তখনই ননীবালার খেয়াল হল, রণো তো ঘরে নেই! গেল কোথায় ছেলেটা?
আতঙ্কিত ননীবালা ব্রজগোপালের দিকে চেয়ে বলেন—রণো কোথায় গেল?
ব্রজগোপাল ঘরের আবছায়ায় মুখটা ফিরিয়ে ননীবালার দিকে চেয়ে বললেন-দেখছি।
—দেখবে! কোথায় দেখবে? এই ঝড়ে বেরোবে নাকি?
এই সময়ে প্রচণ্ড শব্দে টিনের চালের ওপর নারকোল পড়ল। বাজের শব্দ হল উত্তরের মাঠে। আর তার আগুনের ঝলক হলুদ আলোয় বিপদের গন্ধ ছড়িয়ে গেল ঘরে।
ব্রজগোপাল হুড়কো খুলতে খুলতে বললেন—দেখি সব কে কী করছে। রণোকেও খুঁজে আনি।
ননীবালা এসে হাত চেপে ধরে বললেন—বয়সটা ভুলে যাও কেন? অন্য ক্ষতি না হলেও এই বাতাসে ঠান্ডা লাগিয়ে আসবে। আমিই বরং দেখছি।
ব্রজগোপাল ঠান্ডা গলাতেই বললেন তুমি তো খামারটা ভাল চেনো না, অন্ধি সন্ধি আমি জানি। আমার ঠান্ডা লাগবে না, অভ্যাস আছে। ছেলেটার মন স্থির নেই, কোথায় চলে যায়।
সে কথাও ঠিক। উদ্বেগ বুকে নিয়ে ননীবালা সরে দাঁড়ালেন। ব্রজগোপাল হুড়কো খুলতেই ঝড়ের ধাক্কায় পাল্লা দুটো পাখনার মতো উড়ে খুলে গিয়ে কাঁপতে থাকে। বাইরে চারদিকে ধুলোটে অন্ধকার। খোলা দরজা দিয়ে রাশি রাশি ধুলো এসে অন্ধ করে দেয় ননীবালাকে। ঠাহর করে তিনি পাল্লা দুটো বন্ধ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ডাকাতে ঝড় তাঁকে সুদ্ধু ঠেলে ফেলে দেয়, দামাল হয়ে ঘর লুটপাট করতে ঢুকে পড়েছে। ব্রজগোপাল বাইরে থেকে পাল্লা দুটো টেনে ধরেন, তাই অতি কষ্টে ননীবালা দরজা বন্ধ করতে পারলেন। জানলার ঝাঁপগুলো দড়ি দিয়ে বেঁধে গেছেন ব্রজগোপাল, তবু সেগুলো বাঁধন ছেঁড়ার জন্য আকুলি-বিকুলি করছে। হা-হা শব্দে আকাশ পাতাল জুড়ে প্রলয় চলে আসছে। আবার আগুনের আভা, তারপরই কামানের শব্দ করে বাজ ডাকল। শিউরে ওঠে ঘর। কোথায় পড়ল বাজটা। কার সর্বনাশ করল কে জানে! এত কাছে পড়ল। পুবের জানালার ঝাঁপ ফাঁক করে ননীবালা কষ্টে দেখলেন, ভূতপ্রেতের মতো মানুষ দৌড়চ্ছে চারধারে।
বেড়াল কোলে করে উঠোনে বসে আছে গন্ধ বিশ্বেস। মাজায় জোর নেই যে নিজে থেকে উঠবে। বাতাসে উলটে যাচ্ছে বেড়ালের ললাম। তিন-তিনটে ঘেয়ো কুকুর ছুটে গিয়ে ঝড়-বাতাসকে ঘেউ ঘেউ করে দিয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ফিরে আসছে গন্ধের কাছে থুপ থুপ বসে থাকা একপাল বেড়াল আলিস্যি ভেঙে উঠে ঘরদোরের ভিতর চলে গেল। কুকুরদের যাওয়া বারণ, একমাত্র গন্ধ বিশ্বেসের ঘর ছাড়া। কিন্তু ঝাঁপ বন্ধ বলে যেতে পারছে না।
গন্ধ চেঁচিয়ে বাতাসের শব্দের ওপর গলা তুলবার চেষ্টা করে—আমারে একটু ঘরে দিয়ে আয় শালার পুতেরা! হে-ই কেডা যায় রে?
নয়নতারা হাঁস তাড়িয়ে এনে বাক্সবন্দি করতে করতে চেঁচিয়ে বলল—ও জ্যাঠা, ঘরে যাও। বাতাস দিল।
গন্ধ খেঁকিয়ে ওঠে—আমারে নিবি তো!
