বীণা ছেলেমানুষ নয়, তিন ছেলেমেয়ের মা। কানে যখন কথাটা তুলেছে তখন বীণা একটা শাড়ি-টাড়ি কিনে আনবে ঠিকই। কিন্তু তাতেও ভয় পান ননীবালা। তেমন ভাল দেখনসই শাড়ি কি কিনবে? শীলুর কত দামি দামি শাড়ি, নিজে রোজগার করে কেনে, বরও ঢেকে দেয় শাড়িতে। কত দামি শাড়ি ঝিয়েদের বিলিয়ে দেয়। আজেবাজে শাড়ি দিলে পরবেই না হয়তো। জামাইও কী ভাববে?
এই সব চিন্তায় পাগল-পাগল হয়ে গেলেন তিনি। এ সব আর কেউ ভাববে না। দায়দায়িত্ব সবই যেন তার একার।
তখনও দুপুর যায়নি। গরমের দুপুর তো, অনেকটা বেলা পর্যন্ত তার আঁচ থাকে। বীণা একটু ঘর বার করে কী ভেবে একটু বেরলো। সাজ-গোজ করেনি বেশিদুর যাবে না। যাওয়ার সময় আজকাল সব সময়ে বলে যায় না। কখনও খেয়াল হলে, মেজাজ ভাল থাকলে বলে—মা একটু অমুক জায়গা থেকে ঘুরে আসছি। আজ বলল না। বোধ হয় শিলুর সাধ নিয়ে মনে মনে একটু আড় হয়ে আছে।
বীণা বেরিয়ে গেলে ফাঁক পেয়ে ননীবালা রণেনের ঘরে এলেন। আর, ঘরে ঢুকেই বড় করুণ দৃশ্যটা দেখলেন। মস্ত বিছানায় বাচ্চাগুলো যে যার মতো ছড়িয়ে শুয়ে আছে। অঘোরে ঘুম। তাদেরই মাঝখানে শুয়ে রণেন। গরমে গায়ে কাপড় রাখতে পারে না, তাই আন্ডারপ্যান্ট পরে শোয়। ননীবালা দেখলেন, আন্ডারপ্যান্ট পরা রণেনকে ঠিক তার ছেলেদের মতোই দেখাচ্ছে। ও রকমই শিশু যেন। শুধু চেহারাটাই যা একটু বড়। একটা হাত ভাঁজ করে তার ওপর মাথা রেখে শুয়েছে। পা দুটো ভাঁজ করা গুটিসুটি। পাখার তলাতেও ওর কপালে, থুতনিতে, পিঠে টোপা টোপা ঘামের ফোঁটা ফুটে আছে।
ননীবালা শুনলেন ঘুমের মধ্যেই রণেন একটা বড় কষ্টের, বড় কাতরতার শব্দ করল। যেন শ্বাস টানতে পারছে না। শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। ননীবালা তাড়াতাড়ি গিয়ে আঁচলে ছেলেটার পিঠের ঘাম মুছতে লাগলেন। স্নেহভরে ডাকলেন—রণো! ও রণো!
রণেন দেখছিল একটা বাগান। কী সুন্দর বাগান। চারদিকে হিম কুয়াশায় ভেজা গাছপালা। কী নিস্তব্ধ! এরকম গাছপালা আর কখনও দেখেনি রণেন। মোচার মতো বড় বড় ফুল ফুটে আছে গাছে। একটা নিমগাছের মতো কিন্তু নিমের চেয়েও অনেক সরল ও সুন্দর গাছ দেখল রণেন। বড় বড় ঘাস হাঁটু পর্যন্ত উঠে এসেছে। চারদিকে একটা গভীর সুঘ্রাণ। বেশ লাগছিল রণেনের। এমন বাগান সে জীবনে দেখেনি। মনটা জুড়িয়ে গেল। হাঁটু সমান ঘাস ভেদ করে আস্তে আস্তে ঘুরছিল সে ইতস্তত। হঠাৎ একবার আকাশের দিকে চোখ তুলে সে স্থির হয়ে গেল। ওইখানে, ওই আকাশে এতক্ষণ তারজন্যই একটা ষড়যন্ত্র তৈরি হয়ে ছিল। রণেন দেখে, আকাশের অনেকখানি জুড়ে এক মহা চাঁদ স্থির হয়ে আছে। এমন বিশাল অতিকায় চাঁদ সে আর কখনও দেখেনি। সেই চাঁদ তারদিকে গম্ভীর, নিস্তব্ধতাময় এক স্থির চাউনিতে চেয়ে আছে। কেবলমাত্র তারদিকেই, কারণ এ বাগানে বা আর কোথাও কেউ নেই। ভীষণ চমকে উঠল রণেন এবং হঠাৎ বুঝতে পারল, আকাশের ওই