গাছে ফল ফলে, এ বহুকাল দুচোখে দেখেননি ননীবালা। কলকাতায় সবই মেলে, কিন্তু সে শুধু ফলটুকু। গাছের ফল গাছে দেখার আনন্দই আলাদা। কলকাতায় আসার আগে পর্যন্ত গাছগাছালির সঙ্গে যাহোক সম্পর্ক ছিল। এখন পায়ের নীচে কদাচিৎ মাটির স্পর্শ পান।
ঘুরে ঘুরে ঘেমে গেছেন। মুখচোখ লাল। কোথা থেকে একটা ছাতা নিয়ে এসে নয়নতারা পাশে পাশে চলতে থাকে, ননীবালার মাথায় ছাতাখানা ধরে। ভারী লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটা। মুখখানায় কি লাবণ্যের ঢল! বহেরুর ঘরে সবই বেশ ফলে।
হাঁটতে হাঁটতে ননীবালা বলেন—তুই কেন হুট করে বুড়ো হয়ে গেলি বহেরু? চেহারাটা কেমন দুলদুল করে।
বহেরু গম্ভীরভাবে বলে—সময় হল। খোলস পালটাবে।
বহেরু নিয়ে গিয়ে বাস্তুজমিটা দেখাল। বলল—এইখানে কর্তা বাড়ি করবেন বলে ঠিক ছিল।
বলে খুব প্রত্যাশা নিয়ে তাকাল ননীবালার মুখের দিকে।
ননীবালা ফস করে বললেন—এখানে জমির দাম কী?
বহেরু শ্বাস ফেলে বলে—গাঁ গঞ্জ জায়গা, দাম আর কী হবে!
তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গাটায় রোদ পড়েছে। একটা পাতকুয়া। কয়েকটা গাছ। ননীবালার চোখে বালি পড়ল বোধ হয়। চোখটা করকর করে ওঠে। মনটাকে শক্ত করে বললেন—জমির দাম তো সব জায়গায় বাড়ছে।
বহেরু একটু ভয়-ভয় চোখে তাকায় ননীবালার দিকে। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলে-কর্তামশাইয়ের জমি, তিনি তো বেচবেন না। দাম যাইহোক।
ননীবালা বে-খেয়ালে বলে ফেললেন—চিরকাল কি সে-ই থাকবে। জমিটা ভোগ করবে কে?
বলেই ননীবালা অন্তরে শিউরে ওঠেন। কী কথাটা বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে। মনটা কত বড় পাপী। সামলে নিয়ে বললেন—আমিও থাকব না, তুইও থাকবি না। তাই এখন ছেলেপুলেদের সুখ-সুবিধে বুঝে এসব জমি-জোত করতে হয়। দেখাশোনার কেউ না থাকলে, বাড়িঘর না হলে এ জমি ধুয়ে জলটা খাবে কে? বেচবে না বলে গোঁ ধরলে কি হয়?
বহেরু শুনে হঠাৎ তার বুড়ো মুখে যুবকের হাসি হেসে মাথা নাড়ল। বলল—কর্তারে বোঝায় কে?
—তুই বোঝাবি।
—উরে বাস রে। এসব বললে খেয়ে ফেলতে আসেন।
পাশ থেকে নয়নতারা হঠাৎ তার নরম গলায় বলে—মা, জমিটা ব্রজকর্তা ষষ্ঠীপদর নামে লিখে দিয়েছেন।
ঠিক বুঝতে পারেন না ননীবালা। হাঁ করে তাকিয়ে বললেন—কে? কার নামে লিখে দিযেছে বললি?
—ষষ্ঠীপদ। নিবারণী দিদির ছেলে। ওই যে যেটা সবসময়ে ব্রজকর্তার কাছে ঘুরঘুর করে আর ছড়া কাটে।
—ও। বলে স্তম্ভিত হয়ে থাকেন ননীবালা। বহুকষ্টে ভিতরের জ্বলুনিটা সামলে নিয়ে বলেন- কেন?
বহেরু একটা ধমক দিল নয়নকে। বলল—তোর এসব খোলসা করে বলার দরকার কি?
