ননীবালা মুখ ফিরিয়ে নয়নের মুখে তাকিয়ে বললেন—না হোক গে। জলে পড়েছি নাকি?
—থেকে যান।
—থাকব।
বলে হাসলেন ননীবালা। বলে হাসলেন ননীবালা। ‘থাকব’ কথাটায় যেন তাঁর বুক হঠাৎ আজ হালকা হয়ে গেল।
॥ পঞ্চান্ন ॥
যেদিন প্রথম কুমারস্বামীর কাছে গিয়েছিল অজিত সেদিন ঘরে ঢুকেই সে এক ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে পায়।
গর্চার সেকেন্ড বাই লেনে দোদলায় এক ব্যাবসাদার শিষ্যের ফ্ল্যাটে তখন ছিল কুমারস্বামী, ঘরে ঢুকবার আগে খুব সতর্ক গলায় কুমুদ বোস বলল—ভিতরে ঢুকে কোনওরকম বদমায়েশি করবে না বলে দিচ্ছি। টিটকিরি-ফিটকিরি দিয়োছ কী ঘাড় ভেঙে ফেলব।
জুতো খুলতে খুলতে অজিত হাসল। আর তখন টের পেল বহুকালের অবিশ্বাস ভেদ করে বুকের ভিতরে একটা ভয় ধুকপুক করে নড়ছে। ভক্তি নয়, বিশ্বাসও নয়, কেবলমাত্র একটা ভয়। এইসব ভয় থেকেই ভক্তিরে জন্ম, অজিত জানে।
বন্ধ দরজায় মৃদু শব্দ করতেই দরজা খুলে গেল। ভিতরে একটা একতরফা প্রবল স্বর শোনা যাচ্ছে। চৌকাঠে পা দিয়েই অবাক হয়ে গেল অজিত।
একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে চিত করে ফেলে বুকে হাঁটু দিয়ে বসে আছে কুমারস্বামী। চাপা প্রবল গলায় অলৌকিক চিৎকার করে বলছে—পাপী! পাপী! মহাপাপী। অবিশ্বাসী পাষণ্ড!
পড়ে থাকা লোকটা হাত-জোড় করে ভয়ে নীল হয়ে বলছে— বাবা, রক্ষা করো, রক্ষা করো।
এই দৃশ্য একটু পরে জানতে পেরেছিল অজিত যে, ওই ম্যাজিষ্ট্রেট সেদিনই প্রথম এসেছিল কুমারস্বামীর কাছে। লোকটা ঘরে ঢুকতেই কুমারস্বামী আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠে এসে দক্ষ কুস্তিগীরের মতো তাকে ধরে চিতপটাং করে ফেলেছিস।
তারা ঢুকতেই কুমারস্বামী লোকটাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। একটু আগের প্রবল রাগ আর ঘৃণা ধুয়েমুছে গেছে মুখ থেকে। কী স্নিগ্ধ হাসি হাসল! কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল, তাতে জটা। পরনে হালকা গেরুয়া বহির্বাস আর জামা। গালে যিশুর দাড়ির মতো দাড়ি। বয়স পঞ্চাশ হতে পারে। খুব ফরসা, লম্বা চেহারা। চোখ দুটি দিঘল। অর্থাৎ চেহারাতে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ কাজ বাগিয়ে বসে আছে। দুহাত বাড়িয়ে বলল—আয়! আয়!
এক বুকে কুমুদ বোস, অন্য বুকে অজিতকে জড়িয়ে ধরল অনায়াসে। তখন কুমারস্বামীর গা থেকে এত তীব্র চন্দনের গন্ধ প্রায় শ্বাসরোধ করে দিল অজিতের। তার গালে-দাড়িটা ঘসে দিয়ে কুমারস্বামী বলল—তোর বুকটা বড় ফাঁকা। না রে?
