অবাক হয়ে সোমেন বলে-কেন?
মেয়েটা তার গোলপানা মুখটায় বিরক্তি ঘেন্নার ভাব ফুটিয়ে যেন বাতাসের গন্ধ শুঁকে বলল—স্টিনকস উইথ ব্যাড পলিটিকস। আপনি রি-অ্যাকশনারি।
সোমেন অবাক হয়ে মেয়েটাকে দেখছিল। উত্তর দেবে কি দেবে না, তা ঠিক করতে পারছিল না। অতটুকু মেয়ে!
রিখিয়া তার ডান হাতটা ঝাড়ছিল, আঙুলগুলো টেনে ঠিকঠাক করে নিচ্ছিল রেড ফেলার আগে। সোমেনের দিকে একপলক তাকিয়ে বলল—মধুমিতা না ভীষণ লেফটিস্ট, জানেন! ও কিছুদিন আন্ডারগ্রাউন্ডেও ছিল। অ্যাকশনও করেছে।
সোমেন মাথাটা ঝাঁকিয়ে বলে—ওঃ! আজকাল সবাই দেখছি পলিটিক্স করলেই আন্ডারগ্রাউন্ডে যায়। আন্ডারগ্রাউন্ডে কী আছে?
মেয়েটা হাতের ম্যাগাজিনটা সপাট করে টেবিলে রেখে স্প্রিংয়ের গদিতে উঠে বসে। শরীরটা উত্তেজনায় দোল খায়! বুকের ওপর থেকে বেণীটা পিঠের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে— মোটেই আমি আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলাম না, অপরাজিতা। সবাই জানে সে সময়ে আমি বাপির সঙ্গে জয়পুরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ইটস এ স্টিংকিং লাই।
সোমেন বুঝল, মেয়েটা স্টিংক কথাটা ব্যবহার করতে ভালবাসে। ও বোধ হয় ওর চারদিকে একটা পচা পৃথিবীর দুর্গন্ধ পায় সব সময়ে। এতক্ষণ মেয়েটার গোলপানা মুখ আর আদুরি চেহারার মধ্যে তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ তার ফরসা মুখে রাগের একটা আগুনে রং যখন ফুটে উঠে, দুটো ভ্রূ যখন দুটি নিক্ষিপ্ত তীরের মতো মুখোমুখি পরস্পরকে চুম্বন করে আছে, কপালের মাঝখানে যখন রাজটিকার মতো একটি শিরা জেগে উঠেছে তখনই তার অদ্ভুত ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যটা ফুটে উঠল। মেয়েটা যে ঠিক ওর চেহারার মতোই নয়, তা চেহারা পালটে ফেলে বুঝতে দিল। সোমেন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক পলক বেশি চেয়ে রইল সে।
তখন রিখিয়া হঠাৎ গম্ভীর মুখে স্ট্রাইকারটা বোর্ডে রেখে বলে ওঠে—’রেড’ ফেলছি কিন্তু।
সোমেন চোখ সরিয়ে এনে বলে—ওঃ হ্যাঁ!
রিখিয়া গম্ভীর মুখেই বলে—ডবল ফাইন হলে কী হবে?
সোমেন বলে—দুটো সাদা গুটি উঠবে, আর রেড।
ফের স্ট্রাইকার থেকে হাত সরিয়ে রিখিয়া বলে—মোটেই না।
—তবে?
—একটা সাদা গুটি, আর রেড।
—সোমেন মাথা নাড়ে—উঁহু, দুটো সাদা আর রেড।
রিখিয়া কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলে—ইস, বললেই হল! এই মধুমিতা, তুই বল তো! রেড আর স্ট্রাইকার পড়লে….
মধুমিতা আবার শুয়ে পড়েছে, একটা হাঁটুর ওপর অন্য পা নির্লজ্জভাবে তোলা, মাথার নীচে একটা হাত, অন্য হাতে ম্যাগাজিন। ম্যাগাজিনের আড়াল থেকেই বলল—জানি না। ক্যারম নিয়ে কে মাথা ঘামায়!
ঘরে আর কেউ নেই। রিখিয়া আর কার কাছে নালিশ করবে! নীচের ঠোঁট দাঁতে চেপে সে অসহায়ভাবে সোমেনের দিকেই তাকাল। সোমেন মৃদ্যু হেসে বলল—আচ্ছা আচ্ছা। একটা সাদা, আর রেড।
রিখিয়া হাসল না, খুশিও হল না। থমথমে মুখ। স্ট্রাইকারটা ফের সরিয়ে দিয়ে বলে— আগে কেন বললেন না!