ননীবালা একটু কঠিন চোখে বহেরুর দিকে চেয়ে বলে—আমার কাছে লুকিয়ে কি হবে? লুকোস না। আর কী কী লিখে দিয়েছে বল।
উত্তরটা নয়নতারাই দিল—আর কিছু নয়। ষষ্ঠীপদর বাপ তো এখানেই ঘরজামাই থাকে। তার কিছু নেই। কপিলদাদা কোকাভাই সব ঠিক করেছে ওদের এখান থেকে তাড়িয়ে দেবে। তাড়িয়ে দিলে আর যাবে কোথা, জায়গা তো নেই, পথে পথে ভিক্ষে করে বেড়াবে। ব্রজকর্তা বড় ভালবাসে ষষ্ঠীকে। তাই মায়া হল, লিখে দিলেন।
খোল বগলে দিগম্বর চলেছে। বাদামতলা থেকে ছেলেপুলেরা পিছু নিয়েছে, হাততালি দিয়ে খ্যাপাচ্ছে—খোল হরিবোল, খোল হরিবোল…
দিগম্বর গালমন্দ পাড়ে না। ভারী অসহায় বোধ করে, আর ছুটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পৃথিবীতে আর এমন নির্জন জায়গা খুঁজে পায় না দিগম্বর যেখানে নিরিবিলিতে খোলখানা নিয়ে বসবে। আজকাল খোল নিয়ে বসলে গুরুর ছায়া এসে পড়ে খোলে। আশ্চর্য সব শব্দ ফোটে। হরি-হরি বলে খোল কাঁদে, খোল আহ্লাদে আটখানা হয়। কোন মহাজগৎ থেকে সব অজানা বোল ভেসে এসে খোলের শব্দের মধ্যে ফুটে ওঠে। দিগম্বরের বাহ্যজ্ঞান থাকে না। শ্রীকৃষ্ণ যখন রাসলীলা করেছিলেন, কুঞ্জবনে গোপিনীদের সঙ্গে খেলা করতে করতে কোথায় হঠাৎ মিলিয়ে গেলেন ঠাকুর। চারদিকে তখন কেবল আলো, আর স্বর্গীয় এক শব্দ। হা কৃষ্ণ কোথা -কৃষ্ণ বলে পাগল গোপিনীরা কৃষ্ণকে খোঁজে, পায় না, পাবে কী করে! কৃষ্ণ যে তখন শব্দব্রহ্মে মিলিয়ে আছেন। তাঁর অস্তিত্বের নাদ শুধু শব্দ হয়ে ঘিরে আছে তাদের। ব্রজবামুন বলেন—রাসলীলা মানে হল শব্দলীলা। দিগম্বর সেটা আগে বুঝত না,এখন বোঝে, শব্দ কখন ভগবান হয়ে ওঠে, শব্দ কখন যে দুনিয়াছাড়া করে দেয় দিগম্বরকে। বাবা রে, কোথা থেকে যে সব শব্দ এসে ভর করে খোলে। দিগম্বর তাই আজকাল মাঝে মাঝে খোলখানা জড়িয়ে ধরে, তার গায়ে মাথা ঘরে, কাঁদে আর বলে— আরবার যেন শব্দ হয়ে জন্মাই হরি হে।
ট্যাটন ছেলেগুলো পিছুতে লাগে। কোথাও বসতে দেয় না। যেখানেই গিয়ে খোল নিয়ে বসে দিগম্বর সেখানেই গিয়ে হাততালি দিয়ে নেচে নেচে চেঁচায়—খোল হরিবোল, খোল হরিবোল…। শব্দের যোগ ছিঁড়ে গেলে বড় যন্ত্রণা হয়। চারধারে একটা ময়লা পৃথিবী, তার মধ্যে যেন মুখ থুবড়ে ভাঙা হাঁড়ির মতো পড়ে আছে, এমন মনে হয়।
কতবার বহেরুকে ডেকে বলেছে—ভাইয়ের পো, তার গাঁয়ে এত লোক আলো কমনে? আগে তো দেখতাম না এতসব কাচ্চা বাচ্চা। বড় ঝঞ্ঝাট করে। আমারে শব্দ শুনতে দেয় না।
বহেরু বলে—গুষ্টি তো বাড়েই খুড়ামশাই, কবো কী? দেবোনে আপনারে একটা টংগী ঘর করে। মাচানের ওপর বসে বাজাবেন, কেউ নাগাল পাবে না।
