ব্রজগোপাল সামনের দিকে চেয়েছিলেন, সেখানে একটা তাজমহলের ছবিঅলা বাংলা ক্যালেন্ডার। কিন্তু সেই ক্যালেন্ডার ভেদ করে বহু দূরে মগ্ন হয়ে আছে চোখ। বললেন—বাবা, পৃথিবীজোড়া ভিড় দেখছ, কিন্তু লক্ষ করে দেখো মানুষ কত কমে গেছে। কাজের মানুষ, চরিত্রবান মানুষ, ব্রাহ্মী মানুষ আর চোখে পড়ে না। স্ত্রীর ভিতর দিয়ে স্বামীই প্রসূত হয়, তাই স্ত্রীকে বলে জায়া। স্ত্রী সন্তানকে মেপে দেয়। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর টান ও গুণগ্রহণমুখরতা যতটা এবং যেমন, ততটুকু ও তেমনই সে পারে সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত করতে। এটাই হচ্ছে পরিমাপ। তেমন বিয়েও হয় না, তেমন ভালবাসাও দেখি না। তাই ‘শ্রদ্ধাহীন’ প্রবৃত্তিপরায়ণ, ক্ষীণ মস্তিষ্ক আর প্রতিভাহীন মানুষে দেশ ছেয়ে যাচ্ছে।
ননীবালা চা করে নিয়ে এলেন। রণেনকে দিলেন, ব্রজগোপালকেও।
ব্রজগোপাল একটু ইতস্তত করছিলেন দেখে ননীবালা বলেন—চা খাও না?
ব্রজগোপাল হঠাৎ উদার হাসি হেসে বলেন—দাও, করেছ যখন।
দরজার কাছে কোকা এসে দাঁড়িয়ে আছে। বলল—দাদাবাবু, বেড়াতে যাবেন না?
রণেন মাথা নাড়ল—যাব।
—চলেন। খালপাড় থেকে ঘুরে আসি।
কোকার সঙ্গে রণেন বেরিয়ে গেলে ব্রজগোপাল আর ননীবালা একা হলেন বহুকাল এ-রকম একা ঘরে দুজনের দেখা হয়নি।
বাতিটা একটু কমিয়ে ননীবালা চৌকির একধারে বসে আছেন। ব্রজগোপাল এখনও অন্যমনস্কভাবে চেয়ে আছেন সুমুখে। বেড়াল ঢুকে রণেনের এঁটো কাপটা চেটে পায়ের ধাক্কায় টং করে ফেলে দিয়ে গেল। শব্দটা কেউ খেয়াল করলেন না।
ব্রজগোপাল জিজ্ঞেস করলেন—হঠাৎ সব আসা হল কেন? জমিজমা সব বিক্রি করে দিতে নাকি! না ধানের দায় বুঝতে!
—তোমার তো ওসবই মনে হবে। আমি স্বার্থ ছাড়া আর কিছু বুঝি না নাকি!
ব্রজগোপাল ক্ষণেক চুপ করে থেকে বলন—সেও খারাপ কথা নয়, কেউ যদি তোমরা না-ই আসতে পারো তো বরং বিক্রি করে দেওয়া ভাল। আমি আর কদিন। বিক্রি করতে চাইলে বহেরুই কিনে নেবে।
ননীবালা ঘোমটাটা তুলে দিয়ে হাতপাখা নাড়তে নাড়তে বলেন—সে সব ভাবনা ছিল না।রণো তোমার জন্য হঠাৎ অস্থির হল। কী সব কু স্বপ্ন দেখেছিল, মুখে আনা যায় না। একবার চোখের দেখা দেখতে আসা।
—ভাল। ব্রজগোপাল বললেন।
—শরীর তো ভাল দেখছি না।
শরীর তো পুষে রাখার জিনিস নয়, কাজে লাগাতে হয়। সব সময়ে তেল চুকচুকে কি রাখা যায়?
