংকর! নিজেকে দেউলিয়ার মতো লাগে। অপমান করতে আর চাবকাতে ইচ্ছে করে নিজেকে। একটু আগে অণিমার সঙ্গে যে চমৎকার সাংকেতিক সংলাপ হচ্ছিল তার সেইটুকুর রেশ গেল কেটে। নিজেকে বড় ছোট লাগছে তার। সোমেন খুব উত্তেজিতভাবে মনে মনে বলল—আই মাস্ট পে হার ব্যাক। আই মাস্ট…
এতই স্তিমিত ছিল সোমেন যে রাতে ঘুমই হল না। নিজেকে অসহ্য বলে মনে হচ্ছে। মানুষের মুশকিল এই যে, দরকার পড়লে সে সব মানুষকে এড়িয়ে থাকতে পারে, কিন্তু কিছুতেই নিজেকে এড়াতে পারে না। অহরহ সোমেনকে একটা অপদার্থ, ছোটলোক সোমেনের সঙ্গ করতেই হবে, মৃত্যু পর্যন্ত।
নির্ঘুম রাতের শেষে সকালের দিকে একটু বুঝি ঘুমিয়েছিল, বউদি এসে তুলে দিয়ে বলল, বাজারে যাও।
চোখ খুলেই সোমেন বলল—দেড়শোটা টাকা দেবে বউদি?
বীণা অবাক চোখে চেয়ে বলল—আগেও একবার চেয়েছিলে। কী ব্যাপার, প্রায়ই দেড়শো করে টাকার দরকার হচ্ছে কেন?
—সেই দরকারটাই। টাকাটা তখন কারও কাছে পেলাম না। দেবে?
বীণা থামল। যদিও হাসিটা বড় কষ্টের। বলল—খুব দরকার থাকলে দেব।
—খুব দরকার, খুব। না হলে সুইসাইড করব।
—আচ্ছা আচ্ছা, তোমার দাম দেড়শো টাকার ঢের বেশি। ওঠো।
সোমেন ঘুমচোখে শুয়ে থেকেই সিগারেট ধরাল। বলল—যাঃ। দেড়শো টাকার দাম আমার চেয়ে অনেক বেশি বউদি, আমি একটা ফ্রড।
—তার মানে?
—অচল পয়সা। তুমি ইংরেজি জানো না কেন বলো তো! সব কথার মানে বলতে গেলে মুড নষ্ট হয়ে যায়।
—যাওয়াই ভাল। আজ তোমার মুড খুব খারাপ। কালও বিকেলে দেখেছি একদম মৌনিবাবা হয়ে আছে। কী হয়েছে?
—আমার মৃত্যু হয়েছে বউদি। আই অ্যাম ডেড।
—সকলবেলাটায় আকথা বলছ? বাজারে যাও তো।
—দেড়শো টাকা দিতে তোমার খুব কষ্ট হবে?
বীণা আবার হাসল। বলল—এসব তোমাকে ভাবতে হবে না। দেব বলেছি যখন ঠিক দেব। আর দিয়ে মরে যাব না।
বাজার করে যখন ফিরছিল সোমেন তখন হঠাৎ একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। বাড়ির দরজায় যখন প্রায় পৌঁছে গেছে, তখন দেখল, বড় রাস্তার দিক থেকে মা আর দাদা হেঁটে হেঁটে আসছে। মার হাতে একটা পুঁটুলি, দাদার হাতে চামড়ার ব্যাগ। দুজনেরই পোশাক কেমন আধময়লা। উদ্বাস্তুর মতো ভিখিরির মতো আসছে। সম্ভবত বাসে এ সে নেমেছে, তারপর এই রাস্তাটুকু হেঁটে আসছে। অথচ একসময়ে দাদা ট্যাক্সি ছাড়া আর কিছু চোখে দেখত না।
সোমেন সিগারেটটা ফেলে দিয়ে এগিয়ে দাদার হাত থেকে ব্যাগটা নিল। মা তাকে দেখে বলল—ইস্ অফিস টাইমে সব বাসে কী ভিড় কী ভিড়! ট্রেনেও থিকথিক করছে লোক। বাব্বাঃ!
খুব একটা খুশি হল না সোমেন। যেন অচেনা লোকজন এল বাড়িতে। এ কয়দিন নিরিবিলিতে বেশ ছিল। এবার উৎপাত হবে।
মাকে কিছু গম্ভীর ও অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। ঘরে এসেই তিনি ছোট নাতিকে কোল-সই করে নিয়ে পানের বাটা খুলে বসলেন। রণেনের মুখে কিছু কাটা দাগ, ক্লান্তির চিহ্ন। সোমেন সবই দেখল, কোনও প্রশ্ন করল না। মনটা শুধু আর এক পোঁচ কালো হয়ে গেল।
ভাইঝিটার নাম আদর করে রেখেছিল বেলকুঁড়ি। বেলকুঁড়ি একটু হইচই ভালবাসে। রেডিয়োগ্রাম ছেড়ে গলা মিলিয়ে গান গায়, নাচে, বাড়িতে লোকজন এলে খুব খুশি হয়। ঠাকুমা আসাতে সে সারা বাড়ি নেচে বেড়াচ্ছে। একবার দৌড়ে এসে ঠাকুমার বুকের মধ্যে হাত পুরে মুনু ধরে গেছে, এখন হাততালি দিয়ে সুর করে গাইছে-‘ঠানু এসেছে, বাবু এসেছে, ঠানু এসেছে, বাবু এসেছে…’
