খুবই উদাসীন সেজে সুভদ্র এল ইস্কুলে একদিন। সেদিন শীলা অখণ্ড মনোযোগে খবরের কাগজ পড়েছে, অবসর সময়ে। তাকায়নি। তাকাতে ভীষণ লজ্জা করছে। সুভদ্রও এড়ানোর ভাব করছে। যেন চেনেই না।
কেবল ছুটির পর ঠিক বড় রাস্তায় এসে সঙ্গ ধরল শীলার। বলল- কী খবর গরবিনী?
শীলা মুখ লাল করে উত্তর দিল—কীসের গর্ব আবার। কথা খুঁজে পান না নাকি? কেবল বাজে কতা।
সুভদ্র উদাস গলায় বলে—কত অহংকার থাকে মানুষের! কারও বা রূপে আছে, কারও বা স্বামী বড় চাকরি করে, কেউ বা টাকার মালিক। এরকম কত রকম।
—সুভদ্র, মারব থাপ্পড়!
এইরকম ভাবে তাদের ফের ভাব হয়ে গেল। ইস্কুলে রোজ দেখা হয়। ঠারেঠোরে দুজনে দুজনের দিকে তাকায়। ভালমানুষের মতো কথা বলে। একটা পিপাসার নিবারণ হয় তাতে। আবার তৃষ্ণা বাড়েও। ইস্কুলের শেষে প্রায়দিনই তারা একসঙ্গে বেরোয়।
তারপর দুজনে ট্রামে বা রিকশায় ওঠে। ভারী পেটটা নিয়ে শীলার একটু হাসিহাসি লাগে, সুভদ্রর সামনে লজ্জাও করে। তবু বেরতে খুব রোমাঞ্চকর আনন্দ হয়।
একদিন সুভদ্র বলে—এই যে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কোনওদিন যদি অজিতদা দেখে ফেলেন, কী ভাববেন?
শীলা একটু ভ্রূ কুঁচকে বলল- কী ভাববে আবার!
—অনেক ভাবার আছে।
—কী ভাববে?
—হয়তো ভাববেন, আপনি আমার সঙ্গে প্রেম করছেন।
শীলা মুখটা ফিরিয়ে বলেছে-ফাজিল!
সেটা মুখের কথা। কিন্তু তাদের ভিতরে ভিতরে এই সব কথাই গুপ্তঘাতকের মতো, চোরের মতো ঘোরে। তাই রিকশায় বসলেই পরদা ফেলে দেয় শীলা, ট্রামে বাসে উঠলে পাশাপাশি বসতে চায় না। বলে—গা-ঘেঁষা পুরুষ আমি দুচোখে দেখতে পারি না।
এক-একদিন সুভদ্র বলে—এবার চাকরিটা তো পাকাই হয়ে গেল আমার। এজেন্সির কমিশনও শতখানেক করে আসছে। এবার ভাবছি একটা বিয়ে করলে কেমন হয়!
শীলা বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে—ও মা, করুন না। খুব ভাল হয়। পাত্রী দেখব?
সুভদ্র ভয়ংকর অসভ্যের মতো হেসে বলে-বুকে সইবে তো?
