সে-ডাক শোনার সময় রণেনের নেই। মহাপ্রলয় তাকে ডাকে যে। ওই মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে একবার মুখোমুখি মৃত্যুর প্রকৃত স্বাদ জেনে নেবে। মাঠের মাঝখানটির দিকে বাতাস ভেদ করে রণেন দৌড়োয়।
টিনের চালে টুং টাং করে প্রথম কয়েকটা শিল পড়ল। তারপরেই হুড়মুড় করে পাথরের টুকরোর মতো বড় বড় খাঁজকাটা, হিংস্ৰ শিল পড়তেই লাগল। কয়েক পলকে সাদা হয়ে যাচ্ছিল মাঠ-ঘাট খামারবাড়ি। ভূতের ঢিলের মতো শিল এসে পড়ছে অন্তরীক্ষ থেকে, গড়িয়ে যাচ্ছে মাটির ওপর, লাফাচ্ছে। বরফের ঘর খুলে কে যেন উপুড় করে দিয়েছে।
শিলের প্রথম চোটটা গেল বহেরুর ওপর দিয়ে। কেলে গোরুর বোকা বাছুরটা গোয়ালে যায়নি। সেটাকে টেনে আনতে গিয়ে আধলা ইটের মতো একটা শিল তার বাঁ হাতের কবজি থেঁতলে দিয়ে গেল। আর গোটা দুই পড়ল মাথায় বাঁধা গামছা ভেজ করে ঘিলুতে। দাঁতে দাঁত চেপে বহেরু প্রথমটা সামলে নিল। গোয়ালে ঢুকে বিড় বিড় করে গাল দিল দুর্যোগকে।
কপাল থেকে রক্তের ধারা নেমে ভাসিয়ে দিচ্ছিল নয়নতারার মুখ। রক্তের নোনা স্বাদ জিভে ঠেকাতেই তার সম্বিত ফিরে আসে। ভূতটা ছেড়ে গেল। দৌড়ে গিয়ে আচম্বিতে একটা বন্ধ দরজায় ধাক্কা দেয়। কার দরজা ঠিক ঠাহর হয় না।
ননীবালা দরজা খুলে চেঁচিয়ে বলেন—ও মাগো! কী হল তোর?
—কিছু নয় মা, শিল পড়েছে।
ননীবালা তাকে ঘরে টেনে নিয়ে দরজাটা ফের বন্ধ করে বলেন—ছেলে আর ছেলের বাপের জন্য বুক শুকিয়ে যাচ্ছে মা। কোথায় যে গেল।
—ফেরেনি?
ঘটির জলে কপালটা ধুয়ে নিল নয়নতারা। ননীবালা দেখে বললেন—অনেকটা কেটে গেছে। খুব ফুলেছে। একটু ডেটল দে।
নয়নতারা হেসে মাথা নেড়ে বলল—ওতে কিছু হবে না। যাতে চোপাট, তাতেই লোপাট।
এই বলে ঘোমটা দিয়ে বাইরে থেকে একটা শিল কুড়িয়ে আনল। সেইটে কপালের কাটা জায়গায় চেপে ধরে বলল—ব্রজকর্তার জন্য চিন্তা নেই মা, তবে রণেনবাবু..
শিল পড়ার শব্দ শেষ হয়নি তখনও, বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। দামাল বাতাস পৃথিবীর সব মেঘ উড়িয়ে আজ আকাশে। কলের জলের মতো মোটা ধারায় জল নেমে আসছে। অবিরাম, অবিশ্রাম। চারদিক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যায়। আর তখন ব্রজগোপাল রণেনকে মাঠ থেকে তুলে আনছেন। তার কানের কাছে বলছেন-না বাবা, তোমার খুব চোট হয়নি। শিলটা জোর পড়েছিল। বাবলা গাছটার জন্য বেঁচে গেছ!
—বাবা, মহাপ্রলয় হবে। রণেন বলে। তার ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে। একটা চোখ ফুলে আছে। ব্রজগোপালের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছে।
ব্রজগোপাল অজস্র বৃষ্টির ধারায় ভিজে যাচ্ছেন রণেনের সঙ্গে। তবু হেসে বললেন—হবে হলে। ভয় কী?