চাঁদটা চাঁদ নয়। ওই মহাকায় গোলকটিই পৃথিবী। মাধ্যাকর্ষণের কোন ফাঁকে সে পৃথিবী থেকে গলে পড়ে গেছে বহু দূরবর্তী এই বাগানে। যেখানে চেনা গাছ, চেনা ফুল, চেনা গন্ধ, কিংবা চেনা মানুষ কেউ নেই। আচমকা ভয় খেয়ে এক ভাষাহীন চিৎকার করে ‘আঁ—আঁ’ বলে ছুটতে লাগল রণেন। কিন্তু হাঁটু সমান উঁচু ঘাসগুলির ভিতরে ডুবে যায় পা, কিছুতেই সে নড়তে পারে না। আবার দৌড়োতে গিয়েই স্বপ্নটা পালটে যায়। দেখতে পায়, খুব নির্জন একটা মেঠো স্টেশন থেকে একটা ছোট্ট কালো রেলগাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। রেলগাড়ির জানালায় ব্রজগোপালের হাসিমুখ দেখা যাচ্ছে। রণেন মাঠের ভিতর দিয়ে প্রাণপণে দৌড়চ্ছে গাড়িটার উদ্দেশ্যে। পারছে না। কেমন যেন খিল ধরে আসছে হাতেপায়ে। যত জোরে দৌড়োয় তত আস্তে হয়ে যায় গতি। প্রাণপণে হাত উঁচু করে চেঁচিয়ে বলে—থামাও, থামাও, গাড়ি থামাও। বাবার সঙ্গে আমার কথা আছে। কিন্তু গলায় চিৎকার ফোটে না। এক অসহায় ফিসফিসানির শব্দ হয় কেবল। জরুরি কথাটা যে কী তা কিছুতেই মনে পড়ছে না। জনমানবহীন স্টেশনে কোন প্রেত ঢং ঢং করে গাড়ি ছাড়বার ঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছে। ইঞ্জিনের শিস কানে আসে। দৌড়োতে দৌড়োতে দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা নামে রণেনের। সে প্রচণ্ড কাঁদে, ছোটে। অন্তহীন মাঠটা আর পার হতে পারে না। ব্রজগোপাল আগ্রহভরে চেয়ে আছেন জানালা দিয়ে। জানতে চাইছেন, রণেন কী বলতে চায়। কিন্তু অত দূর! এত দূর থেকে কী করে বলবে রণেন? কথাগুলিও মনে পড়ে না। কেবল মনে হয়, বড় জরুরি কথা। বড় ভীষণ জরুরি কথা। এ স্বপ্ন থেকে পাশ ফিরতেই সে বড় ভয়াবহ আর একটা দেখল। কী সাংঘাতিক স্পষ্ট, কী বাস্তব দৃশ্য! ব্রজগোপালের মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, শববাহকদের সঙ্গে সেও। নদীর পাড়ে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে নামাল। চুল্লি সাজানো। শববাহকদের মধ্যে একজন বুড়ো লোক একটা নুড়ো জ্বেলে তার হাতে দিয়ে বলল—কেঁদে আর কী হবে বাবা! বৃষ্টি আসছে। মুখাগ্নিটা করে ফেলে। এবং রণেন মুখাগ্নি করল। চিতা ধীরে ধীরে জ্বলে উঠল তলা থেকে। আগুনের শিখাগুলি উঠে আসছে ওপরে। হলুদ সাপের মতো। কী স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সবকিছু। কোথাও এতটুকু অস্পষ্টতা বা রহস্য নেই।
ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ভেঙে উঠে বসেই সে সামনে মাকে দেখতে পায়। দেখে অবাক হয়। এখনও কেন মায়ের হাতে শাঁখা, কেন চওড়া পাড়ের শাড়ি, কেন সিঁদুর? সে হাত বাড়িয়ে মার হাতটা ধরে বলে—মা, গয়ায় গিয়ে পিণ্ডিটা দিয়ে আসতে হবে। ভেবো না। বলে আবার মায়ের দিকে চায়। বড় বেভুল লাগে। স্পষ্টই একটু আগে চিতাটা জ্বলছিল। কোনও ভুল নেই।