—নিই। বলে নয়নতারা এসে হ্যাঁচকা টানে তুলে ফেলে গন্ধকে। গন্ধ উঃ উঃ করে ব্যথায় চেঁচিয়ে ওঠে। সেদিকে কান না দিয়ে নয়নতারা তাকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে গিয়ে হাঁসের মতোই ঘরে পুরে দেয়। বন্ধ দরজার বাইরে কুকুরগুলো আকাশমুখো চেয়ে চিল্লোতে থাকে। ঝড় দুর্যোগকে ধমক মারে। দাওয়ায় উঠলে গেরস্ত দূর দূর করে। তারা যাবে কোথায়!
নয়নতারা ধুলোর ভিতরে ডুবন্ত মানুষের মতো আবছায়া হয়ে ছুটে আসে চিড়িয়াখানার কাছে। ঘেরা পরদা কিছু নেই। জাল দেওয়া খাঁচার ময়ুরটা কর্কশ স্বরে চেঁচাচ্ছে। একটু আগে পেখম ধরেছিল, এখন বুজিয়ে ফেলে একবারটায় বসে আছে ভয় খেয়ে। পাখিগুলো চেঁচাচ্ছে। হনুমান আর বাঁদর কুক কুক ডাক ছেড়ে লাভ দিচ্ছে এধার থেকে ওধার। বিন্দু কয়েকটা চট জালের গায়ে বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করছে। পারছে না। বাতাসে চট উড়ে যায়।
হেসে ফেলে বিন্দু বলে—ও দিদি, এ মুখপোড়াগুলোর কী হবে?
—খাঁচা খুলে দে, পালিয়ে যাক। নয়নতারা নির্দ্বিধায় বলে।
বিন্দু চোখ গোল করে বলে—জঙ্গুলে জীব, ওরা কত ঝড়বৃষ্টি দেখেছে। ঠিক গাছে-টাছে গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকবে। নইলে বন্ধ জায়গায় আঁকুপাঁকু হয়ে মরবে।
নয়নতারাকে দরজা খুলতে হয় না। খোলা মাঠের ওপর দিয়ে একটা ঝাপটা আসে। একমুখ ধুলো খেয়ে দুই বোন বেসামাল। খাঁচার পলকা পাল্লা খুলে যায় মড়াৎ করে। আর একসময়ে ধুলোর ঝড় ভেদ করে দৈববাণীর মতো ব্রজকর্তার গলার স্বর শুনতে পায় নয়নতারা। ব্রজগোপাল চেঁচিয়ে বলছেন—কোথাও কেউ আগুন জ্বালিস না। বাতিটাতি সব নিবিয়ে ফেল।
বেজিটা নিরিক থিরিক দৌড়োচ্ছে। বহেরুর পোষা বেজি, কিন্তু ও ঠিক পোষ মানে না কখনও। সুযোগ হলে, মন করলে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। বিন্দু চেঁচিয়ে বলে—ও দিদি, বেজিটাকে ধর।
পরপুরুষের মতো দামাল বাতাস এসে আঁচল উড়িয়ে দেয় গা থেকে। নিশেনের মতো শূন্যে আঁচল উড়িয়ে হাসে হা-হা করে। নয়নতারা আঁচল কোমরে বাঁধে আর তা করতে বেজির পিছু পিছু বিন্দু ধুলোর আস্তরণে কোথায় ঢেকে যায়। একা নয়নতারা একবার দৌড়ে যায় ব্রজগোপালের ঘরের দিকে। চেঁচিয়ে ডাকে—ও মা, ঘরে আছে তো?
ননীবালা ভয়ের গলায় চেঁচিয়ে বলেন—আমি আছি, কিন্তু ছেলে আর বাপ কোথা গেল দ্যাখ।
নয়নতারা হাসে। কে কাকে দেখে, দুর্যোগে আর বিপদে সবাই একা। এই ধুলোটে ঝড় আর মেঘ-বাদলে আজ যেন আবার এক প্রেত তাকে ডাকে। সংসারে পোঁতা তার খুঁটো আজ উপড়ে দিয়েছে ঝড়। নয়নতারা ধুলোর মধ্যে ডুব দেয়, বাতাসে ভাসে। খোঁপা খুলে এলো চুল মুঠো করে ধরেছে দুরন্ত পুরুষের মতো ঝড়। নয়নতারা দৌড়ে যায় এধার-সেধারে। অবিরল হাসে। আগুনের একটা ধমক নেমে আসে আকাশ থেকে। মাটি কেঁপে ওঠে। উত্তরের মাঠে একটা নীলচে বাজ পড়ল, স্পষ্ট দেখতে পেল নয়নতারা। একটু পরে শব্দটা হবে। সে কান চেপে ধরে। আর হি হি করে হাসে।
