ননীবালা বললেন—কার পিণ্ডি দিবি? কী বলছিস, ও রণো?
জাগ্রত রণেন তখন মার দিকে চেয়ে থেকে ভুলটা বুঝতে পারল। স্বপ্ন! অত স্পষ্ট স্বপ্ন কেউ দেখে? অত নিখুঁত? সে চারধারে চেয়ে দেখল, না এ তো স্বপ্ন নয়। এই তো সে জেগে আছে!
হঠাৎ দু-হাতে মুখ চাপা দিল রণেন। ননীবালা উঠে গিয়ে পাখাটা আরও বাড়িয়ে দিলেন।
রণেন জিজ্ঞেস সরল—বাবা কেমন আছে মা?
—কেমন আছে কী করে বলি! কতকাল তো আসে না।
—চিঠিপত্র পাওনি ইদানীং?
—কই! সে চিঠিপত্র দেওয়ার মানুষ কিনা।
রণেন বিছানা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে নেমে আসতে আসতে বলল—আমি বাবার কাছে যাব।
এমনভাবে বলল যেমন দু-বছরের ছেলে বায়না করে বলে।
—যাবি কি! আসবেখন সে নিজেই।
—না। মাথা নাড়ল রণেন। ঠোঁট কেঁপে গেল থরথর করে কান্নায় বিকৃত গলায় বলল—বাবা মরে গেছে মা। আমি এই মাত্র স্বপ্ন দেখলাম।
ননীবালা বড় চমকে গেলেন। স্বপ্ন! স্বপ্ন কী ফ্যালনা নাকি! কত কী হয়! ব্যগ্র হয়ে বললেন—কী দেখলি?
—ওঃ! বলে প্রকাণ্ড আন্ডারপ্যান্ট পরা চেহারাটা নিয়ে সামনে দাঁড়াল রণেন। দু-হাতে কচলে চোখ মুছতে মুছতে বলল—আমি বাবার কাছে যাব। আমার সঙ্গে চলো মা।
সেই থেকে বুক কাঁপছে ননীবালার। সংসারে আর কত অশান্তি বাকি আছে, তার খেই পান না। জন্মাবার পর থেকেই বুঝি তাঁর হেন মেয়েমানুষের তপ্ত কড়াইতে বাস করা শুরু হয়। এ-ধারে পাশ ফিরলেও ছ্যাঁক, ও-ধারে পাশ ফিরলেও ছ্যাঁক।
বলেকয়ে রণেনকে শান্ত করলেন বটে। রাতটা কাটল ভয়ে-ভাবনায়, দুশ্চিন্তায় পরদিন সাধের রান্না বাঁধতে রাঁধতে অন্তত তিনবার উঠে গিয়ে ট্রাংকুইলাইজার খেলেন। সঙ্গে একখানা অ্যাডোলফেন বড়ি। প্রেশারটা বেড়েছে বোধ হয়।
রণেনও সারাদিন অস্থির। কেবলই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ‘ওঃ হোঃ হোঃ’ বলে চিৎকার করে। পায়চারি করতে করতে হঠাৎ থেমে বলে ‘বাবা’! একবার ননীবালা শুনলেন রণেন ঘরে বসে ‘মধুবাতা ঋতায়তে…’ মন্ত্র বলছে। এত চমকে গিয়েছিলেন ননীবালা যে সেই সময়েই তাঁর স্ট্রোক হয়ে যেতে পারত। মাথাটা ঘুরে, বুক অস্থির করে, পেটে একটা গোঁতলান দিয়ে শরীরটা যেন হাতের বাইরে চলে গেল। একটু সময় দেয়ালে ঠেস দিয়ে সামলে গেলেন।
রণেন ঘুরে ঘুরে রান্নাঘরের দরজায় এসে মাকে দেখে যায়। চোখ দুটো করুণ ছলছলে।
শীলা ওরাও ব্যাপারটা আঁচ করছিল বোধ হয়। শীলা একবার চুপি চুপি এসে জিজ্ঞেস করল—দাদা আজ ওরকম করছে কেন মা?
ননীবালা মাথা নেড়ে বলেন—ওরকমই করে তো।
—আজ যেন বেশি অস্থির।
সব কথা পেটের মেয়েকেই কি বলা যায়? বিয়ের পর ও তো একটু পর হয়েও গেছে। কত কথাই চেপে রাখতে হয় ননীবালাকে। এই কথা চেপে চেপেই বুঝি একদিন দমবন্ধ হয়ে মারা যাবেন।
বললেন—শাড়িটা দেখেছিস?