শীলা লাল হয়, তেড়ে মারতে আসে। আবার কখনও গভীর রাতে বা নির্জনে ভেবে দেখলে বুঝতে পারে, সুভদ্র মিথ্যে বলেনি। বুকে সইবে না। একদিন সুভদ্র মাইনে পেয়ে বলল—চলুন, একটা শার্ট কিনব। পুরনোগুলোতে আর চলছে না। শীলা রাজি। সুভদ্র ফুটপাথ থেকে কিনবে, শীলা রাজি নয়। সে বলে-না, বড় দোকানে চলুন। গড়িয়াহাটায়। গিয়েছিল তারা। অনেক রঙের, স্ট্রাইপের, চেক-এর শার্ট-এর মধ্যে পছন্দ করতে হিমসিম খাচ্ছিল তারা। অনেক রঙের, স্ট্রাইপের, চেক-এর শার্ট-এর মধ্যে পছন্দ করতে হিমসিম খাচ্ছিল তারা। ক্লান্ত দোকানদার একটা শার্ট তুলে দেখিয়ে শীলাকে বলল—আপনার হাজব্যান্ডকে এইটে পরিয়ে দেখুন, খুব মানাবে। যান না, ট্রায়াল রুমে চলে যান দুজনে, পরিয়ে আনুন।
খুব লজ্জা পেয়েছিল শীলা। সুভদ্র অবশ্য দোকানদারের ওপর এক ডিগ্রি যায়। গলা বাড়িয়ে বলল—আমার ওয়াইফ স্ট্রাইপ পছন্দ-করেন। এটা চেক, এটা ওঁর পছন্দ নয়।
এ সব কি খেলা! কেমন খেলা? খুব বিপজ্জনক? সে যাই হোক, দোকানদারের ভুল আর ভাঙেনি তারা। ওইরকমই রয়ে গেল তাদের সম্পর্ক, ওই দোকানে। হয়তো চিরকালের মতো।
অজিত কিছুই জানে না। কিন্তু একবার সে গোপনে ডাক্তার মিত্রের কাছে গিয়ে নিজেকে পরীক্ষা করিয়েছে। তার ঘোর সন্দেহ ছিল, তার নিজের হয়তো সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা নেই। ডাক্তার মিত্র তাকে পরীক্ষা করেছে। রিপোর্ট দেওয়ার সময়ে বলেছে—ডিফেক্টটা মাইনর। এতে আটকানোর কথা নয়। তবু কয়েকটা ওষুধ দিচ্ছি।
সেই কূট সন্দেহটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। শীলার পেটের বাচ্চাটা…।
অজিত আজকাল প্রায় দিনই কুমারস্বামীর কাছে যায়। অনেকক্ষণ থেকে রাত করে ফেরে। তার মুখে চোখে একটা অদ্ভুত তদগত ভাব। বিরলে শ্বাস ফেলে সে। গভীর শ্বাস, চোখ বুজে আবেগভরে বলে—বাবা।
॥ ছাপ্পান্ন ॥
চারদিকে মাইল মাইল জুড়ে মেঘের ঘুটঘুট্টে ছায়া।-বহেরুর খামারবাড়ির ধারে দাঁড়ালে কত দূর যে চোখ চলে যায়। ননীবালা দেখলেন, সেই অফুরান ফাঁকা জমির ওপর দিয়ে একটা ধুলোর পরদা উড়ে আসছে। বাতাসে ভ্যাপসা গরম ছিল এতক্ষণ, হঠাৎ সেই বাতাসে একটা ভেজাল ঢুকে গেল। উত্তুরে বাতাসের মতো ঠান্ডা আর জলগন্ধী হাওয়া এল কোখেকে। মুঠো মুঠো ধুলো কাঁকর এসে পড়ছে চোখেমুখে। ছেঁড়া কাগজ, গাছের পাতা, পাখির বাসার খড়কুটো উড়ছে চারধারে। বড় গাছগুলো যেন ধনুষ্টঙ্কারে বেঁকে যাচ্ছে। এক-একবার। প্রবল বাতাস ঠেলে দিচ্ছে তাঁকে, ননীবালা জোর পায়ে ঘরে এসে হুড়কো দিলেন। বাতাসের এত চাপ যে কপাটের পাল্লা দুটো ঠেসে দিতে পারছিলেন না।
ব্রজগোপাল উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছিলেন। একবার বললেন—ঝড় আসছে। এখন আলো-টালো জ্বেলো না।
ননীবালা দেখেন ঘরময় ধুলোবালি পড়েছে পুরু হয়ে, বিছানায় রাজ্যের কাঠিকুটো নোংরা এনে ফেলেছে বাতাস। বিছানা দুহাতে ঝাড়তে ঝাড়তে শুনতে পেলেন, বাইরে বাতাস গোঙাচ্ছে। বেড়ার ওপর সপাট করে এসে পড়ছে বাতাস, ঠিক যেন চোর ডাকাত ভেঙে ফেলছে ঘর। টিনের চালে একরকমের গুমগুম শব্দ। ঘরটা কেঁকে কেঁপে ওঠে। কলকাতার পাকা বাড়িতে ঝড়বৃষ্টি তেমন টের পান না। এখানে এই কাঁচাঘরে, খোলা মাঠের মধ্যে এমন প্রবল ঝড়ের আভাস দেখে বুকটা কেঁপে কেঁপে ওঠে। বাইরে কারা চেঁচামেচি দৌড়োদৌড়ি করছে। সামাল সামাল ভাব। একবার বহেরু এসে দরজায় কিল দিয়ে চেঁচিয়ে বলল—মাঠান, ঘরে আছেন তো সব?
