দমকে দমকে বাতাস বেড়ে গেল। উড়িয়ে আনছে গভীর ঘন গহীন মেঘ। কী বিপুল আকাশ জুড়ে আসছে প্রলয়। এইবার পৃথিবীর সর্বশেষ মহাপ্রলয়টি আসছে। কোনও নোয়া আর নৌকো তৈরি করেনি। টুবাই বুবাই আর মেয়েটাকে শেষবারের মতো চোখের দেখা হল বীণার সঙ্গে ফের ভালবাসার সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার সময় হল না মহাপ্রলয় আসছে।
এক মহাভয়ে রণেন জামরুলতলায় দাঁড়িয়ে প্রকাণ্ড ঝড়ের চেহারাটা দেখছিল। চোখ দুটো বড় বড়, ঘন নিশ্বাস পড়ছে তার। বিড় বিড় করে একবার শিশুর মতো ডাকল- বাবা!
জামরুলের পাতায় পাতায় প্রবল শব্দ। পাখির বাসা ভেঙে পড়েছে পায়ের কাছে। প্রথমে লক্ষ করেনি রণেন, হঠাৎ চোখে পড়ল। ভাঙা ডিম ছড়িয়ে ছত্রখান। নিচু হয়ে দেখল ডিমের খোলা থেকে তলতলে তরল পদার্থ বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, আর তার মধ্যে না-হওয়া বকের ছানা গলা টানা দিয়ে মরছে। হায় ঈশ্বর! চমকা ভয়ে রণেনের বুক আঁকুপাঁকু করে ওঠে। ব্যাকুল হাত বাড়িয়ে সে বকের ছানার দলদলে শরীরটা তুলে নেয় হাতে। ন্যাতানো রোমহীন, লাল একটু অদ্ভুত জেলির মতো। হাতের তেলোর দিকে সভয়ে ঘেন্নায় কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে সে। তার দীর্ঘ চুলগুলিকে আঁচড়ে, বিলি কেটে চলে যাচ্ছে বাতাস, ফের মুঠোভর ধরে ছুঁড়ে মারছে কপালে। চুলের চিকের ভিতর দিয়ে নিজের হাতের তেলোর বীভৎস দৃশ্যটা দেখে হঠাৎ আবার হাতঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল রণেন।
জামরুলতলা থেকে কয়েক পা হাঁটলে পুকুর। হাত ধুতে এসে অবাক হয়ে রণেন দেখে, কী গহীন গভীর কালো জল। মেঘের নিবিড় ছায়া বুকে ধরে কখন পাতাল-গভীর হয়ে গেছে জল। আর জলের ওপর একটা থিরথির কাঁপন। ক্রমে ঢেউ দুলে দুলে ওঠে। ছপাৎ করে জল উঠে জলে পড়ে যাচ্ছে। রণেন সেই অতল জলের কাছে এসে হাত ধুতে গিয়েও থমকে থাকে। পুকুরটা এক রহস্যময় পাতালের সুড়ঙ্গের মতো তাকে ডাকছে, টানছে, জল ছুঁলেই চুম্বকের মতো টেনে নেবে তাকে। গভীর গভীর এক তলহীন অসীম পাতালে নিয়ে যাবে।
তীব্র ভয়ে উঠে এল রণেন। আর্তস্বরে ডাকল, মা।
ধুলোর ঝড়ের প্রথম দমকটা এল। চোখে হাত চেপে বসে পড়ে রণেন। দুরন্ত বাতাস আসে মহাপ্রলয়ের অগ্রদূত হয়ে। এরপর সমুদ্রের আকাশপ্রমাণ জলরাশি আসবে। একশো তালবৃক্ষের উচ্চতা নিয়ে সমস্ত পৃথিবী ডুবিয়ে দিয়ে যাবে। কেউ থাকবে না। কেবল খুব উঁচু পাহাড়ের ওপর যারা আছে তারা বেঁচে থাকবে। বড় আফসোস হল রণেনের। আগে জানা থাকলে সে এ সময়ে ঠিক দার্জিলিঙে গিয়ে বসে থাকত সবাইকে নিয়ে।
