মধুমিতা মাথা নেড়ে বলে—না, লোকজনের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে ইচ্ছে করে। আমার অনেক পেন-ফ্রেন্ড আছে, আবার অনেক টেলিফোন ফ্রেন্ডও আছে। টেলিফোন গাইড খুঁজে যে নামটা ভাল লাগে তাকে ফোন করি। এভাবে আমার অনেক বন্ধু জুটে গেছে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বয়সে আমার অনেক বড়। কিন্তু তারা ঠিক ফ্রেন্ডশিপ রাখে। মাঝে মাঝে ফোন করে। অনেকে বাড়িতে আসে, প্রেজেন্টেশন বা বোকে দিয়ে যায়।
—তোমার তো এমনিতেই অনেক বন্ধু।
—আমি আরও বন্ধু চাই। অনেক বন্ধু। করবেন তো ফোন?
বলে হাসল মধুমিতা।
—করব।
মধুমিতা খুব খুশি হল। হঠাৎ একটা হাত বাড়িয়ে সোমেনের পড়ে-থাকা হাতটা চেপে ধরে বলল—কমরেড।।
হাতটা ছাড়ল না। নিবিড় আঙুলগুলি জড়িয়ে ধরে রইল। সামনের ড্রাইভার নিবিষ্ট হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। কেউ দেখছে না। তবু একটু শিউরে উঠল সোমেন।
মধুমিতা যুবতী নয়। এখন কৈশোরকাল। শরীরের চেতনাগুলি এখনও লাজুক থাকে। মনে থাকে ভয় ও কুণ্ঠা। এখনকার মেয়েরা কিছু বেশি প্রগলভ। তবু প্রথম চেনায় এতটা করে না। মধুমিতার যে ভয় বা লজ্জা নেই তা বুঝি ওই অসুখের জন্য। এখন ওর লজ্জা করার মতো সময় নেই। এখন ওকে তাড়াতাড়ি সম্পর্ক তৈরি করে নিতে হয়। কিংবা এও হতে পারে যে, স্বভাব পুরুষের মতো, মেয়েদের স্বাভাবিক লজ্জাবোধ ওর নেই।
আঙুলগুলি, হাতের উষ্ণ প্রসারটি সোমেন টের পেল না। তার মনে হল, হাতটা বড় শীতল। মৃত্যুর হিম লেগে আছে। সেই শীতলতা গ্রাস করে নিচ্ছে শরীর। শৈলীমাসির ঘরে যেমনটা হয়েছিল এখনও সেরকমটা হচ্ছিল তার। যেন মধুমিতার শরীর থেকে মৃত্যুর জীবাণু সংক্রামিত হচ্ছে তার স্বাসের বাতাসে। এগিয়ে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে। অধিকার করে নিচ্ছে তাকে। সে একটা অস্ফুট শ্বাসকষ্টজনিত শব্দ করল। বলল—জানালাটা খুলে দিই?
মধুমিতা বলল—ওমা! বৃষ্টি আসবে না!
তাই তো! অঝোর বৃষ্টি, সামনের উইন্ডস্ক্রিনে ক্রমান্বয়ে পাক খেয়ে খেয়ে জলস্রোত মুছে ফেলতে পারছে না ওয়াইপার। কাচের ভিতর দিয়ে এক ভঙ্গুর, বিমূর্ত শিল্পের মতো শহরকে দেখা যায়। তবু জানালাটা খোলা দরকার। কিছু পরিষ্কার বাতাসের একটু স্বাস বড় প্রয়োজন সোমেনের।
—আপনি খুব ঘামছেন। এই বলে মধুমিতা খুট করে সুইচ টিপতেই একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের খেলনা ফ্যান বোঁ বোঁ করে ঘুরে বাতাস দিতে লাগল। ও মুখখানা আবার সোমেনের দিকে ঘুরিয়ে চেয়ে থেকে বলল—অপরাজিতা বড্ড গুডি-গুডি। পৃথিবীর কোনও খবর রাখে না।
সোমেন একটু হাসে। উত্তর দেয় না।
মধুমিতা ফের বলে—আমি কিন্তু ওরকমই নই। আই লিভ আপ টু দি টুয়েন্টিয়েথ, সেঞ্চুরি। অপরাজিতার সঙ্গে আমার মেলে না। খুব ঝগড়া হয়। আবার ভাবও হয়ে যায়।
সেই পুরুষালি স্বভাবের ডঁটিয়াল মেয়েটি আর নেই। গাড়ির সিটে পা তুলে বসেছে এখন। তেলচোখে খুঁটে খুঁটে দেখছে সোমেনকে। আবছা আলোয় এই প্রথম ওর চোখে একটু মেয়েমানুষি কটাক্ষ দেখতে পেল সোমেন। তার অস্বস্তি হচ্ছিল।
মধুমিতা হাতটা সরিয়ে নিল হঠাৎ। হাঁটু দুটো দুহাতে জড়িয়ে ধরল বুকের সঙ্গে। ওই ভাবেই একটু দোল খেল।
সামনের দিকে চেয়ে বলল—আপনি কি এনগেজড?