—বড় ভয় বাবা। সব মরে যাবে।
ব্রজগোপাল তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেন—বিশ্বাস বাবা, বিশ্বাসই সব সার কথা। যতক্ষণ না মরণ আসছে ততক্ষণ তো তাঁর দয়ায় বেঁচে আছি। আর যতক্ষণ বেঁচে আছি, ততক্ষণ কিছুতেই মৃত্যু নেই।
বৃষ্টি থেমে যায়নি তখনো। পড়ছে। তবে এখন একটানা, একঘেয়ে জলের শব্দ। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া দিচ্ছে। ঘরের মধ্যে হারিকেনের আলো উসকে উঠছে সেই বাতাসে।
রণেন শুয়ে আছে বিছানায়, তার পাশে পা ঝুলিয়ে বসে ননীবালা। মেঝেয় বসে এক বাটি দুধ স্টোভে গরম করছে নয়নতারা। এখনও তার কপাল আব হয়ে ফুলে আছে। বলল—মা, রান্নাঘর তো ভেসে ভেসে গেছে। এ ঘরেই আজ তোলা উনুন জ্বেলে দিই?
ননীবালা পানের পিক ফেলে এসে বললেন—দে। বহেরুকে বলব কালই রান্নাঘরটা মেরামত করতে।
রণেন চোখ বুজে শুয়ে হিজিবিজি ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ভাবল—নয়নতারা কেন তার মাকে মা ডাকে। অ্যাঁ! ভাবতে ভাবতে খুবই উত্তেজনা বোধ করল সে। পাশ ফিরে নয়নতারার দিকে তাকাল।
ব্রজগোপাল ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে এলেন। ছাতা মুড়ে রাখলেন দরজার পাশে।
ননীবালা একবার চেয়ে দেখে বললেন—নিউমোনিয়াটি না বাঁধালে আর চলছে না? এই বয়সে অত ভেজা কি সইবে? কে শোনে কার কার কথা!
ব্রজগোপাল গায়ের পিরানটি খুলে ফেললেন। বললেন—প্রতিবারই ঝড়জলে নানা ক্ষয়ক্ষতি হয়। কাল সকালে সব বোঝা যাবে। বলে ননীবালার দিকে চেয়ে চেয়ে কুণ্ঠিতভাবে বললেন—আজ তো আর যেতে পারলে না। কলকাতার বাসার জন্য খুব চিন্তা করছিলে!
—যাওয়া আর হল কই?
ব্রজগোপাল শুকনো কাপড় পরতে পরতে বললেন—তা হলে কাল যাবে? কখন যাওয়া জানিয়ে রাখলে রিকশা বলে রাখবে বহেরু।
ননীবালা উত্তর দিলেন না। নয়নতারাকে বললেন—কী এক রসকষ ছাড়া পান সেজেছিস বল তো! আর একটা ভাল করে সাজ।
নয়নতারা দুধের বাটির জ্বাল রেখে পান সাজতে বসে।
ব্রজগোপাল ফের বলেন—কল কখন যাওয়া?
ননীবালা হঠাৎ ঝেঁঝে উঠে বলেন—না গেলে তাড়িয়ে দেবে নাকি? কেবল যাওয়া-যাওয়া করছ কেন?
॥ সাতান্ন ॥
বীণা বিরক্ত হয়ে এসে বলে—একটু আগে কে একটা মেয়ে তোমার কাছে এসেছিল বলো তো!
সোমেন ছুটকো কাগজে কিছু লিখবার চেষ্টা করছে, হচ্ছে না। সিগারেটের ধোঁয়ায় চারদিক আবছা। বুকে বালিশ চেপে উপুড় হয়ে শুয়েছিল সোমেন, বীণার দিকে একবার অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে বলল—চা খাওয়াবে নাকি এক কাপ?
বীণা বলে—বেলা এগারোটায় চা? এটা কি রেস্টুরেন্ট! যাও, চান করে এস, ভাত খাবে। এখন আমার অনেক কাজ।
সোমেনের অন্যমনস্কতাটা কেটে গেল, হেসে বলল—মা আর দাদা আউট হওয়ার পর থেকেই তো তোমার সামার ভ্যাকেশন চলছে। অত কাজ দেখিয়ো না।
