অজিত মাথা নাড়ে।
কুমারস্বামী হাতটা অজিতের চোখের সামনে একটা কূট মুদ্রায় ঘুরিয়ে দেখায়, বলে— ম্যাজিসিয়ান দ্যাখো।
অজিত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বিন্দুমাত্র কৌশল, সামান্য মাত্র পেশির সংকোচন বা প্রসারণ সে টের পাবেই।
—দেখছ? কুমারস্বামী বলে।
দেখছে অজিত। হাতে কিছু নেই।
কোনও কৌশল নয়, কুমারস্বামী খুব স্বাভাবিক ভাবে যেন এক অদৃশ্য বাগান থেকে একটা সাদা স্থলপদ্ম চয়ন করে নেয়, অজিতের চোখের সামনে।
—নাও এটা কাছে রাখো। ঝুঁকে কুমারস্বামী তার হাতে ফুলটা দেয়। আর খুব আলতো হাতে তার বুকে নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা ঘষে দেয় একবার। অমনি ম ম করে উঠল চারধারে চন্দনগন্ধের ঢেউ। কী গন্ধ! কী গন্ধ! এমন তীব্র, অসম্ভব চন্দনগাছ জীবনে কখনও পায়নি অজিত। শ্বাস রোধ হয়ে আসে। গন্ধ সম্মোহিত করে রাখে তাকে।
সেই গন্ধ আর সম্মোহন নিয়েই প্রথমদিন ফিরেছে অজিত। এমনই তার বুকের সেই গন্ধের তীব্রতা যে, যখন সে কুমারস্বামীর কাছ থেকে ফেরার পথে বাসে উঠেছে তখন সবাই চনমনে হয়ে চারদিকে চেয়েছে। দু-একজন বলে ফেলল—কী দারুণ গন্ধ! কোত্থেকে আসছে?
শীলাও অবাক। বার বার তার বুক শুঁকে বলল—উঃ! কী গন্ধ মেখে এসেছ! কে মাখালে?
অজিত কুমারস্বামীর কথা চেপে গেল। বলল—কেউ একজন হবে।
—কে গো?
—গোপন প্রেমিকা। অজিত তীব্র একটু হেসে বলে।
শীলা পায়জামা এগিয়ে দিতে হাত বাড়িয়ে বলল—আহা্। প্রেমিকা যদি অত সস্তা হত।
অজিতের কী হল, হঠাৎ বলে ফেলল—কেন অন্যের প্রেমিক থাকতে পারে, আর আমার প্রেমিকাতেই দোষ?
শীলা থমকে গিয়ে বলে— কী বলছ?
—শুনলেই তো। অজিত নিস্পৃহ মুখে বলে।
—শুনলাম। কিন্তু আমাকে বলছ কী?
—তবে আর কাকে?
শীলা স্তম্ভিত ভঙ্গিতে চেয়ে থেকে খুব মৃদুস্বরে বলে—আমার প্রেমিক কে?
অজিত এ কথার উত্তর না দিয়ে বাথরুমে চলে গেল। কিন্তু শীলা তাতে ক্ষান্ত হয়নি।
রাতে যখন শুতে গেছে শীলা অজিত তখন তার একা ম্যাজিকের ঘরে চুপ করে বসে আছে সিগারেট জ্বেলে। এই একা, বিষণ্ণমনে জেগে থাকা, তার বড় প্রিয়। সামান্য একটু ইনসোমনিয়ার মতো আছে অজিতের। রাত করে শোয়, বেলা করে ওঠে। রাতে যেটুকু সময় জেগে থাকে সে সময়টুকুই তার নিজস্ব। সারাদিনের খানিকটা অফিসের, খানিকটা শীলার, কিছুটা দাড়ি কামানো, স্নান করা, খাওয়ার মতো বাজে কাজের। শুধু এই সময়টুকু তার। এ সময়ে শীলা তাকে শুতে ডাকলে সে ভারী বিরক্ত হয়। গভীর রাত পর্যন্ত সে শুধু জেগে বসে থাকে। নিবিড় একাকী লাগে নিজেকে। তখন টের পায়, তার চারধারে এক অনন্ত অন্ধকার মহাজগৎ।
সেদিনও বসেছিল। ছোট্ট একটা নাইট ল্যাম্প জ্বলছে দেয়ালে। সে সময়ে হঠাৎ মহিমময়ীর মতো শীলা ঘরে এসে দাঁড়াল। মহিমময়ী, কারণ কান্নার জলে তার চোখ ঝলসাচ্ছে, ওঠাপড়া করছে প্রবল বুক, মুখে তীব্র অভিমান থমথম করছে। রাগলে শীলা আর আটপৌরে থাকে না।
তুমি ওকথা কেন বললে? শীলা রুদ্ধ গলায় বলে—আর একদিনও ইঙ্গিত করেছিলে তুমি কি আমাকে সন্দেহ করো?