সোমেন প্রথমটায় বুঝতে পারেনি। বলল—কী বলছ?
—আপনার কি কেউ আছে?
সোমেন এই প্রশ্নে হাসল। ভয়ও পেল। তার বয়স মাত্র চব্বিশ পূর্ণ হয়েছে। পঁচিশে পা। সদ্য যুবা পুরুষ। তবু মনে হয় তাদের যৌবনকালকে নস্যাৎ করে পরবর্তী যুবক-যুবতীরা দ্রুত জমি দখল করে নিয়েছে। মাঝখানে একটা যোগাযোগহীন শূন্যতা জেনারেশন গ্যাপ। তারা কখনও এত অল্প পরিচয়ে কাউকে এই প্রশ্ন এত অকপটে করতে পারেনি।
সোমেন মিথ্যে করে বলল—ন্নাঃ কেন?
—একটা কথা বলব? রাগ করবেন না?
—কী কথা?
—প্লিজ, রাগ করবেন না।
—না।
হাতটা আবার নরম বিসর্পিল আঙুলে চেপে ধরল মধুমিতা। নিবিড় উষ্ণ আঙুল, হাতের তেলোয় জ্বরাক্রান্তের তাপ। মৃত্যুর হিম আর নেই।
বলল—আই লাভ ইউ।
॥ উনপঞ্চাশ ॥
সেদিন শীলাকে সাধ দিলেন ননীবালা। সাধটুকু দিতেই কত না কষ্ট হল।
এখন এ সংসারে আর তেমন স্বচ্ছলতা নেই। রণেনের মনটা বড় ভাল, কোনও উদ্যোগ আয়োজন হলেই রাশিকৃত টাকা খরচ করে বাজার আনবে, জিনিস আনবে, হইচই করে হাট বাঁধিয়ে ফেলবে বাসায়। রান্নাঘরের চৌকাঠের ওপর উবু হয়ে বসে সবকিছু চাখবে। পালেপার্বণে বা নেমন্তন্নে যেদিন বাসায় ভালমন্দ হয় সেদিন ননীবালাকেই তাগাদা দেবে রণেন—ও মা, আজ তুমি হাতা-খুন্তি ধরো। তুমি হাতা ছুঁলেই রান্নার স্বাদ পালটে যায়।
রাঁধতে ননীবালার তেমন কষ্ট হয় না। প্রেশারটা বাড়লে একটু অসুবিধে হয়। ট্যাবলেট আর ট্রাংকুইলাইজার খেয়ে রাঁধতে বসেন গিয়ে। কিন্তু আজকাল সে সুখও গেছে। রণেনের অসুখটা হওয়ার পর থেকেই নেমন্তন্নের পাট গেল উঠে। রণেন আর মাকে রাঁধতে বলে না, কারণ রণেনও আর খাবারের স্বাদ পায় না। কোথায় যে ওর মনটা পড়ে দাপাচ্ছে তা কে জানে! ননীবালা জানেন না।
তবে এ নেমন্তন্নটা করতেই হয়। ছোট মেয়ে ইলারও ছেলে হল কিছুকাল আগে। ওরা মুম্বইতে থাকে বলে সাধ দিতে পারেননি, কেবল শতখানেক টাকা পাঠিয়েছিলেন একটা শাড়ি কেনার জন্য। বড় মেয়ের তো হবেই না ধরে নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত হচ্ছে। ভেবেছিলেন, খুর ঘটা করে সাধ দেবেন। রণোর এ-রকম না হলে দিতেনও।