বলেই হঠাৎ মধুমিতার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে—তুই বুঝি অ্যাকশন করিসনি! স্কুলের ক্লাসরুমে মাও সে-তুঙের টেনসিলের ছাপ দিয়েছিল কে?
মধুমিতা একবার অবহেলাভরে তাকিয়ে বলে—তাতে কি! ওটা বুঝি অ্যাকশন! তা হলে ক্যারম খেলাটাও অ্যাকশন। ফুঃ!
রিখিয়া চুপ করে থাকে একটুক্ষণ। সোমেন অপেক্ষা করে। রিখিয়া কী ভেবে হঠাৎ নিচু হয়ে স্ট্রাইকারটা বসিয়ে পাকা ফলের মতো পকেটের মুখে ঝুলে থাকা রেডকে ফেলার জন্য টোকা দিল। সোমেন অবাক হয়ে দেখল, রিখিয়া ঠিক ডবল ফাইন করেছে। পটপট করে রেড আর স্ট্রাইকার চলে গেল পকেটে।
দুঃখিত সোমেন রিখিয়ার দিকে তাকাল না। রেড আর সাদা গুটি তুলে চমৎকার একটা চাপ সাজিয়ে দিল রিখিয়াকে। স্ট্রাইকার এগিয়ে দেওয়ার সময়ে সন্তর্পণে চেয়ে দেখল, রিখিয়া হাতের পিঠে চোখের জল মুছছে।
—এই, কী হল?
—আমি খেলব না। রিখিয়া মাথা নেড়ে বলে।
—কেন?
রিখিয়া রাগ আর ফেঁপানির গলায় বলে—আপনি ডবল ফাইনের কথা বললেন কেন?
বলে রিখিয়া স্ট্রাইকার ছুঁড়ে ফেলে দিল।
সোমেন মাথা নাড়ল আপনমনে। খেলা নয়, এ তো খেলা নয়। হেরে গেছ? কে বলে ও-কথা? বিজয়িনী, তুমি বিজয়িনী। এখনও তোমার বয়স কম। ছোট্ট খুকি, নইলে এক্ষুনি আমি কী যে করতাম!
ছোট্ট সোপায় গিয়ে বসল রিখিয়া। ক্যারম খেলার আগে সে অ্যালবাম থেকে সোমেনকে ছবি দেখিয়েছিল সেইটা আবার খুলে বসল গম্ভীরভাবে।
পকেট থেকে গুটিগুলো তুলে টুকটাক করে সাজাচ্ছিল সোমেন। আড়চোখে রিখিয়া একবার চেয়ে দেখল। পৃথিবী থেকে মেয়েমানুষ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, দুঃখ করে বলেছিল ম্যাক্স। কই? এই তো শতকরা একশো ভাগ একটা মেয়ে। ভীষণ মেয়ে। মেয়েমানুষ ছাড়া আর কিছু নয়। ভাবতে ভাবতে সোমেন একটু হাসে।
রিখিয়া ছবি দেখছে। সোমেনের ছবি। একটা অন্ধ কুকুরের পিছনে চোখ বুজে হাঁটছে সোমেন, যুধিষ্ঠিরের মতো। কিংবা রাগী মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে রিখিয়া একটু হাসল। মুখ তুলে বলল—বোকা।
ছবিগুলো একটু আবছা হয়ে গেছে। ঠিকমতো ফোকাস করার সময় পায়নি। এর আগের. দিন যখন এসেছিল তখনই আবার পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে রেখেছিল। সেদিনই ক্যারমে উনত্রিশ-কুড়ি পয়েন্টে গেম খেয়েছিল সোমেন। প্রথমবার হারতে হয়।
ম্যাগাজিনটা ফেলে উঠে বসল মধুমিতা। চশমাটা বেঁকে গিয়েছিল, সোজা করে বসাল নাকে। আধুনিক ফ্যাশনের চশমা, চোখে এঁটে থাকে না, একটু নেমে আসে নাকের ওপর। শেয়াল-পণ্ডিতের মতো দেখায়। ঢিলা কামিজের তলায় বিদ্রোহী দুটি কিশোরী স্তন, কামিজটা টান হওয়ার পর ফুটে উঠল। কপালের চুল সরিয়ে মধুমিতা গম্ভীর মুখে একটু চাইল সোমেনের দিকে। দৃষ্টিতে তাচ্ছিল্য। একটা হাই তুলে বলল—অপরাজিতা, ম্যাগাজিনগুলো আমি নিয়ে যাচ্ছি।
