সোমেনের কিছু করুণার উদ্রেক হয়েছিল। বলল—কী অসুখ শৈলীমাসি?
—সে বলার নয়। মেয়েমানুষ হচ্ছে রোগের আধার। যখন বিয়ের সময় হবে তখন খুব দেখে বুঝে বিয়ে করো। বাঙালি মেয়েরা বড্ড রোগা রোগা। বলে নিজের ঠাট্টায় একটু হাসলেন। বললেন—অসুখ কখন হয় জানো। যখন মনের মধ্যে অসুখের ভাবটা আসে তখনই শরীরে অসুখ ভর করে। মনটা পরিষ্কার থাকলে, অসুখের ভাবনা না ভাবলে বড় একটা অসুখ হয় না। আমি সারাদিন রোগের ভাবনা ভেবে রোগ ডেকে এনেছি। এই শরীরটুকুর ওপর পাঁচবার ছুরি কাঁচি চালিয়েছে। কতক রোগ ধরা পড়েছে, কতক পড়েনি। আমি ভুগি সেই সব আর্নট্রেইসেবল ডিজিজে। রোগবন্দি। মেয়েমানুষ খাড়া না থাকলে সংসার ভেসে যায়। আমারটাও গেছে।
সোমেন কথা খুঁজে পায় না। উৎসারিত ওই বেদনা তাকে স্পর্শ করে না ঠিকই, কিন্ত অপ্রতিভ করে দেয়। হয়তো দু-চারটে সাত্ত্বনার কথা আছে যা খুঁজে পায় না সে। নিস্তব্ধ ঘরে সে যেন অস্পষট টের পায় শৈলীমাসির অস্তিত্ব থেকে বায়ুবাহী বিষন্নতার জীবাণুরা তার দিকে এগিয়ে আসছে। ছেকে ধরেছে তাকে। একটা শ্বাসরোধকারী প্রতিক্রিয়া হতে থাকে তার মধ্যে। এইরকম অবিরল বিছানায় পড়ে থাকা কী ভয়ংকর, কী মারাত্মক, যখন বাইরে অসীম আকাশের প্রসার, শহর-বন্দর-মাঠ-ঘাটে বিস্তৃত জীবন, তখন এ কেমন কয়েদ? শৈলীমাসির অস্তিত্ব যেন তাকে অস্থির করে তোলে।
উনি বললেন—ছেলেটার রাশ ধরতে পারলাম না, রোগা মাকে ছেড়ে পালিয়ে গেল। রোগের বাড়িতে আর ফিরে আসবে না। আর মেয়েটা এ লোনলি চায়ল্ড, ছেলেবেলা থেকে সঙ্গীসাথী নেই, মা রোগে পড়ে থাকে, বাবা ব্যস্ত। বড় একা। আপনমনে বড় হয়েছে মেয়েটা। কঁদত না, কাঁদলে কে থামাবে। হাসতও না তেমন, হাসবার মতো কিছু তো দেখত না। তাই মেলাংকলিক, অভিমানী। একটু বড় হয়ে যখন স্কুলে যায় তখনও ওর একাচোরা স্বভাব। তাই কারও সঙ্গে সহজে মিশতে পারত না। আজও ওর তেমন কোনও বন্ধু নেই। তাই আপনমনে ক্যামেরায় ছবি তোলে, গান গায়, গাড়ি চালানো শেখে, কিন্তু লোনলি, অসম্ভব একা। আমি তো মা, তাই বুঝি!
সোমেন মাথা নাড়ল। হঠাৎ বলল—আপনাল ইংরেজি উচ্চারণগুলি কী সুন্দর। কোথায় শিখলেন?
