ভয়ে ভয়ে কথা পেড়েছিলেন বীণার কাছে-বউমা, শীলুর একটা সাধ না দিলে কেমন দেখাবে?
—দিন। বীণা সংক্ষেপে উত্তর দিল।
—ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে খুব ভাল সাধ দিয়েছে শুনলাম। সাদা খোলের কেটের শাড়ি দিয়েছে, অনেক সধবা খাইয়েছে।
বীণা এ কথার উত্তর দিল না।
কিন্তু ননীবালা বুঝলেন। তিনি তো অবুঝ নন। ছেলের উপরি বন্ধ, সংসারটা মাইনের ক’টা টাকায় কেবলমাত্র চলে যায়। তার ওপর চিকিৎসার খরচও বড় কম নয়। বাড়িতে খরচ কোথা থেকে আসবে! তবু মনটা খুঁত খুঁত করে। শীলাকে ভালরকম একটা সাধই দেওয়ার কথা। এতকাল পরে সন্তান হচ্ছে, সেও বটে। আবার অন্যদিকটাও দেখার আছে। লুকিয়ে-চুরিয়ে শীলা ননীবালাকে চাটা-কে-টাকা, গুচ্ছের শাড়ি, একজোড়া সোনার বালা, ভাল চটি কত কী দিয়েছে! জামাই বোধ হয় এ-সব খুব একটা পছন্দ করে না, কিন্তু শীলা ঠিক চুপেচাপে নানা জিনিস পাঠিয়ে দেয়। বাড়িতে ভাল ঘি এল কী কোনও খাবার হল, কী বড় মাছের টুকরো এল, সঙ্গে সঙ্গে পাঠায়। এ সবের পালটি দিতে হয়, সে দেওয়ার ক্ষমতা তো ননীবালার নেই তাই সাধের সময় ভাল একটা কিছু দেবেন, ভেবেছিলেন।
হল না।
রণেনের কাছে এ সব কথা তুলতে চান না ননীবালা। ওর বোধ হয় কষ্ট হবে। কাউকে নেমন্তন্ন করে ভাল আয়োজন না করতে পারলে ও বড্ড খুঁত খুঁত করে। তাই বললে হয়তো দাপাবে মনে মনে। মনের কষ্ট বেড়ে যাবে। অথচ সাধের আগের দিনও বীণা তেমন গা করছিল না। জামাই মেয়েকে নেমন্তন্ন করা হয়ে গেছে, অথচ উদ্যোগ আয়োজন নেই। মনে মনে ভয় পেলেন ননীবালা।।
দুপুরে সোমেন বাড়িতে খেতে এল। খাওয়ার পর যখন সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে বসল, তখন ননীবালা তার কাছেই নালিশটা করলেন—কী করি বলো তো, কাল ওরা সব আসবে, অথচ কোনও উদ্যোগ আয়োজন নেই।
ছেলেটা বড্ড রাগী। কোনও কাজ নেই, তাই প্রায় সময়ই সব আবোলতাবোল কী যেন ভাবতে বসে। সে সময় কেউ ডেকে কথা বললে বড় রেগে যায়। তেমনি রাগের ঝাঁঝ দিয়ে বলল—নেমন্তন্ন করতে গেলে কেন? যত সব সেকেলে সংস্কার। সাধ! সাধ আবার কী? ওসব উঠে গেছে।
ননীবালাও রেগে গিয়ে বলেন-কী বলছিস যা তা? এতকাল পর মেয়ে পোয়াতি হল, সাধ দেব না?
—দেবে তো দাও। আমাদের যা রান্না হবে তাই খেয়ে যাবে। সংসারের অবস্থা তো ওরাও জানে।
ননীবালা আহাম্মক ছেলেটির কথা শুনে গায়ের জ্বালা টের পেলেন। বলেন—সংসারের কোনও ব্যাপারেই থাকিস না, এ ভাল নয়। একটা শাড়ি-টাড়ি কিছু না দিলে কেমন দেখায়?
সোমেন বলল—দাদা পারবে না।
—তবে?
