অজিতকে আজকাল বড় ভয় পায় শীলা। খুব নরম গলায় কথা বলে, খুব ভদ্র ব্যবহার করে। যেন অতিথি সজ্জন কেউ। মাঝে মাঝে বলে—তোমার কী হয়েছে বলো তো!
—কী হবে! অফিসে বড্ড কাজের চাপ।
—শরীর ভাল আছে তো?
—ভালই।
শীলা আর বেশি কথা বাড়ায় না। তাদের সম্পর্ক এইরকমই। কখনও আদরে সোহাগে উজ্জ্বল, উচ্ছল। কখনও বা তারা পরস্পর প্রায় অপরিচিত। নিস্পৃহ।
—ম্যাজিসিয়ান, চলো একবার কুমারস্বামীর কাছে তোমাকে নিয়ে যাব। কুমুদ বোস একদিন বলল।
অজিত খুব অন্যমনস্ক মুখ তুলে হঠাৎ হেসে বলল—যাব। আজই চলুন। বলেই উঠে পড়ল।
॥ তিপ্পান্ন ॥
ঘর-সংসারের যে ছবিটা হারিয়ে গিয়েছিল সেটাই কি ফিরে পেলেন ব্রজগোপাল!
গেঁয়ো ছুতোরের তৈরি দুটো ভারী চৌকি ঘরে এনে ফেলেছে বহেরু। তোশক, মশারি, চাদর, বালিশ, সবই জোগাড় করে এনেছে। ফাঁকা ঘরটা সংসারের সামগ্রীতে ঠাসাঠাসি। ব্রজগোপাল দেখেন।
ননীবালা বলেন—একটা দুটো দিনের জন্য এত ঝামেলা করছিস কেন বহেরু? মাটিতে খড়ের গদি পেতে দিবি শোওয়া যায়।
বহেরু চোখ কপালে তুলে বলে—একটা-দুটো দিন কি বলেন মা! তেরাত্তির কম সে কম থেকে যেতে হবে। কর্তামশাই একাবোকা পড়ে থাকেন, ওইভাবে জীবনটা কেটে গেল। এসে যখন পড়েছেন মা দুর্গা, একটু সব সিজিল মিছিল করে দিয়ে যান। ওঁর দেখবার কেউ নেই, আমাদের ছোঁয়া জলটুকু পর্যন্ত খান না। রোগেভোগে বড় মুশকিল।
ননীবালা উত্তর করেন না। এ লোককে কে দেখবে! কার দেখার তোয়াক্কা করেছে লোকটা?
হা ক্লান্ত ব্রজগোপাল পুকুর থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে আহ্নিক সেরে নিয়েছেন। শুদ্ধবস্ত্রটা ছাড়ছেন এমন সময় মাথায় আধ-ঘোমটা দিয়ে ননীবালা পাথরের বাটিতে কাটা পেঁপে সাজিয়ে আনলেন।
—খাও।
—এই কি খাওয়ার সময়!
—তবে কখন খাবে?
—এ সময়ে খাই না, একেবারে রাতে খই দুধ খাব।
ননীবালা একটা শ্বাস ফেললেন, বহুকাল ঘর করেননি, তাই লোকটার অভ্যাস-টভ্যাসগুলো জানা নেই। বললেন—না খেয়ে-খেয়ে শরীরটা যাচ্ছে।
—খেয়েই যায়। একটা বয়সের পর খাওয়ার সংযম ভাল।
—আমার হাতে রান্না খাবে তো! নাকি ছোঁয়া বারণ আছে?
উদাসভাবে ব্রজগোপাল বলেন—খাওয়া যায়।
রণেন ঘুম থেকে উঠল সন্ধ্যা পার করে। এখানে ফ্যান নেই, ঘরটাতেও বেশ গুমোট, তবু বহুকাল বাদে রণেন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। বড় এক শিশুর মতো ঘুম-চোখে উঠে বাবার দিকে চেয়ে রইল একটু। চোখ কচলে ফের দেখে একগাল হেসে বলল-বাবা!
