আশ্চর্য এই রিখিয়াকে সেই তরঙ্গ স্পর্শ করল বোধ হয়। টেলিপ্যাথির বার্তা পৌঁছল নাকি!
রিখিয়া মধুমিতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে তার অভিমানী মুখখানা তুলে সোমেনকে বলল—মাকে দেখে গেলেন না তো? মা কত আপনার কথা বলে!
এই তো! এরকমই কিছু শুনতে চাইছিল সোমেন। মধুমিতার কাছ থেকে তাকে কেড়ে রেখে দিক রিখিয়া। মধুমিতার হাতের দড়ি ঢিলে হয়ে গেল, রিখিয়া টানছে।
সোমেন গম্ভীর মুখে বলল—ওঃ তাই তো। একদম ভুলে গিয়েছিলাম।।
বলে একটু অসহায় মুখ করে তাকাল মধুমিতার দিকে।
মধুমিতা তার কবজির ঘড়িটা দেখল, মুখটায় সামান্য বিরক্তির ভাব করে বলল—আই ক্যান গিভ ইউ টেন মিনিটস।
রিখিয়া হঠাৎ ঝামরে উঠে বলে—তোর তাড়া থাকলে তুই যা না। ও পরে যাবে।
ও! সোমেনের হঠাৎ আন্তরিকভাবে লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, ‘ও’ সর্বনামটি বোধ হয় সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। বিদ্যুৎবাহী।
মধুমিতা আর একবার কাঁধ ঝাঁকাল। সোফায় আবার ধপ করে বসে পড়ে বলল—না, আমি সোমেনবাবুর জন্য ওয়েট করব। বলে সোমেনের দিকে চেয়ে আর একবার চোখ ঠারল, মধুমিতা চাপা হাসি হেসে বলল—ডোন্ট মেক মি ওয়েট ফর এভার দেখা করে আসুন। একসঙ্গে যাব।
শৈলীমাসির ঘরের পরদাটা পার হয়েই রিখিয়া চাপা রাগের গলায় বলল—ভীষণ পুরুষচাটা মেয়ে। একদম পাত্তা দেবেন না।
সোমেনের হৃদয়ের স্তব্ধতার ভিতরে যেন এইমাত্র বোঁটা খসে একটা ফুল এসে পড়ল। সোমেন তার হৃদয়ের মধ্যেই কুড়িয়ে নিল সেই ফুল, সুঘ্রাণে ভরে গেল ভিতরটা।
বলল—পাত্তা! না, না, তাই কি হয়……
আসলে কথা হারিয়ে যাচ্ছিল সোমেনের। কত মেয়ের সঙ্গে কত অনায়াসে মিশেছে সোমেন, তবু এই একটা মেয়ের কাছে এখন কথা হারিয়ে যাচ্ছিল।
শৈলীমাসি বই রেখে আধশোয়া হলেন। পিঠের নীচে বালিশের ঠেকনো দিয়ে দিল রিখিয়া। তারপর খাটের মাথার দিকে চুপ করে দাঁড়িয়ে একটু করুণ চোখে চেয়ে রইল। সোমেনের দিকে। ভারী অন্যরকম লাগছিল ওকে। বড়লোকের মেয়ে দামি ক্যামেরায় ছবি তোলে, গাড়ি চালায়, কত কী করে, তবু যেন ও সে নয়। যেন বা দুর্বল, সহানুভূতি পেতে ও ভালবাসে, কেউ ওকে দেখে ‘আহা’ বললে বুঝি খুশি হয়।
শৈলীমাসি উঠে বসে বললেন—ও ঘরে ক্যারম খেলা হচ্ছিল। খবর পেয়েছি। তখন থেকে অপেক্ষা করে আছি। ননীর ছেলে কখন এ ঘরে আসবে, দুটো কথা বলে বাঁচব। এতক্ষণে এলে?
সোমেনের বড় লজ্জা করছিল, আর একটু হলেই সে চলে যাচ্ছিল মধুমিতার সঙ্গে। শৈলীমাসির অপেক্ষা শেষ হত না।
চওড়া জানালাগুলো আজ খোলা রয়েছে। এয়ারকুলার বন্ধ। শৈলীমাসি বাইরের আবছা অন্ধকারে একটু গুলঞ্চ গাছের ডালপালার দিকে চেয়ে থেকে বললেন—মানুষের সঙ্গে যে কত কথা বলতে ইচ্ছে করে! যেতে তো পারি না, তাই যে দু-চারজন আসে তাদের সঙ্গে সাধ মিটিয়ে বলে নিই, তুমি কিন্তু বড় মুখচোরা ছেলে, একটুও কথা বলো না। তোমাদের কত কথা জানতে ইচ্ছে করে।
সোমেন তার স্বভাবসিদ্ধ সুন্দর হাসিটা হাসে। উত্তর দেয় না। শৈলীমাসির মাথার পিছনে রিখিয়া দাঁড়িয়া আছে। দেখছে।
শৈলীমাসি মুখ না ফিরিয়েই বোধ হয় টের পেলেন যে রিখিয়া তাঁর মাথার পিছনে দাঁড়িয়ে। তাই মাথাটা পিছনে একটু হেলিয়ে হাতটা একবার পিছনপানে বাড়িয়ে বললেন—এই মেয়েটা আমার, এও কথা বলার সময় পায় না আজকাল।
রিখিয়া বলল—উঃ, রোজ কত কথা বলি।
শৈলীমাসি স্নিগ্ধ হেসে মুখ ফিরিয়ে মেয়েকে দেখলেন। সোমেনের দিকে চেয়ে বললেন—আগে ওর যত কথা ছিল আমার সঙ্গে। কোনও কথা গোপন করত না। সব বলত, বন্ধুবান্ধবদের কথা, স্কুলের কথা, পাড়ার দুষ্ট ছেলেদের কথাও। সব বলে দিত।
—এখন বুঝি বলি না। রিখিয়া চাপা গলায় বলে।
—কম বলিস। বলে শৈলীমাসি গেলাস তুলে একঢোক জল খেলেন। সোমেনকে বললেন—তোমার সম্বন্ধে কি বলেছে জানো?
