মাকে বলল—মা, চললাম। বউদিকে বলল, বউদি, আসি। দাদার কাছ থেকেও বিদায় নিল। বাচ্চাদের কাছ থেকেও।
সোমেন ওকে খানিক দূরে এগিয়ে দেবে বলে সঙ্গে চলল। রাস্তায় নেমেই ম্যাক্স ছেঁড়া স্যামসন জুতোজোড়া পা থেকে খুলে সোমেনকে দেখিয়ে বলল—হোপলেস। বলে ফুটপাথে ছুঁড়ে ফেলে দিল।।
সোমেন বলল—আমার বাড়তি একজোড়া আছে, পরে যাও।।
ম্যাক্স মাথা নাড়ল, নো। এই ভাল, ভারতবর্ষের সঙ্গে এই শেষ ক’টা দিন আর্থ কন্ট্যাক্টে থাকি। ইয়োরস ইজ এ গুড কান্ট্রি।
সোমেন ভারতবর্ষ কী তা জানে না। শুনেছে, এ-এক মহান দেশ, সে- এক সমৃদ্ধ সভ্যতার উত্তরাধিকারী। কিন্তু সোমেনের কোনও ধারণা নেই, সে কিছু বোধ করে না। তবু ম্যাক্স যখন ওই কথা বলল তখন তার বুকের মধ্যে এক ঘুমিয়ে থাকা দেশপ্রেম যেন আধো জেগে উঠে একটু অস্পষ্ট কথা বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
সোমেন বলল—কোথায় যাবে?
খালি পায়ে বেলা দশটার তড়পানো রোদে পিচের ওপর হাঁটতে হাঁটতে ম্যাক্স একটু অন্যমনস্কভাবে বলে, কলকাতায় যখন প্রথম এলাম সোমেন, তখন এখানে ভিখিরি আর অভাগাদের দেখে আমি পাগল হয়ে যাই। প্রথম কয়েক মাস আমি লেখাপড়া করতে পারিনি; আমি খুব অবাক হয়ে যাই দেখে যে, এইরকম জঘন্য যেখানকার সামাজিক অবস্থা, সেখানে যুবক-যুবতীরা প্রেম করে বেড়ায়, সিনেমা দেখে, সাজপোশাক করে। বড়লোকেরা নির্বিকারভাবে বিদেশি গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ায়। আর কেউ কেউ দেশের অবস্থায় দুঃখিত হয়ে চায়ের দোকানে বসে মাথা গরম করা তর্ক করে। ওই অবস্থায় আমি পাগলের মতো খুঁজে বেড়াতাম, একজনও ভারতীয় আছে কি না যে সক্রিয়ভাবে দেশের জন্য কিছু ভাবছে বা করছে। অনেক খুঁজে আমি একজনকে পেয়েছিলাম। সত্যিকারের একজন ভারতীয় এবং দেশপ্রেমিক। মাদার টেরেসা। আমি আজকাল তোমাদের জন্মান্তরে বিশ্বাস করি সোমেন। আমার মনে হয় মাদার টেরেসাই হচ্ছেন মেরি ম্যাকডেলিন, আর আমরা যত হতভাগা আছি সবাই তাঁর খ্রিস্ট। আমি তক্ষুনি তাঁর দলে ভিড়ে যাই। সে সময়ে আমি তার জন্য কিছু টাকা তুলেছিলাম, আর কিছু নিজের স্কলারশিপ থেকে জমিয়েছিলাম। মাদারের সঙ্গে কাজ করতে করতে আমার কিছুদিন পরে মনে হয়েছিল, সমস্যার উৎসমুখ খুলে রাখা আছে। তুমি যতই করো, অভাব বা দ্রারিদ্র ঘুচবার নয়, তখন সশস্ত্র বিপ্লবের কথা ভাবতাম। আই জয়েনড নক্সালাইটস। টাকাগুলো আর মাদারের হাতে দেওয়া হয়নি। আজকের দিনটা তাই মাদার টেরেসার জন্য টাকা তুলব।
—কীভাবে?