মুখের বিষন্নতা, লেবুর রস ফেললে যেমন গরম দুধ ছানা কেটে যায়, তেমনি কেটে গেল। হাসলেন, বললেন—বগুড়ায় ইংরেজি মিডিয়ামে বাড়িতে পড়তাম। বাড়িতে মেমসাহেব রেখে শিখিয়েছিলেন বাবা। তার কাছে শিখেছি। এখনকার সব ইংলিশ মিডিয়ামে যেমন নামকোবাস্তে ইংরেজি শেখায় তখন তেমন ছিল না। খাঁটি সাহেব মেমসাহেবরা খাঁটি ইংরেজি শেখাত।
শৈলীমাসির এই তৃপ্তিটুকু থাকতে থাকতেই সোমেন বেরিয়ে আসতে পারল সেদিন। রিখিয়া এসে ডাকল। পাশের আর একটা ঘরে রিখিয়ার মুখোমুখি বসে অনেক খেল সোমেন। রিখিয়া একটু গম্ভীর। সোমেনও তেমন কথা বলতে পারল না। যখন উঠল তখন মনে এক হর্ষ ও বিষাদ।
পরদার ওপাশে মধুমিতা বসে আছে এখনও। ও ঘরে পা দেওয়ার আগে রিখিয়া বলল—আবার আসবেন।
ঘরে পা দিতেই হাতের পত্রিকাটা ফেলে উঠে দাঁড়াল মূর্তিমতী উইমেনস লিব। মধুমিতা ঘড়ি দেখে বলল—দ্যাট ওয়াজ ওয়েটিং ফর গোডো।
॥ আটচল্লিশ ॥
বাইরে মেঘধ্বনি। পরদাটা ওড়ে হঠাৎ হাওয়ায়। উড়ে আসে খড়কুটো, ধুলো, গাছের পাতা, বোগেনভেলিয়ার পাপড়ি, বাতাসে ঠান্ডা জলগন্ধ। বৃষ্টির প্রথম একটা দুটি ফোঁটা গাছের পাতায় পড়ে। একটা আহত নীল বাঘ ঝাপিয়ে পড়ে মাটিতে, তীব্র গর্জনে কেঁপে ওঠে ঘরের মেঝে।
নীল আলোটা ঝলসাতেই কানে আঙুল দিয়েছিল রিখিয়া। চোখে ভয়।
মধুমিতার ভয় নেই। ব্যাগ খুলে সে মাথা ধরার বড়ির স্ট্রিপ থেকে একটা বড়ি ছিঁড়ে নিল। শুকনো বড়িটা মুখে ফেলে গিলে ফেলল। জল ছাড়াই। ভ্রূটা একটু কেঁচকানো।
বৃষ্টি এল। রিখিয়া কান থেকে হাত নামিয়ে বলে। মুখে একটু হাসি। সোমেনের দিকেই চেয়েছিল, বলল—যাওয়া হবে না।
মধুমিতার নিশ্চয়ই মাথা ধরার রোগ আছে। ডান হাতের বুড়ো আর মাঝের আঙুলে কপালের দুধার টিপে ধরে থেকে বলল-বৃষ্টি তো কী?
—কেমন ঝোড়ো বাতাস! রিখিয়া কুণ্ঠিতভাবে বলে।
জানালা দরজা তাড়াতাড়ি বন্ধ করছে চাকরেরা। দুর্যোগের আভাস পেয়ে কোথা থেকে কুকুরটা একবার ডাকল, সঙ্গে শেকলের ঠুন ঠুন শব্দ। আজ কুকুরটাকে বেঁধে রেখেছে। খর বৃষ্টির শব্দ উঠল চারধারে, ভাষাহীন কোলাহল। হামাল বাতাস বন্ধ কপাট নাড়া দিচ্ছে মুহুর্মুহু। আকাশের নীল বাঘেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে মাটিতে।
মধুমিতা ঠোঁটটা একটু রাগের ভঙ্গিতে টিপে বলল—ব্রিজের নীচে ঠিক জল জমে যাবে। গাড়ি আটকে গেলে মুশকিল।
বলে সোমেনের দিকে তাকাল, কোমরে হাত রেখে একটু তেরছা চেয়ে বলল—আপনার জন্যই তো। যা দেরি করালেন!
সোমেন সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল—তোমার খুব মাথা ধরে?
মধুমিতা একটু অসহায়ের মতো বলল—খুব। যখন শুরু হয় তখন পাগল পাগল হয়ে যাই ব্যথায়। মুঠো মুঠো ট্যাবলেট খেতে হয়।
—তাই দেখছি। জল ছাড়া ট্যাবলেট খাও কী করে?
—সব সময়ে খাই তো, অভ্যেস হয়ে গেছে। রাস্তায় ঘাটে হরঘড়ি জল তো পাওয়া যায় না।
—এত ট্যাবলেট খাওয়া ভাল নয়।
মধুমিতা ধৈর্যহীন গলায় বলে—সবাই ওকথা বলে। কিন্তু ট্যাবলেট ছাড়া ব্যথা কী করে সারে তা কেউ বলতে পারে না। ডাক্তাররাও বলে—ট্যাবলেট খেয়ো না।