রিখিয়া হঠাৎ বিড়বিড়িয়ে উঠে বলে—উঃ মাঃ বোলো না, বোলো না। তুমি ভীষণ খারাপ।
বলেই পিছন থেকে হাত চাপা দিল মায়ের মুখে। শৈলীমাসি হাতটা আস্তে করে সরিয়ে দিয়ে স্মিতমুখে বলেন—বলব না। সোমেনের দিকে চেয়ে বললেন—তুমি বাবা, শুনতে চেয়ো না। ও লজ্জা পায়।
সোমেন তটস্থ হয়ে বলে—নিন্দে নয় তো!
রিখিয়া বলে—নিন্দে তো নিন্দে।
—না, নিন্দে নয়। শৈলীমাসি বলেন—ওকে খেতে দিয়েছিস রিখি?
—না।
—দে।
সোমেন আপত্তি করে বলে—না, কিছু খাব না, রোজই খেতে হবে নাকি!
—একটু খাও। বলেন শৈলীমাসি। বড় সুন্দর শান্তস্বরে বলেন। স্বরটা মিনতিতে ভরা। আবার বলান—তুমি খাওয়ার ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে, না?
সোমেন হেসে বলে—একটু।
—তাই শরীরটা সারেনি। খাওয়ায় খুঁতখুঁতে হলে শরীর ভাল হয় না। আমার ছেলেটারও ওরকম ছিল। কালো মাছ খাবে না, আঁশ ছাড়া মাছ খাবে না, সবজি খাবে না, খাসির মাংস খাবে না, নেমন্তন্ন বাড়িতে গেলে ভারী মুশকিল ছিল ওকে নিয়ে। রোগা, রাগী আর অহংকারী ছিল খুব। তা এখন শুনি বিদেশে সব খায়।
বলতে বলতে একটা কান্নার মেঘ করে এল বুঝি ভিতরে। সেটা চাপা দেওয়ার জন্যই বললেন—বগুড়া স্টেশনের কাছে মুটে মজুররা কদমগাছের তলায় বসে ছাতু মেখে খেত। একটা প্রকাণ্ড ছাতুর দলা পেতলের কানা-উঁচু থালায়, শালপাতায় একটু চাটনি, ঘটিভর জল। কী তৃপ্তি করে যে খেত কাঁচা লঙ্কার কামড় দিয়ে। সেই সস্তাগণ্ডার দিনেও ওই সব খেত, আমরা দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখতুম। সেই খাওয়া দেখার মধ্যেই একটা ভীষণ সুখ ছিল। একবার একটা সাঁওতালকে দেখেছিলুম জুতোর বাক্সের ঢাকনায় একটা মাঝারি বড় আলুসেদ্ধ তেল ছাড়া কেবল নুন আর মরিচ দিয়ে খুব যত্ন করে মাখছে, পাশে জুতোর বাক্সে একবাক্স ভাত। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলুম সেই সাঁওতালটা ওই অনেক ভাত একটুখানি আলুসেদ্ধর টাকনা দিয়ে টাউ টাউ করে খেয়ে নিল। ঠান্ডা জল খেল পুকুর থেকে। ব্যস তৃপ্তি। ফের কাজে লেগে গেল। কী স্বাস্থ্য! আমরা গরিবের দুঃখের কথা ভেবে কত চেঁচামেচি করি বাবা, কিন্তু সে সব বুঝি মনগড়া কথা! ও খাওয়া দেখলেই বোঝা যায় কী সতেজ সুখী মানুষ সব। নিজেদের দুঃখের ধারণা ওদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে দুঃখী ভাবলে কী হবে, আমাদের চেয়ে ঢের সুখী ওরা। বলে আবার একটু চুপ করে থাকেন শৈলীমাসি, ফের বলেন—আমি চাকর দারোয়ানদের মাঝে মাঝে সামনে বসে খেতে বলি, দেখব। তা তারা সব আমার সামনে লজ্জা পায়, ভাল করে খায় না। খুব ইচ্ছে করে রাস্তায় ঘাটে, স্টেশনে ঘুরে ঘুরে ওই সব মুটে মজুরদের খাওয়া দেখি। কত তুচ্ছ জিনিস কী যত্ন করে খায়। ফেলে না, ছড়ায় না, শেষ দানাটি পর্যন্ত খুঁটে খায়। কিন্তু যেতে তো পারি না। জেলখানায় আটকে আছি।