ম্যাক্স মৃদু হেসে বলে, ভিক্ষে করব। আমার অভ্যাস আছে। তা ছাড়া খারাপও লাগে না। আমি যতবার ভিক্ষে করেছি সব সময়েই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভারতবর্ষে ভিক্ষে করায় বাধা নেই। মস্ত সুবিধা। যখন তোমার কিছু থাকে না, ইউ মে অলওয়েজ বেগ। ভিক্ষের কোনও শেষ নেই এখানে। তা ছাড়া মাদার টেরেসাকে আমি ঠকাতে চাই না। তাকে দেখলেই মহত্বের কথা মনে হয়, চোখে জল আসে। আর মানুষ নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে মহৎ কিছুর জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে।
ব্রিজের গোড়া পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিল সোমেন। ম্যাক্স বাসে উঠল না। খালি পায়ে ব্রিজের চড়াই ভাঙতে ভাঙতে মুখ ফিরিয়ে একটু হেসে বলল—আজ বড় ভাল দিন। না?
রেলিঙের ধার ঘেঁষে উঠে যাচ্ছিল ম্যাক্স। নীল আকাশের গায়ে ওর মাথা। সোনালি বড় বড় চুল হাওয়ায় উড়ছে। সোমেন সেদিকে চেয়ে দাঁড়িয়েছিল একটুক্ষণ, হঠাৎ আবেগে চোখে জল আসে৷ গলা রুদ্ধ হয়ে যায়। সে নিজে ভারতবর্ষের জন্য কিছু করেনি।
রিখিয়ার জন্য ‘রেড’টা পকেটের মুখে রেখে দিল সোমেন। ফেলল না। স্ট্রাইকার ভুল জায়গায় লেগে ঘুরে চলে গেল অন্যদিকে।
রিখিয়া নিবিষ্ট মনোযোগে চেয়েছিল গুটিটার দিকে। সোমেন পারল না দেখে মুখ তুলে বলল—ইস, পারলেন না! বলে একটু হাসল।
সোমেন মাথা নাড়ল দুঃখিতভাবে। স্ট্রাইকার এগিয়ে দিয়ে দেখল রিখিয়ার মুখখানা। ও কি এখনও বালিকা! লাল গুটিটার জন্য কি শিশুর মতো লোভ ওর! বয়সকালের আগুনগুলি এখনও জ্বলে ওঠেনি ওর ভিতরে! শৈশবের তুষ ঢেকে রেখেছে সেই তাপে। বড় ছেলেমানুষ। পকেটের মুখে আলগা হয়ে বসে আছে গুটিটা, রিখিয়ার দিকে চেয়ে হাসছে, টোকা লাগলেই পড়ে যাবে।
রিখিয়া স্ট্রাইকার বসিয়ে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য স্থির করে।
সোমেন গম্ভীরভাবে বলল—দেখো, ডবল ফাইন কোরো না।
রিখিয়া টোকা দেওয়ার মুহূর্তে থেমে মুখ তুলল। ভ্রূ কোঁচকাল। স্ট্রাইকারটা সরিয়ে দিয়ে বলল—খেলব না আপনার সঙ্গে।
—কেন, কী হল?
—ডবল ফাইনের কথা বললেন কেন? এখন ঠিক আমার ডবল ফাইন হবে।
এই বলে গম্ভীর রিখিয়া নিজের হাতের নোখ দেখতে লাগল। মুখখানা কান্নার আগেকার গাম্ভীর্যে মাখা।
সোমেন খুব শান্ত গলায় বলে—হলেই বা কি! যখনই হোক রেডটা তুমি ঠিক ফেলতে পারবে।
রিখিয়া সতেজ গলায় বলে—আমার জন্য ‘রেড’ বসে থাকবে, না? আর একটা চান্স পেলেই তো আপনি ফেলে দেবেন।
সোমেন মাথা নেড়ে বলল—কোনওদিন পারিনি। আমার রেড অ্যালার্জি আছে, নার্ভাস হয়ে পড়ি।
লম্বা সোফার ওপর একটা মেয়ে শুয়ে এতক্ষণ জুনিয়র স্টেটসম্যান, ফেমিনা, ফিলম ফেয়ার আর ইলাস্ট্রেটেড উইকলি একগাদা নিয়ে ডুবেছিল। সে সোমেনকে ফিরেও দেখেনি এতক্ষণ। বোঝা যায়, ও বড় ঘরের মেয়ে। ফরসা আদুরি-আদুরি চেহারা, চোখে বিশাল ফ্রেমের চশমা, পরনে বেলবটম আর কামিজ, রিখিয়ারই বয়সি৷ ওর বন্ধুটন্ধু কেউ হবে। এবার সে মুখের সামনে থেকে পত্রিকাটা সরিয়ে বলল—অবজেকশনেবল। রেড অ্যালার্জি কথাটা ভীষণ অবজেকশনেবল।।
