সেই ঘরটা আর করে দেওয়া হয়নি।
পিছনে কাচ্চা-বাচ্চা লেগেছে, দিগম্বর খোল-বগলে ছুটে আসছিল বাদামতলা থেকে। ননীবালার মুখোমুখী পড়ে হকচকিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি রাস্তা থেকে নেমে দাঁড়াল পাশে। হাত দুখানা জোড় করে মহা অপরাধীর মতো বোকা মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠোঁট দুখানা কাঁপছে। দুনিয়াতে এই যে আছে দিগম্বর, এই যে শ্বাস টানে ছাড়ে, রাস্তায় পা ফেলে হাঁটে এ সবই তার নিজের কাছে মহা মহা আস্পদ্দার কাজ।
বাচ্চাকাচ্চাগুলো একটু পিছনে আসছিল, হাততালি দিয়ে মহানন্দে খোল হরিবোল বলতে বলতে। বহেরুরই নাতিপুতি জ্ঞাতিগুষ্টি সব। তবু বহেরু হঠাৎ হাঁকাড় ছেড়ে দৌড়ে যায়। বড় বড় মাটির ঢেলা আর চাঙড় তুলে দুই হাতে বাচ্চাগুলোর দিকে ছুঁড়তে থাকে। বাচ্চাগুলো ভয়ে আর্তনাদ করতে করতে দৌড়য়। দুটো একটা পড়ে যায়। একটার ন্যাড়ামাথায় বহেরুর ঢেলা গিয়ে লেগে ভেঙে পড়ে। সেটা মাথায় হাতচাপা দিয়ে ‘বাপরে’ বলে ইঞ্জিনের মতো বেগে ছোটে। চারধারেই নানাজনের ঘর গেরস্তালি, গাছগাছালি, সেসবের মধ্যে পলকে মিলিয়ে যায় সব। দুটো একটা নেহাৎ পুঁটে পুঁটে শিশু পালাতে পারেনি, গুট গুট করে দৌড়চ্ছে। বহেরু তাদের ধাওয়া দিয়ে চেঁচায়—সুমুন্দির পো, খুন করে ফেলব। সেই হাঁক শুনে তারা ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে।
বহেরু হাত ঝেড়ে ফিরে আসে, গামছায় মুখ মুছে দিগম্বরের পিঠে হাত দিয়ে ঠেলে নিয়ে যেতে যেতে বলে–যান খুড়োমশাই, বাগানের মধ্যে চলে যান, জামতলায় বেশ ছায়া আছে। বসে বাজান। সুমুন্দির পোয়েরা আপনার খোলের দাম কী বুঝবে। ওদের কানে গু-মুত ঢুকবে। আপনি যান।
—আহা রে! ননীবালা বলেন—বাচ্চাগুলোকে অমন ধাওয়া দিলি। তুই বড় পাষণ্ড বহেরু |
—ওগুলান মানুষের বাচ্চা নাকি মাঠান? সব কাউয়া। পাপীর বংশ তো। গুণী মানুষের মর্যাদা জানে না।
—তোর সব বাড়াবাড়ি। বাচ্চা মানুষ, ওরা কি ওসব বোঝে!
—বড় হলেও বুঝবে না। আমার ছেলেগুলান তো সব পাকাপোক্ত মানুষ এখন, তারাই কী বোঝে! আমি চোখ বুজলে খুড়োমশাইকে তাড়াবে, বামুনকর্তারে উচ্ছেদ করবে, যত সব আশ্রয় নিয়ে আছে তাদের হাঁকিয়ে দেবে। তারপর নিজেরা সুন্দ উপসুন্দের লড়াই করবে এখানে। আমার দাপে এখনও কিছু করতে পারে না।
ননীবালা হেসে বলেন—তোর এত জ্ঞাতিগুষ্টি, অতিথি-টতিথি, জোটে কোত্থেকে? সবাইকে খাওয়াস-ই বা কী করে?