ব্রজগোপাল উঠে এলেন কাছে। পিঠে হাতখানা রেখে বললেন—শরীরটা কেমন লাগে বাবা? ভাল?
রণেন মাথা নেড়ে বলে—ভাল।
—তুমি বড় ভাল ছেলে বাবা। সংসার তোমাকে নষ্ট করছে।
রণেন চেয়ে থাকে বাবার দিকে। চোখে এখনও অবোধ ভাব। বলে-বাবা, এবার আমাদের কাছে চলুন।
ব্রজগোপাল একটু বিষন্ন হেসে বললেন—কেন, তোমরা কি সেখানে খুব সুখে আছো?
রণেন কথাটা হয়তো বুঝতে পারে না। হয়তো পারে, বলে—আপনাকে কে দেখবে এখানে?
ব্রজগোপাল শ্বাস ফেলে বলেন—বাপকুসোনা, আমাকে দেখার জন্য তো লেকের দরকার নেই, বরং তোমাদেরই দেখাশোনা করার মানুষ চাই।
অনেকদিন বাদে রণেন বুদ্ধি খাটিয়ে একটা কথা বলতে পারল। বলল—সেইজন্যই তো আপনি যাবেন। আপনি না দেখলে কে দেখবে আমাদের?
ব্রজগোপাল একটু হাসলেন, বললেন—আমার ভালমন্দের বুঝ কি তোমাদের বুঝের সঙ্গে মেলে? দুদিন পর যখন মিলবে না, তখন আবার সম্পর্ক নষ্ট হবে। এই বেশ আছি। আমাকে বাবা ডাকার লোক আছে, এইটুকু জেনেই সন্তুষ্ট আছি।
—যাবেন না? করুণস্বরে রণেন জিজ্ঞেস করে।
—দূরে তো থাকি না। একদৌড়ের রাস্তা। যখনই মুশকিলে পড়বে তখনই চলে আসবে আমার কাছে। আমিও তো যাই মাঝে মাঝে।
দুঃখিত চিত্তে রণেন ঝুম হয়ে বসে রইল। ননীবালা বাইরে গেছেন। রণেন হঠাৎ জলভরা চোখ তুলে বলে—বাবা, সংসারে শান্তি নেই।
ব্রজগোপাল কথাটা আগেও শুনেছেন। একটু দৃঢ়স্বরে বললেন—শোনো। যেমন একটা সিঁড়ি, তা বেয়ে ওঠাও যায়, নামাও যায়, সংসারও তেমনি। তোমার বউ খারাপ তুমি ভাল, একথা আমার মনে হয় না। আসলে তোমরা দুজনেই ভালমন্দের মানুষ। জোড়টা ঠিক মেলেনি, তাই অশান্তি। হিসেব করলে আমিও সংসারকে শান্তি দিতে পারিনি, তাই পালিয়ে আছি। লোকে হাসে। তোমারও সংসার টানতে কত কষ্ট হয়েছে। অশান্তি আছে তো আছে, তুমি মনটা অন্যদিকে পেলে রাখো।
একদিন গায়ে হাত তুলেছিলাম বাবা।
ব্রজগোপাল তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে স্নিগ্ধস্বরে বলেন—ও আর কোরো না। বলে গলাটা একটু নামিয়ে ব্রজগোপাল বলেন—আজকালকার মেয়েরা স্বামীকে পুরোপুরি একলা-একলি চায়, বুঝলে। স্বামীটা যে সংসার বা সমাজের একজন তা হিসেব করে না। কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। স্বার্থপরতার যুগ তো, নিজের বুঝ বুঝে নিতে চায়। তুমি ওরকম ভাবটা হয়ো না বাপকু। বউয়ের গালে ঠোনা মেরে আদর দেখাবে, তলে তলে নিজের কাজ সারবে। হাত পা চালালেই কি পুরুষসিংহ হওয়া যায় বাবা! বরং ওতে মেয়েমানুষ আরও বেহাত হয়ে যায়।