—কাজ তো জানি। পরের গোয়ালে ধোঁয়া দিয়ে বেড়ানো।
—সেইটেই আসল কাজ। নিজের গোয়াল যদি না থেকে। ধোঁয়া তো দিতে হবে।
ননীবালা এই চুরি ছিনতাইয়ের দিনেও মোটা বালা পরেন, ছগাছা করে চুড়ি রয়েছে হাতে, গলায় একটা বিছে হার। গয়নাগাটির একটু শব্দ হল, শাড়ির মাড় খস খস করল, শ্বাসপ্রশ্বাসের একটু টান শোনা গেল। অর্থাৎ ননীবালা আছেন। এই অস্তিত্বটুকু কতকাল টের পাননি ব্রজগোপাল।
অন্ধকারে একবার ঠাহর করে ননীবালাকে দেখে ব্রজগোপাল বললেন—ছেলেরা সব কে কেমন?
—তোমারই ছেলে।
—বনিবনা করে থাকতে পারবে?
—কে! আমি, না ছেলেরা?-সকলের কথাই জিজ্ঞেস করি।
—আমার আর থাকার কী! বাড়িটা তুলতে যদি পারি তো দুভাগে ভাগ করে দিয়ে যাব, দুই ছেলে থাকবে।
—ভাগাভাগির কথা আগেভাগেই ভেবে রেখেছ?
—সেইটেই তো বুদ্ধির কাজ। বলে ননীবালা উঠে পিক ফেলে এলেন বাইরে। বললেন—আগে থেকেই ভাগাভাগি করে দেওয়া ভাল।
ব্রজগোপাল বললেন—তার মানে, তোমার ছেলেরা মানুষ হয়নি।
ননীবালা পুত্রগতপ্রাণ। এ কথার একটা কড়া উত্তর দিতেন। কিন্তু এমন সময়ে নয়নতারা বাইরে দরজার কাছে এসে ডাকল৷ ভারী মিষ্টি ডাকটি—মা!
—কী রে? ননীবালা উঠলেন।
—বাবা মাছ পাঠিয়ে দিল। রান্নাঘরে রেখে যাব?
—দেখি। ননীবালা বাতিটা তুলে নিয়ে গিয়ে দেখেন—ওমা! এ কত মাছ রে! এত খাবে কে?
—এই তো কখানা।
—তোদের বাপু বড্ড গেঁয়ো ভাব। বলেন ননীবালা। তবু খুশি ঝরে পড়ে গলায়। কলকাতার বাড়িতে আজকাল আর বড় মাছের টুকরো আসে না। রণেনটা বড় মাছ ভালবাসে। কিন্তু সোমেন নয়। সে কেবল মুরগি মুরগি করে পাগল। বললেন—রান্নাঘরে রাখো। আসছি।
ননীবালা ঘরে আলোটা রেখে চলে গেলেন রান্নাঘরে। রান্নাঘরই আজকাল ভাল লাগে তাঁর। সেখানে বসে নয়নতারাকে ডেকে বললেন—তুইও বসে থাক না, কথা বলি। তোর স্বামীটা নাকি আবার বিয়ে করেছে শুনলাম!….
ঘরে বসে ব্রজগোপাল সেই কথার শব্দ শোনেন। অদ্ভুত লাগে। ননীবালা পাশের রান্নাঘরে বসে কথা বলছেন, এ যেন ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। এ কি সম্ভব? এ কি হয়?
রাত্রিবেলা শোওয়ার সময় ননীবালা বললেন—ও বাড়িতে কী হচ্ছে কে জানে! একা বীণার হাতে সংসার।
—কী করবে? ব্রজগোপাল মাচানের বিছানায় শুয়ে থেকে জিজ্ঞেস করেন।
—কালই চলে যাব।
—যেয়ো, ব্রজগোপাল বলেন। একটা শ্বাস চেপে রাখেন কষ্টে।
॥ চুয়ান্ন ॥
তিন বিঘের ওপর বহেরু একখানা বাগান করেছে। চুন-সুরকি দিয়ে গাঁথা ইটের দেওয়াল ঘেরা। ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন ননীবালা। কাঁঠালের কী ফলন। আগাপাশতলা ছেয়ে আছে ফলে। গাছের গোড়ায় খেজুর কাঁটার বেড়।
বহেরু বলল—শেয়ালের জন্য নয় মাঠান, কাঁটা দিলে ফলন ভাল হয়। গাছ শিউরে ওঠে তো।
জামরুল দেখে অবাক মানেন ননীবালা। আমগাছে যত পাতা তত ফল বলে ভ্রম হয়। বললেন—তোর হাতে মন্ত্র আছে বহেরু। কী ফলন! চোখ জুড়িয়ে যায়। বহেরু হাসে। বলে—ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ।
