—ইস, সামার ভ্যাকেশন! তিনটে বাচ্চা আর তুমি একটা বুড়ো খোকা, মোট চারটের ঝামেলা কি কম নাকি! টুবাইটা মার খুব ন্যাওটা, ওটাকে আমি সামলাতেই পারি না। ঠাকুমা গল্প বলে খাওয়ালে বেশ খেত, যেই ঠাকুমা চলে গেছে অমনি ওকে অরুচিতে ধরেছে। আমিও গল্প বলি, কিন্তু সে গল্প ওর পছন্দ নয়। সারাদিন ওকে খাওয়ানোর জন আমার হাড় কালি হয়ে গেল। ওঁরা যে কবে আসবেন!…তিনদিনের নাম করে গেলেন, পাঁচদিন হয়ে ছদিন চলছে।
—চায়ের কথাটা দিব্যি ম্যানেজ করে চাপা দিলে কিন্তু।
বীণা স্নিগ্ধ চোখে দেওরটির দিকে চেয়ে একটু হাসে। এই ছেলেটির প্রতি তার একরকম মা-ভাব আছে। বুবাই টুবাইয়ের মতোই যেন আর একজন।
বীণা ননীবালার চৌকিটায় বসে বলে—আর তুমি যে ওই মেয়েটার কথা চেপে যাচ্ছ! কে মেয়েটা? খুব গাড়ি হাঁকড়ে আসে।
সোমেন কাগজে হিজিবিজি লিখতে লিখতেই বলল—খুব বড়লোকের মেয়ে, বুঝলে! প্রসপেকটিভ!
—সে হোকগে। মেয়েটার কিন্তু মাথায় ছিট আছে।
—কেন? সোমেন হেসে জিজ্ঞেস করে।
বীণা মুখটা গোমড়া করে বলে—বাসায় আসে তো প্রায়ই, একদিনও আমার সঙ্গে কথা বলল না। এমনকী বাচ্চাগুলো কাছে গেলে একটু আদর করা কী কথা বলা দূরে থাক, একবার ভাল করে তাকায় না পর্যন্ত। এ বাড়িতে ও কেবল তোমাকে দেখে, কেন আমরা কী নেই? পুরো ছিটিয়াল।
—ছিট আছে কিনা কে জানে, তবে মাথায় টিউমার আছে। বলে সোমেন বউদির দিকে চেয়ে একটু হাসে, পরমুহূর্তেই হাসিটা মিলিয়ে একটু বিষন্নতার মেঘের ছায়া পড়ে মুখে। বলল—ব্রেন টিউমার। বোধ হয় বাঁচবে না।
—যাঃ। বীণা বিশ্বাস করতে চায় না।
—সত্যি।
বীণা চোখ দুখানা বড় করে বলতে আমি ভাবলাম বুঝি এই মেয়েটাই একদিন আমার জা হয়ে আসবে। তাই আনসোশ্যাল দেখে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
সোমেন খুব হাসল, বলল—মেয়েদের সঙ্গে একটু মিশলেই প্রেম হয়, আর প্রেম হলেই বিয়ে হয়, না? তুমি একদম সরল অঙ্ক।
—আহা, দোষ কী! ভাব হলে বিয়ে হওয়াই তো ভাল। মেয়েটা তোমাকে খুব পছন্দ করে। তোমাকে ছাড়া কাউকে চেনেই না। বিয়ে হলে বেশ হত। আমি তো গরিব ঘরের মেয়ে, তোমার বউ অন্তত বড়ঘরের মেয়ে হলে ব্যালান্স হয়ে যেত। সত্যি বলছ ব্রেন টিউমার?
