বলে যেন এক অসহায় তীব্র রাগে সোমেনের দিকে চেয়ে রইল। দাঁতে ঠোঁট টিপে বলল—কতবার মাথা এক্সরে করেছে ডাক্তাররা, রোগ পরীক্ষা করেছে। রোগ ধরতে পারে না। সামনের মাসে ভেলোরে যাচ্ছি।
—কেন?
তেমনি এক অসহায় রাগে, এবং বুঝি একটু অভিমানে বলল—ডাক্তাররা সন্দেহ করছে, ব্রেনে টিউমার, অপারেশন হবে। ভেলোরে ছাড়া ওসব অপারেশন হয় না।
বলে একটু হাসল। বড় করুণ হাসিটি। ওই গোল চশমা, ছটফটে ভাব, স্মার্ট পোশাক সব ভেদ করে একটা ব্যথা-বেদনা ফুটে উঠল। বলল-শক্ত অপারেশন। বাঁচে না। আজকাল মা আর বাপি আমাকে খুব আদর করে জানেন! বাঁচব না তো!
সোমেনের মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। এক পরদা মেঘ ঢেকে দিল মনটাকে। বলল— কে বলল বাঁচবে না? এটা বিজ্ঞানের যুগ, অত সহজে লোকে মরে না।
সান্ত্বনাটুকুর কোনও দরকার মধুমিতার নেই, এ-ওরদিকে চেয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এ বয়সে মৃত্যুর ভয় বড় একটা থাকে না, ‘মরে যাব’ একথা ভাবতে একরকমের রোমহর্ষময় রহস্য জেগে ওঠে। সকলের করুণা, চোখের জল, শোক—এই সব পেতে ইচ্ছে করে, চারদিকের ওপর ঘনিয়ে ওঠে অভিমান। সোমেন জানে।
—এখন কে বেশি সেন্টিমেন্টাল শুনি। বলে রিখিয়া সোমেনের দিকে তাকায়—সব বোগাস, জানেন। আমারও কত মাথা ধরে।
মধুমিতা কারও কথারই উত্তর দিল না। গোল চশমার ভিতর দিয়ে চেয়ে রইল ক্যারামবোর্ডে সাজানো ঘুটিগুলোর দিকে। ঠোঁটে থমকানো হাসি লেগে আছে।
হঠাৎ সম্বিৎ পেয়ে রিখিয়ার দিকে চেয়ে বলল—অপরাজিতা, আমি বাড়িতে একটা ফোন করব।
—আয়।
—এক মিনিট। আসছি। বলে একটা চাউনি সোমেনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। মধুমিতা।
আরও জোর বাতাস এল। চারধারে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, লোহার বিম, কাচের শার্শি সব ভেঙে পড়ছে বৃষ্টিতে, কলকাতার সাজগোজ ধুয়ে গেল। অজ পাড়াগাঁর মতো অসহায়ভাবে কলকাতা ভিজছে।
একাকী সিঁড়ির মুখে দাড়িয়ে আছে রিখিয়া। দেখছে, মধুমিতা নিয়ে গেল সোমেনকে।
মধুমিতা সোমেনকে নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক এইভাবেই কি দৃশ্যটা দেখল রিখিয়া? সোমেন তা জানে না। তবু আর একবার টেলিপ্যাথি পাঠাল—আমি তো নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছি না, তুমি তো জানো।
সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে একবার ঘাড় ঘোরাল সোমেন। রিখিয়া তাকিয়ে আছে। কী করুণ চোখ! অন্ধ কুকুরটা ওর গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে, মুখটা ওপরে তোলা কি যেন গভীরভাবে বুঝবার চেষ্টা করছে, একটা গোঙানির শব্দ করল।
দেখে পা ফেলেনি সোমেন। শেষ ধাপে পা’টা ঘুরে পড়ল। আচমকা একটা ঝাঁকুনি খেল সোমেন।
তক্ষুনি হেসে ফেলল রিখিয়া, বলল—বেশ হয়েছে।
সোমেন ঠোঁট উলটে একটা অগ্রাহ্যের ভঙ্গি করে। একটু হাসে।
রিখিয়া রেলিং থেকে ঝুঁকে বলে—আপনার ফটোগুলো নিয়ে গেলেন না?