—বউমা এনেছে। দাম-টাম জিজ্ঞেস করিনি। দেখাল, একবার দেখলাম।
শীলা একটু হেসে বলে—তুমি যা ভাবছ তা নয়। ওই শাড়ির কিন্তু অনেক দাম। বউদি কম দামি জিনিস আনেনি। গড়িয়াহাটায় সেদিন একটা দাম করেছিলাম, একশো কুড়ি টাকা চাইল।
মনটা হঠাৎ তখন ঠান্ডা হল ননীবালার। মেয়েটার মুখের দিকে চাইলেন, উঁচু পেটটা হাঁটুতে একটু চেপে বসেছে। মুখটায় শ্রীহীন কর্কশ ভাব, কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে আছে। ঠোঁট শুকনো। ননীবালা নিরীক্ষণ করে বললেন—তোর তো ছেলে হবে।
—বলছ?
—বলছি। ও আমরা বুঝতে পারি।
ভালমন্দে সাধের দিনটা কেটে যেতেই রাতে তিনি বীণাকে ডেকে বললেন—বউমা, রণেনটা বড় অস্থির।।
—শুনেছি। কেবল বাবার কথা বলছেন।
—কী করবে? ননীবালা জিজ্ঞেস করলেন।
—আমি তো যেতে পারব না, বাচ্চাদের ইস্কুল। বরং আপনি ওঁকে নিয়ে যান, বাবার কাছ থেকে ঘুরে আসুন। বেড়ানোও হবে। আর ওখানে এক ফকির সাহেব আছেন শুনেছি, ওষুধ দেন।
সেই ঠিক হল। তারপরই মায়ে-পোয়ে চলে এসেছেন।
এসে ফাঁকা ঘর দেখে বুকটা সেই থেকে হু-হু খরার বাতাসে জ্বলে যাচ্ছে যেন।
ঘরের কী শ্রী! মাচানের বিছানাটা দেখলেই তো কান্না পায়। গুটিয়ে রাখা তোশকটা ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে তুলোর চাপড়া বেরিয়ে আছে। মশারিটা কয়েক জায়গায় সেফটিপিন আটকানো, ননীবালার চোখ ছল ছল করে।
রামভক্ত হনুমানের মতো জোড়হাতে সামনে দাড়িয়ে বহেরু কেবল—মাঠান, মাঠান, করে যাচ্ছে। তারদিকে বড় বড় চোখে চেয়ে ননীবালা একবার বললেন—বহেরু, তুই বড় পাপী। বামুন মানুষটাকে এইভাবে রেখেছিস!
বহুকাল পরে যেন ননীবালার বুকের মধ্যে মায়া-মমতা মাথা-তোলা দিল।
বহেরু মাটিতে বসে পড়ে দুর্বল গলায় বলে—ওনারে আমি রাখব! কি বলেন। কারও কড়ি ধারেন নাকি! বরং উনিই আমাদের রেখেছেন।
থাকবেন, না ফিরে যাবেন তাই নিয়ে মুশকিলে পড়েছিলেন ননীবালা। কিন্তু বুকের মধ্যে কু-পাখি ডাকছে। তাই দোনামোনা করে থেকে গেলেন। বহেরুর লোকজন সব ভেঙে এল সেবা-যত্ন করতে। ঘরদোর সাফ করা হল নতুন করে, একটু সাজানো হল। তার ফাঁকে কাকে বহেরু বলছিল—কাউবে ঘকে ঢুকতে দেন না। জিনিসপত্র কেউ ধরলে ভারী চটে যান।
ননীবালা শোনেন। মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে অবোলা ভয় শ্বাসযন্ত্রকে চেপে ধরে—লোকটা বেঁচে আছে তো! ফিরবে তো!
এই করেই কেটেছে অসহ্য দিনটা। কাটতে কি চায়! মনে মনে কত মানত, কত ঠাকুরদেবতার কাছে প্রার্থনা করেছেন ননীবালা।
৫০. মাটির উঠানে সাদা রোদ
॥ পঞ্চাশ ॥
মাটির উঠানে সাদা রোদ পড়ে আছে। ধান সেদ্ধ করার জোড়া উনুন, বড় মেটে হাঁড়ি কয়েকটা। ঝিঙে মাচানে ফুলের যুদ্ধু লেগে গেছে। ভিতরের ঝুঁঝকো আঁধারে উঁকি দিলে দেখা যায় সুঠাম শিশুরা ফুল ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে।