—করি।
—কেন? শীলা হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে মুখ তুলে বলল।
অজিত একটু ম্লান হাসি হেসে বলে—তার কারণ, আমার বয়স প্রায় চল্লিশ, বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। অনেকদিন একসঙ্গে ঘর করার পর তোমার কাছে আমার চার্মও আর নেই। তা ছাড়া আমি সঙ্গ দিতে পারি না, স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা নাই। আমাকে যে তুমি আর পছন্দ করবে না, এটাই স্বাভাবিক।
শীলা উন্মুখ হয়ে বলে—কে বলল পছন্দ করি না! তুমি কি আমার মনের কথা জানো?
—না। অজিত মাথা নাড়ল, বলল-না জানাই ভাল। মনে কত পাপ থাকে। আমরা দুর্বল মানুষ সব পাপকে ক্ষমা করতে পারি না।
শীলা আস্তে মাথা নেড়ে বলে—আমার মনে কোনও পাপ নেই। বিশ্বাস করো। আমি তোমাকে ভালবাসি। ভীষণ।
এইসব কথার পর শীলা তার হাঁটুতে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল। তারা কেউ সেদিন সুভদ্রর নাম উচ্চারণ করেনি। ওই নামটা উচ্চারণ করায় কোথায় যেন একটা লজ্জা ছিল, সংকোচ ছিল, আর ছিল ভয়।
শীলার সঙ্গে সেই রাতে শুয়ে তাকে অনেক আদর করেছিল অজিত। অনেক আবেগ দিয়ে ভালবেসেছিল। আর তাদের আদরে, আবেশে, রতিক্রিয়ায় সারাক্ষণ আবহের মতো কাজ করেছিল সেই চন্দনের পাগল- করা- গন্ধ।
তিন দিন পরও সেই গন্ধ রইল অজিতের বুকে। অফিসের অনেকেই এসে অজিতের বুকে শুঁকে দেখে যেতে লাগল। সেনদা বললেন—অজিত, তুমি বড় ভাগ্যবান। কুমুদ বোস সারা অফিসে তড়পাতে লাগলবলেছিলুম কিনা শালা যে কুমারস্বামীই হচ্ছে আসল লোক! ম্যাজিক হলে আমাদের ম্যাজিসিয়ান ধরে ফেলত না? ওসব যোগের ক্রিয়াকর্ম বাবা, দৈব শক্তি, ইয়ারকির কথা নয়।
শীলার সময় কীভাবে কাটে তা জানে না অজিত। সারাদিনের মধ্যে শীলার সঙ্গে দেখা হয় কতক্ষণ?
আজ কয়েক দিন হল ইস্কুল খুলেছে। শীলা বন্ধের পর ইস্কুলে গিয়েই শুনেছে, মনীষা দিদিমণি রিটায়ার করার আগে দুমাস ছুটি নিয়েছেন। ছুটির শেষে জয়েন করেই রিটায়ার করবেন। তাঁর জায়গায় ফের সুভদ্রকে নেওয়া হবে।
সুভদ্রকে নেওয়া হবে কেন? কারণ, সুভদ্র হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার সময়ে খুব ভাল ম্যানেজ করেছিল সব কিছু।
খবরটা পেয়েই শীলার শরীরের ভিতরে অন্ধকারে আলো জ্বলে উঠল। রঙিন সব আলো। একটা অসহনীয় সুখবোধ। মেয়েদের অনেক ব্যথা স্বামীকে বলতে নেই, কাউকে বলতে নেই। সে সব কথা তাদের মনের মধ্যে চন্দনের হাতবাক্সে লুকনো থাকে।
