—যা।
—ক’টা বাজল, সাতটা? আটটায় আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। কবজির ঘড়িটা কানে তুলে একটু শব্দ শুনল মধুমিতা। আবার তাকাল সোমেনের দিকে। এবার চোখটা অন্য রকম। একটু যেন মেপে দেখল সোমেনকে। চোখে কোনও মায়া-মোহ বা রহস্য নেই। কেমন যেন পুরুষমানুষের মতো তাকায় মেয়েটা। বেশ লম্বা, অথচ নরম-সরম চেহারা। মুখে তেলতেলে একরকমের পেইন্ট, কপালে টিপ নেই, কানে দুল বা গলায় হার নেই, দুহাতে শুধু দুগাছা গালার চুড়ি, ডান হাতে ঘড়িটা। সব মিলিয়ে মেয়েটা নিজের অস্তিত্বকে চারধারে ছড়িয়ে দিয়েছে। রিখিয়াকে ওর পাশে অনেক লাজুক, ম্লান আর ছোট্ট লাগে।
মেয়েটা আর একটা হাই বাঁ-হাতের তিনটে আঙুলে চাপা দিল। চমৎকার আঙুল। নখগুলোর পালিশ ঝিকিয়ে উঠল। হাইটা চেপে দিয়ে বলল—আপনি কোথায় থাকেন?
সোমেন খানিকটা অবহেলার ভাব করে বলে—ঢাকুরিয়া।
মধুমিতা বলল—আমি যোধপুরে, আপনাকে একটা লিফট দিতে পারি। যাবেন। রিখিয়া ভ্রূ কুঁচকে অ্যালবামের দিকে চেয়ে আছে, সেখানে সোমেনের আবছা ছবি।
মধুমিতা উঠে বলল—আপনার রেড অ্যালার্জিটা সারানো দরকার।
সোমেন হেসে বলল—আমার অ্যালার্জিটা পলিটিক্যাল নয়।
—নয়? বলে একটু অবাক হওয়ার ভাব করল মধুমিতা। তারপরই হাসল। এই প্রথম ওর হাসি দেখল সোমেন। কি পরিষ্কার দাঁত, কেমন ভরপুর হাসি। তবু হাসিটাও ঠিক মেয়েমানুষের মতো নয়। পুরুষঘেঁষা। বলল—আপনার কালার কী?
সোমেন চোখটা সরিয়ে নিয়ে তার নিজস্ব ভুবনজয়ী হাসিটা হেসে বলল—হোয়াইট, এ কালার অফ সারেন্ডার।
॥ সাতচল্লিশ ॥
—সারেন্ডার! শুনে চোখ দুখানা ফের গোল করে একবার রিখিয়ার দিকে তাকাল, তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল আবার সোমেনের মুখে। যেন কিছু একটা টের পেল এই মাত্র, সোমেন আর রিখিয়ার মধ্যবর্তী শূন্যতায়।
বোগেনভেলিয়ার লালচে পাপড়িগুলি অবিরল ঝরে পড়ছে নীচের চাতালে, একটা ইউক্যালিপটাসের চারাগাছ উঁকি মারছে জানালা দিয়ে, সারা গায়ের বাকল খসছে। রিখিয়াদের ছোট্ট বাগানের এই সব দৃশ্য একটু দেখল সোমেন।
মধুমিতা ম্যাগাজিনের একটা গোছা হাতে তুলে নিয়ে বলল—আপনি খুব সহজেই সারেন্ডার করেন, না?
সোমেন মুখ ফেরাল। রিখিয়া সেই রকমভাবেই মাথা নত করে বসে। কোলে খোলা অ্যালবাম। সোমেন মুখ টিপে হেসে বলল—করি।
মধুমিতা অখুশি হল বোধ হয় কথাটা শুনে। বলল—মোটেই ভাল নয় ওরকম। চলুন।
সোমেন রিখিয়ার নতমুখের দিকে চেয়ে একটু হালকা গলায় বলে—হবে নাকি আর এক গেম?
রিখিয়া মুখ না তুলেই মাথা নাড়ল। খেলবে না।
একটু ইতস্তত করে সোমেন। এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার জন্য সে আসেনি। কিন্তু রিখিয়া থাকতে না বললে থাকে কী করে?