চারদিকে ধূসরতার এক প্রবল রহস্য। তার মধ্যে সব কিছুই ছায়ার মতো অলীক হয়ে যাচ্ছে। গোঙানির শব্দ করে রণেন সাবধানে হাতের পাতার আড়াল করে চোখ খোলে। নাক দিয়ে হুড় হুড় করে তেজি বাতাস ঢুকে বেলুনের মতো ফুলিয়ে তুলছে ফুসফুস। শ্বাস টানতে হচ্ছে না, আপনা থেকেই বাতাস ঢুকে যাচ্ছে বুকের মধ্যে। তীব্র দমবন্ধ করা এক অনুভূতি হয়। ফুসফুসটা একটা পলকা লাল বেলুনের মতোই না ফটাস করে ফেটে যায়।
এখানে বহেরুর খড়ের গাদা। হামাগুড়ি দিয়ে সেই গাদায় উঠে আসে রণেন। মাচাটা মচমচ শব্দ করে। আর গাদার মাচার তলায় কয়েকটা ঘেয়ো কুকুর আর্তস্বরে চিৎকার করতে থাকে। রণেন খড়ের মধ্যে একটা গভীর খাঁজ দেখতে পেয়ে উঠে বসে। চারদিকে প্রকাণ্ড এক শব্দ হচ্ছে, খড় উলটে যাচ্ছে বাতাসে, উড়ে যাচ্ছে। একটা গুলঞ্চ গাছের ডাল মড়াৎ করে ভেঙে পড়ল। গাছে গাছে হাহাকার বেজে যাচ্ছে অবিরল।
অবোধ চোখে খানিকক্ষণ দেখল রণেন। ডানহাতের চেটোয় এখনও সেই ডিমভাঙা তরল পদার্থের চটচটে ভাব। খড়ের গায়ে হাতটা ঘাসে নিয়েও চটচটে ভাবটা যায় না। বড় ঘেন্না। বড় ভয়। কত পাখির বাসা ভাঙছে, ডিম ভাঙছে। কত বাড়িঘর ভেসে জলের অতিকায় ঢেউয়ের মতোই একটা মেঘ দিগন্তে উঠে আসছে। রণেন তীব্র একটা চিৎকার দিয়ে চোখ বুজল। ফের খুলল। ফের বুজল।
আপন মনে নিজেকে বলল—ওই আসছে।
এই সেই ভয়ংকর শেষ দিন। মহাপ্রলয়ের ঢেউ কি ওই? বোজা চোখ ফের খুলে ফেলল রণেন। দেখল, পর্বতপ্রমাণ একটা ঢেউ আকাশে মাথা তুলছে। তার কলকল ঘোর নিনাদ শুনতে পায় রণেন। বিশাল প্রবাহের মতো জলরাশি এসে গেল প্রায়।
এ সময়ে কে যেন চিৎকার করে ছুটে ছুটে বলছে—তোরা সব ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়া, ঘরে থাকিস না, গাছগাছালির কাছে যাস না।
বাবার গলা না! হ্যাঁ, বাবার গলাই। উৎকর্ণ হয়ে শোনে রণেন। চিৎকার করে ডাকে— বাবা!
কেউ উত্তর দেয় না। কিন্তু বাতাসের শব্দ ছুঁড়ে একটা অদ্ভুত শব্দ রণেনের কানে আসে। কে যেন এই দুর্যোগে খোল বাজাতে বসেছ। কী তীব্র বোল! রণেন শোনে খোল বলছে- ভয় নাই, ভয় নাই, ভয় নাই..
কী বলছে! বলছে—হরিবোল, হরিবোল, হরিবোল…আয় ব্যাটা, আয় ব্যাটা, আয় ব্যাটা…হরিবোল….
রণেন লাফ দিয়ে নামল। একটা শেষ সাহস তার বুকের মধ্যে জ্বলে উঠেছে মশালের মতো। মরবই যখন, ভয় কী? আয়, জল, আয় ঝড়, আয়…
মুহুর্মুহু আগুনে আগুনে রং ছড়িয়ে বাজ পড়ছে চারধারে। কী প্রবল শব্দ! মহাপ্রলয়ের তীব্র ক্রোধ চারধারে আগুনের রং ধরিয়ে দিল। কে যেন ‘ভগবান’ বলে চেঁচিয়ে উঠে মূক হয়ে গেল। গভীর ধুলোর স্তরের মধ্যে আবছা হয়ে যায় সব কিছু।
রণেন পরনের কাপড়টায় কাছা মেরে নেয়। তারপর গুটি গুটি খোলা মাঠের মধ্যে এগিয়ে যেতে থাকে। তার সামনে দিয়ে এক বিশাল পেখমের বোঝা টেনে দৌড়ে যায় ময়ূর। কর্কশ একটা ডাক দেয়। আর বাতাসের তুমুল হট্টগোলের মধ্যে কাদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। একবার কে যেন বুকফাটা চিৎকার দিয়ে ডাকল—রণো।