—সত্যি। না হলে কি আমাকে পাত্তা দিত নাকি? অসুখ হয়েছে বলেই মনটা নরম। সবাইকেই পছন্দ করে ফেলে। যাও, অনেক বকিয়েছ, চা দাও তার বদলে।
বীণা উঠে গেল।
বিকেলে গাব্বুকে পড়াতে গেছে সোমেন। পড়ার ঘরে ঢুকেই চমক খেল। গাব্বু যে চেয়ারে বসে সেখানে খুব সুন্দর মতো একটি মেয়ে বসে আছে। পরনে চমৎকার একটা লালপেড়ে সাদা খোলের বিষ্ণুপুরী শাড়ি। মেয়েটি টেবিলের ওপর ঝুঁকে কী যেন পড়ছে। তার এলোচুলের ঢল নেমে এ পাশে মুখটাকে আড়াল করেছে। সোমেন ঘরে ঢুকতে মেয়েটা মুখ ফেরাল না।
তারপর সেই নিবিড় নরম এলোচুলে ঢেউ দিয়ে মুখটা নড়ে উঠে সোমেনের দিকে চকিতে ফিরল। তখনই ভারী পাওয়ারের চশমাটা চিনতে পারে সোমেন।
অণিমা হেসে বলে—এস সোমেন।
অণিমাকে চেনাই যায় না। ইউনিভার্সিটিতে থাকতে একটু রুক্ষ ছিল, বিয়ের আগে দিল্লি ঘুরে এসে একটু ভাল হয়েছিল চেহারা। কিন্তু এখন কে যেন ওকে নতুন করে গড়েছে। শরীরে মাংস বা চরবি লাগলেই মানুষ সুন্দর হয় না। সুন্দর হওয়া এক রহস্যময় অ্যালকেমি। সৌন্দর্যের সবটুকু শরীরে থাকে না বুঝি। অণিমার শরীরকে ঘিরে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের আবহ। তার চারধারের বাতাসটুকু, আলোটুকু গন্ধটুকু সবই যেন সুন্দর হয়ে আছে। বড় বেশি দূরের আর বড় বেশি অভিজাত হয়ে গেছে অণিমা।
সোমেন হাঁ করে চেয়েছিল। একটা ঢোঁক গিলে বলল—কবে এলে?
কাল।
সোমেন মুখোমুখি চেয়ারে বসে বলল—সিন্ধ্রির জলবায়ু তো বেশ ভালই অণিমা।
অণিমা খুব শান্ত ও সুখী একরকম হাসি হাসল। এবং সোমেন খুব দুঃখের সঙ্গে বুঝতে পারল, অণিমার মনে আর কোনও দুঃখ নেই। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ও সোমেনের ঘটনাটা থেকে মুক্ত হয়েছে।
অণিমা বলল—হাওয়া বদল করতে সিন্ধ্রিতে যেয়ো একবার।
সোমেন খুব বিষণ্ণ বোধ করছিল হঠাৎ, তবু যথেষ্ট চতুর হওয়ার চেষ্টা করে বলে-ভাল আছ তো দেখতেই পাচ্ছি। তবু জিজ্ঞেস করি—অণিমা, কেমন আছ?
অণিমা ভ্রু কুঁচকে বলে—ও আবার কী রকম প্যাঁচালো কথা সোমেন?
সোমেন স্থির চোখে চেয়ে বলে—অণিমা, কেমন আছ?
অণিমা খুব হাসল, তারপর হাসি থামিয়ে একটু স্মিতভাবে বলল—ভাল আছি বলতে ভয় করে সোমেন। বললে যদি আর ভাল না থাকি।
সোমেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—অণিমা, পৃথিবীতে মেয়েদের মতো এত সুখী কেউ নেই।
—ওমা! কী বলে রে ছেলেটা!
—সত্যি। যদি মেয়ে হতাম তবে চাকরির চিন্তা থাকত না। এই বয়সে একটা বিয়ে হয়ে যেত। আর বিয়ের আগেকার সব কিছু ভুলে গিয়ে সুখী হতে সময় লাগত না।
—অ্যাই! বলে ধমক দিল অণিমা—বিয়ের আগে তোমার আবার কী ছিল, যন্ত্রণা যা ছিল তা তো আমার ছিল।
সোমেন সেটা জানে, তবু দুঃখও তো কত রকমের হয়। আজ যেমন মনে হচ্ছে সে অণিমাকেই ভালবাসত। ভালবাসাটা আজ যেন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। এক তীব্র টান আজ কূল ভাঙছে, পায়ের নীচের মাটি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বলল—সে তুমি বুঝবে না।
—মিথ্যে কথা বোলো না সোমেন।
বলে অণিমা চেয়ে রইল সোমেনের দিকে। চোখে বুঝি একটু অনুযোগ, একটু স্নেহ।