সোমেন ফটোগুলো ইচ্ছে করে নেয়নি, সব শোধবোধ হয়ে যাওয়া কি ভাল? কিছু থাক। তাই হেসে বলল—আর একদিন নিয়ে যাব।
—ফটোগুলো ভাল হয়নি, না? তাই নিলেন না। রিখিয়ার যে কতরকম কমপ্লেকস, মুখখানায় ফের অন্ধকার ঘনিয়ে এল।
সোমেন সিঁড়ির গোড়া থেকে মুখ তুলে বলে—ভাল হয়নি, কে বলল? আমি যেমন, ঠিক তেমনি হয়েছে। আবার আসব তো, তখন নিয়ে যাব।
রিখিয়া একটু হাসল, অন্ধকার মুখে সেই হাসিটুকু জোনাকির মতো একটু আলো ছড়িয়ে দিল।
ওই হাসিটুকু বুকের মধ্যে পদ্মপত্রে জলবৎ টলটল করছিল।
খোলা গেট দিয়ে মধুমিতার ছোট্ট গাড়িখানা ব্যাক করে এল গাড়িবারান্দার তলায়। বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে গেছে গাড়িটা। হেডলাইটের আলোয় অজস্র কাজের নলের মতো বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে দেখা যায়, পিছনের দরজাটা ভিতর থেকেই খুলে দিল ড্রাইভার। একদৌড়ে মধুমিতা ঢুকে গেল, পিছনে সোমেন।
মধুমিতা তার চশমার কাচ কামিজের কোনা দিয়ে মুছতে মুছতে বলল—এ গাড়িটা বাপি আমাকে অলমোস্ট দিয়ে দিয়েছে। যেখানে খুশি যাই, কেউ কিছু বলে না। কেন জানেন? ওই অসুখটার জন্য। অসুখবিসুখ হলে খুব ইম্পর্ট্যান্স পাওয়া যায়।
বলে হাসল, কয়েকটা গোল চাকতির মততা, আর গোটা দুই ছোট পাশবালিশের মতো গদি পড়েছিল সিটের ওপর। তার দুটো সোমেনের কোলের ওপর ফেলে দিয়ে মধুমিতা বলল—রিল্যাক্স প্লিজ। সিগারেটও খেতে পারেন।
মধুমিতা দুটো বালিশ তলপেটে চেপে ধরে কুঁজো হয়ে বসল। মুখখানা হাতের তেলোয় রেখে পাশ ফিরিয়ে চেয়ে রইল সোমেনের মুখের দিকে। গাড়ির ভিতরে অন্ধকার, কাজ বন্ধ বলে ভ্যাপসা গরম। কাচের গায়ে ভাপ লেগে আবছা। সেই আবছা কাচ দিয়ে বাইরে একটা ভূতুড়ে শহরের অস্পষ্ট আলো-আঁধার দেখা যায়।
সোমেন বালিশ দুটো ফেলে রেখে কনুইয়ের ভর দিয়ে বসল। যথেষ্ট আরামপ্রদ গাড়ি, গভীর বসবার গদি। তবু আবার বালিশের কী দরকার তা বোঝা মুশকিল। বড়লোকদের কত বায়নাক্কা থাকে। গাড়ির পিছনের আর সামনের কাছে ছোট ছোট পুতুল সুতোয় বাঁধা হয়ে ঝুলছে। টেডিবিয়ার, মিকিমাউস, জাপানি মহিলা, ব্যালেরিনা।
—এইমাত্র বাপিকে ফোন করলাম তো! মধুমিতা বলল—বাপি একটুও রাগ করল না, খুব অ্যাংশাস। অসুখ না হলে কিন্তু দেরি হওয়ার জন্য রাগ করত।
—তোমার অসুখ কবে থেকে?
—একবছর, আগে অল্প অল্প মাথা ধরত। পরে সেটা খুব বেড়ে গেল।
—ব্রেন টিউমার, ঠিক বলছ?
—কী জানি! ওসব থাক। আপনি আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করবেন?
সোমেন অবাক হয়ে বলে—কেন, কোনও দরকার আছে?