—আমার গরজেই জোটে সব। মানুষের বড় শখ আমার। ব্রজকর্তাও কন-বহু পালক হও, বহু পোষক হও। তাই করি। গুণী মানুষ পাওয়া-ও চাট্টিখানি কথা নয়। কলের যুগ তো, গুণীরা সব মরে হেজে শেষ হয়ে যাচ্ছে। খুড়োমশাই বা ব্ৰজকর্তা গেলে আর তেমন মানুষ পাওয়া যাবে না। এই সেদিনও উজিরপুরের এক কামারকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। ওদের পূর্বপুরুষ নাকি এমন পোলাদ দিতে পারত যে বিলিতি ইস্পাতও হার মানে। এমন কামান বন্দুক তৈরি করতে যে শ’ শ’ বছরে জং ধরত না। বংশগত বৃত্তি, ব্যাটা কাজও জানে, কিন্তু সে এখন হাওয়ার ফ্যাক্টরিতে বাঁধা মাইনে পায়, এল না।
বলে বহেরু দুঃখমাখা মুখে তাকায়। ননীবালা বোঝেন, এসবই ব্রজগোপালের মাথার পোকা, এর মাথায় ভর করেছে।
বাস্তুজমিটা ষষ্ঠীচরণের নামে লিখে দেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করবেন, ননীবালার এমন ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ব্রজগোপাল ঘরে ছিলেন না। দুপুরে ফিরলেন। স্নান করে খেতে বসলেন বাপ-ব্যাটায় পাশাপাশি। সে এক সুন্দর ছবি। বহুকাল মানুষটাকে নিজের হাতে খাওয়াননি ননীবালা। কথাটা বুকে ঠেলাঠেলি করছিল, অম্বলের ঢেঁকুরের মতো উঠে আসত জিভে, ননীবালা কষ্টে ঠেকিয়ে রাখলেন। ব্রাহ্মণ মানুষের দুপুরের খাওয়াটা নষ্ট হয় যদি।
খেয়ে উঠতে না উঠতেই এলেন ফকির সাহেব। মধ্যবয়সি, বেশ ভাল চেহারা, গালে ছাঁটা দাড়ি, চোখে সুরমা, মাথায় ফেজ। পরনে সাদা লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি। রণেনকে দেখতে এসেছেন।
কিন্তু রণেনকে দেখার ধার দিয়েই গেলেন না, ব্রজগোপালের দেখা পেয়েই গম্ভীর হয়ে বললেন—মোস্তাফা চরিত আর কোরাণে যে নূর আর আওয়াজের কথা আছে সে সম্বন্ধে আপনি ঠিকই বলেছিলেন। আর ইমান মোফাচ্ছেলে আছে—আল্লাহ, তাঁহার ফেরেস্তাগণ, কেতাবসকল, প্রেরিত রসুলগণ, কেয়ামত তকদীয় এবং মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন লাভ—এ সকলের ওপর আমি ইমান আনলাম। বিশ্বাস করলাম। কলেমায় একেশ্বরবাদের কথা বলা হচ্ছে। আর্যরাও তাই। ‘এরিয়া’ কথাটার মানে খুঁজে দেখলাম একেশ্বরবাদ। একেশ্বরবাদীরাই এরিয়ান। আল্লাহ নির্গুণ ঈশ্বর। রসুল ঈশ্বরের মূর্ত অভিব্যক্তি। আর্য হিন্দুদের পুরুষোত্তম। ইসলামে কলেমা তৈয়ব রসুল আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন। রসুল ভিন্ন আল্লাহ অব্যক্ত। গীতায় অব্যক্তের উপাসনার কথা বলা হয়েছে। প্রত্যেকটি কলেমারই মর্মবাণী ঈশ্বরের ও ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ রসুলের প্রতি পূর্ণ আত্মনিবেদন, আর এই আত্মনিবেদনই ইসলাম। ইসলামের সঙ্গে আর্যধর্মের খুব মিল। আপনি বলছিলেন ইসলামই আর্যধর্ম—যা বেদে ও কোরাণে, বব্বর, তৌরাৎ, ইঞ্জিল এইসব ঐশী কেতাবেও প্রচারিত হয়েছে।
ব্রজগোপাল মুখোমুখি বসে খুব নিবিষ্টভাবে শুনছিলেন। একটা শ্বাস ফেলে বললেন— ইমান মোফাচ্ছেলে পুনর্জীবন লাভের কথা আছে না?