প্রথম রাউন্ডে কুমারস্বামীই জিতে গেল। ওই যে কথাটা! তোর বুকটা বড় ফাঁকা, না রে? ওই কথাটাই অজিতের ভিত ভেঙে ফেলে আর কী।
ম্যাজিস্ট্রেট লোকটা উঠে বসে চারদিকে ভ্যাবলার মতো চাইছে। একটা কষ্টের শব্দ করে হঠাৎ কাতরভাবে বলল—বাবা, আমাকে আশ্রয় দিন।
তখন অজিত আর কুমুদ বোসকে ছেড়ে কুমারস্বামী তার দিকে হাত বাড়িয়ে তুলে আনল তাকে। কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলল—হাত মুঠো কর।
লোকটা তাই করে। কুমারস্বামী তার মুঠোর ওপর একবার বুড়ো আঙুল বুলিয়ে ছেড়ে দিয়ে বলে—এবার মুঠো খুলে হাতটা শোঁক তো।
লোকটা শুঁকেই চেঁচিয়ে বলে—এ তো গোলাপের গন্ধ! আঃ, কী সুন্দর গোলাপের গন্ধ!
বহু লোক ঘরে বসে আছে। প্রায় সবাই জোড়হাত, আর তাদের চোখ অর্ধেক বোজা। মুখে লোভলালসার ভাবের ওপর একটা ভয়-ভক্তির সাময়িক প্রলেপ পড়েছে। সবই লক্ষ কারণ অজিত। ম্যাজিস্ট্রেট লোকটা বসে বসে হাঁফাচ্ছে, আর হাত শুঁকছে। আর যারা বসে আছে তারাও কোনও না কোনও জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে। বাইরে বিস্তর পার্ক করা গাড়ি দেখে এসেছে অজিত। এটা গরিব গুর্বোর জায়গা নয়। দু-চারজন ঝুঁকে ম্যাজিস্ট্রেটের হাতের গোলাপের গন্ধ শুঁকল। কুমুদ বোস সেই হাতটা টেনে এনে অজিতের নাকে ধরে বলল—শোঁকো শালা। স্বর্গের গন্ধ।
একধারে তক্তপোশের ওপর বাঘের গায়ের মতো কালো-হলুদ ডোরা কাটা চাদর পাতা, তার ওপর তাকিয়া। সেখানে কুমারস্বামী বসে, আর ভক্তদের জন্য মেঝেয় ঢালাও কার্পেট পাতা। কুমারস্বামী তক্তপোশে গিয়ে বসেছে, মুখে হাসি। ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর চড়াও হওয়াতে ঘরের আবহাওয়ায় ভক্তিভাবের ইলেকট্রিসিটি বয়ে যাচ্ছে। সবাই বেশ চাঙ্গা।
একজন অচেনা লোক অজিতকে চাপা স্বরে বলল—এখানে বসে কুকথা ভাববেন না, অবিশ্বাসী হবেন না। বাবা সব ভাইব্রেশন টের পান।
তাতে বুকে ভয়ের পাখিটা ফের নড়েচড়ে ওঠে। অফিসে সে অনেক ঠাট্টা-ইয়ারকি করে, কিন্তু এখানে আসার পরই কী যেন ঘটছে তার ভিতর। বড় দুর্বল লাগছে নিজেকে, অসহায় লাগছে। সে একটা মন দিয়ে বুঝতে পারছে যে এই ঘরের পরিবেশ, ফুল ও চন্দনের গন্ধে, কুমারস্বামীর রাগ হাসি, বুক-টেনে-নেওয়া এই সব সব কিছুর মধ্যেই একটা অত্যন্ত নিপুণ কৌশল আছে, অন্য একটা মন আবার এই সব কিছুকেই বিশ্বাস করতে চাইছে। অন্য মনটা বলছে এই যে সব সমাজের উঁচুতলার লোক, এরা কী সবাই বোকা? অশিক্ষিত? কোনও চালাকি থাকলে এরা নিশ্চয়ই টের পেত।
তাকে প্রচণ্ড চমকে দিয়ে এই সময়ে কুমারস্বামী বলল—অজিত এস।
বলে হাত বাড়ায় কুমারস্বামী। অজিত মন্ত্রমুগ্ধের মতো কাছে এগিয়ে যায়। মেঝেয় চৌকির নীচে বসে মুখ তুলে তাকায়। কুমারস্বামী সহাস্য মুখে বলে—তুমি ম্যাজিক জানো?
অজিত মাথা নেড়ে বলে—একটু।
কুমারস্বামী তার শূন্য ডান হাতখানা অজিতের দিকে বাড়িয়ে বলল—পামিং আর পাসিং জানো?