মধুমিতা ঘাড়টা একবার তুলেই ছেড়ে দিয়ে বলল—ক্যারাম আবার একটা খেলা। খুটখাট গুটি ফেলা দুচোক্ষে দেখতে পারি না। খেলা হল বাস্কেট।
একটা চাপা ঝগড়া পাকিয়ে উঠছে, সোমেন বাতাসে বারুদের গন্ধ পায়।
রিখিয়া মুখ তুলল। চোখে তীব্র চাউনি। বলল—আহা, ক্যারাম খেলা নয়, না। তোর তো সব ছেলেদের খেলা ভাল লাগে।
—লাগেই তো! অ্যাটাক, কাউন্টার অ্যাটাক আর অ্যাগ্রেসিভনেস না থাকলে আবার খেলা কী! আই লাইক ম্যাসকুলিন গেমস।
রিখিয়া রেগে গিয়েছিল, কিন্তু তেমন স্মার্ট কথাবার্তা বোধ হয় ওর আসে না, রিফ্লেক্স কিছু কম, কেবল বলল—হ্যাঁ তোকে বলেছে!
মধুমিতা তার পাম্প-শু-র মতো দেখতে জুতোর একপাটি খুলে বোধ হয় একটা কাঁকর ঝেড়ে ফেলল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল—আমি সোমেনবাবুকে নিয়ে যাচ্ছি। ফর কম্প্যানি।
এটা জিজ্ঞাসা নয়, সিদ্ধান্ত। সোমেন অসহায়ভাবে একবার রিখিয়ার দিকে তাকাল। ও কি একবারও মুখ ফুটে সোমেনকে আর একটু থাকতে বলবে না! না বললে, সোমেন তেমন নির্লজ্জ নয় যে থাকবে।
মধুমিতা তার গোলগাল চশমার ভিতর দিয়ে গোল চোখ করে চেয়ে আছে। মুখখানাও গোল। সোমেন টেনশন টের পেল। তাকে নিয়ে একটু দড়ি টানাটানি চলছে। দড়িটা টেনেই নিয়েছে মধুমিতা। সোমেন ঘাড় নেড়ে বলে—চলুন।
বলে রিখিয়ার দিকে একপলক চাইল সোমেন, চাপা গলায় বলল—আজ তা হলে যাই রিখিয়া।
রিখিয়া উত্তর দিল না।
মধুমিতা বলল—অপরাজিতা ভীষণ সেন্টিমেন্টাল। একটুতেই ওর গাল ভারী হয়। ইস্কুলে সবাই ওকে তাই খ্যাপাই।
বলে হাসল মধুমিতা। চোখ ঠারল সোমেনকে। অর্থাৎ ইচ্ছে করে রিখিয়াকে রাগাতে চায়। চোখ ঠেরে সোমেনের সঙ্গে একটা সন্ধি করে নিল।
সোমেন একটু হাসল বটে, কিন্তু এ খেলায় সে নেই। ওই নতমুখী, একটু আনস্মার্ট মেয়েটিকে কেউ খ্যাপায় এটা সে চায় না। ইস্কুলে ওর বন্ধুরা ওকে খ্যাপায় জেনে মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। কেন, ওরা রিখিয়াকে খ্যাপাবে কেন?
মধুমিতা দাঁতে ঠোঁট কামড়ে বলল—একটুতেই কেঁদে ফেলে অপরাজিতা। গতবার ডিবেটে ওর উলটোদিকের ডিবেটারদের মধ্যে কে যেন বলেছিল অপরাজিতা একটা ভুল কোটেশন দিয়েছে। সেটাকে ও পারসোনাল অ্যাটাক মনে করে…বলে মধুমিতা কোমরে হাত দিয়ে মুখ ছাদের দিকে তুলে ঠিক পুরুষ ছেলের মতো হাসল, তারপর মুখে হাতচাপা দিয়ে বলল—কেঁদে ভাসিয়েছিল।
বিপদের গন্ধ পাচ্ছিল সোমেন। মধুমিতা নিশ্চয়ই খুব শক্ত প্রতিপক্ষ, বোধ হয় ভাল ডিবেট করে, রিখিয়াকে ইচ্ছা করলেই ও নাস্তানাবুদ করতে পারে। রিখিয়া পলকা মেয়ে। যদি রেগে যায় তা হলে হয়তো এখন এমন কিছু বলে ফেলবে যা মেয়েমানুষি রাগে ভরা। হয়তো নিতান্তই ছেলেমানুষি কিছু বলে ফেলতে পারে। তা হলে মধুমিতা ওকে আরও অপমান করবে। তাই মনে মনে সোমেন টেলিপ্যাথি পাঠাতে লাগল রিখিয়াকে—রেগো না রিখিয়া, মাথা স্থির রাখো। দোহাই প্লিজ, আমার সামনে যেন ও তোমাকে অপমান না করতে পারে। ওকে সুযোগ দিয়ো না।