সোমেন তখন ননীবালার দিকে চেয়ে খুব ঠান্ডা কিন্তু কঠিন গলায় বলল—তোমার টাকা তো ব্যাঙ্কে পচছে। চেক কেটে দাও, তুলে এনে দিই।
ননীবালা সঙ্গে সঙ্গে মিইয়ে যান। জমি কেনার পরও হাজার সাতেক টাকা পড়ে আছে ব্যাঙ্কে। সকলেরই নজর ওইদিকে। অথচ জমির ভিত পত্তনের জন্য যে টাকা দরকার তার জোগাড় নেই। ওইটুকুই ভরসা।
ননীবালা অসহায়ের মতো বললেন—ও টাকা ভেঙে ফেললে তোদের বাড়ি কোন দিন উঠবে?
—ও টাকাতেও বাড়ি উঠবে না। কেন বাজে কথা বলছ মা? আমাদের বাড়ি-টাড়ি হবে বরং বেশি দামে জমিটা বেচে দিয়ে। আর টাকাটা যক্ষী বুড়ির মতো আগলে বসে থেকো।
কী কথা ছেলের! ননীবালার দু-চোখে জল এল। সংসারে এরকম শাস্তি পেটের শত্রু ছাড়া কে দিতে পারে? কার ওপর রাগ অভিমান করবেন, কার কাছেই বা নিজের নানা সুখ-দুঃখ সাধ আহ্লাদের কথা জানাবেন? শেষ পর্যন্ত বুঝি একটা মানুষ ছাড়া পৃথিবীতে মেয়েদের আর কেউ থাকে না! কিন্তু ননীবালার সেই মানুষটা যদি মানুষের মতো হত।
অসহায়ের মতো ছেলের দিকে চেয়ে রইলেন। কী সুন্দর মুখখানা ছেলের। কাটা কাটা নাক মুখ, দিঘল চোখ, এক ঢল চুল, রোগার ওপর ভারী লক্ষ্মীমন্ত চেহারা। তবু ওর মনটা এত নির্দয় কেন? তবু তো এখনও বিয়ে করিসনি ছেলে, বিয়ে করলে আরও কত পর হয়ে যাবি!
অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন—হাতের পাতের দুটো টাকা। মানুষের কত বিপদ-আপদ আসে। দুর্দিনের জন্য রাখতে হয় না? হুট করে টাকা তুলে আনলেই হল?
সোমেন বিরক্তির সঙ্গে বলে—আর কত বিপদ আসবে? এটাই তো বিপদ। আসলে তুমি এ সংসারের জন্য নিজের টাকা খরচ করতে চাও না। তুমি ভীষণ সেলফিশ।
এই বলে সোমেন জামা-কাপড় পরে বেরিয়ে গেল গনগন করতে করতে। ভয়ে ননীবালা আর উত্তর করলেন না। কিন্তু ছেলেটা বেরিয়ে গেলে একা ঘরে কত কান্না যে কাঁদলেন! ভগবানকে কখনও দেখেননি, তবু ভগবানকে ডেকে কত কথা বললেন মনে মনে। এক সময়ে দেখেন ভগবানের বদলে সেই ব্রজগোপাল বলে মানুষটার মুখ মনের মধ্যে ভাসছে। সঙ্গে সঙ্গে মনটায় যেন রাগ-অভিমানের ঝড় এল। বললেন—তুমি যদি আমার মাথার ওপর থাকতে তা হলে ওরা আমাকে অত কথা বলার সাহস পায়? দেখো, আমাকে কি আঁস্তাকুড়ের বেড়ালছানার মতো ফেলে গেছ তুমি। পুরুষমানুষ হয়ে তোমার লজ্জা করে না?
এমনি সব কথা। কথার পর কথা। গভীর মেঘের স্তর যেমন বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে আর শেষ হতে চায় না, তেমনি, এত বছর ধরে শুধু রাগ আর অভিমান মনের মধ্যে স্তরের পর স্তর জমে থেকেছে। তাই অনেক সময় লাগল ননীবালার সামলাতে।
কালকে সাধ। একটা কিছু করতেই হয়। নইলে ছেলেদের কী, জামাই-মেয়ের সামনে তিনিই লজ্জায় বেরোতে পারবেন না। আবার শুধু সাধই তো নয়, প্রথম বাচ্চা হওয়ার সময়ে মেয়েদের বাপের বাড়ি থাকার কথা। খরচপত্রও বাপের বাড়ির কিন্তু সে কথা কার কাছে তুলবে ননীবালা?