খানিক চুপ করে থেকে বলেন—বাবা যেতেন বিদেশে। সারাটা বছরই প্রায় বাইরে বাইরে কাটত। মা শতখানটা হয়ে সংসার চালাতেন। এখনকার মতো সব ক্ষুদে সংসার তো নয়। বিশ ত্রিশ পাত পড়ত এক-এক বেলায়। বলতেন, বিয়ে হয়ে এসে যেন সংসার সমুদ্রে পড়ে গেলাম। পরের ঘরের মেয়ে, তাকে তো কেউ ছেড়ে কথা কইবে না। মা দেখলেন, বেশ প্রতিকূল অবস্থা। কিন্তু হাল ছাড়বার পাত্রী ছিলেন না। কোমর বেঁধে সবাইকে খুশি করতে লেগে গেলেন। শ্বশুর কেমন রান্না ভালবাসে, ভাসুরের কোনটা পছন্দ, দেওরদের কোনদিকে ঝোঁক। এই করতে করতে নামডাক ছড়িয়ে পড়ল। ঝগড়া করে নয়, লোকের প্রীতি অর্জন করে করে বছর খানেকের মধ্যে দেখা গেল সেজ-বউ না হলে কারও চলে না। তিনদিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকতে পারেন না, শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক গিয়ে হাজির হয়। নিজেও পারতেন না থাকতে। এইভাবেই দুবছরের মাথায় শাশুড়িকে পর্যন্ত বশ করে ফেললেন। বড় জায়েদের চপকে সংসারের কর্ত্রী হয়ে গেলেন। তখন বাবা বিদেশে থাকতে মার দেখেছি সব সময়ে সেই মানুষের চিন্তা। আমরা মায়ের মুখেই বাবার কথা শুনে শুনে মানুষটাকে চিনেছিলাম। তাঁর স্বভাব, চরিত্র, পরোপকারিতা সব। বাবা রাগী মানুষ ছিলেন, রাগটাগ করতেন বটে কিন্তু মা রা কাটতেন না। বাবাকে ঘিরে তিনি সম্মোহিত থাকতেন বেশ। সেই বাবাও মায়ের প্রশংসা করে বেড়াতেন পাঁচজনের কাছে। আমাদের শরীর স্বাস্থ্য এ সবের জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয়নি কখনও। মা কতগুলো নিয়ম আমাদের মন-সই করে দিয়েছিলেন। নাকে, মুখে হাত দিলে হাত ধোয়া, হাত পা না ধুয়ে ঘরে না-ঢোকা, পরিষ্কার থাকা—এমনি অনেক। আজও মেনে চলি। অসুখবিসুখ হলে মা গিয়ে পাতাটাতা বেটে ওষুধ করে দিতেন। ছেলেপুলেদের জন্য সজাগ থেকে থেকে তাঁর স্বাভাবিক জ্ঞান অনেক বেড়ে যায়। পরে দেখেছি, তাঁর কাছে ওষুধ নিতে পাড়ার বউ-ঝিরা এসে ভিড় করে। এক কাজ করতেন সারাদিন, তবু কখনও তাঁকে অপরিচ্ছন্ন দেখিনি, মাথার ঘোমটাটি পর্যন্ত খসত না। আর কী করে যে একা হাতে অত কাজ করতেন সে এক রহস্য। আর সব কিছুর মধ্যেও তাঁর ছিল বাবার চিন্তা। একটা দোলন-চাঁপা গাছ বাবা রুয়ে গিয়েছিলেন, সারা বছর সেটাতে জল দিতেন মা, আর প্রতিদিন তাতে জল দিতে গিয়ে তাঁর একটা ফুস করে শ্বাস বেরিয়ে পড়ত। বুঝলে বাবা, সেই মাকে দেখে আমি মেয়েমানুষ চিনেছি। তাই আমার সহজে মন ভরে না। কিন্তু মেয়েমানুষ দেখলে আজও মাথাটা নুয়ে পড়ে। মনটা ‘মা’ বলে ডেকে ওঠে। মায়ের কথা শুরু করলে আর থামতে ইচ্ছে করে না। রেলগাড়ির মতো কেবল কথা বেরিয়ে আসতে থাকে গলার নল বেয়ে।
