ননীবালার জপ সারতে একটু সময় লাগে। জপ করতে করতেই সংসারের নানান শব্দের দিকে কান রাখেন। রাখতে হয়। আজও শব্দ পেলেন। মানুষটা এসেছে। জপ তাই জমল না। সময়টা পার করে দিয়ে উঠেই প্রথমে ছোট ছেলেটাকে ঠেলে তুলে দিলেন—ওঠ, ওঠ, তোদের বাপ এসেছে।
সোমেন উঠল। বসে টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট দেশলাই আর অ্যাশট্রে সরিয়ে চৌকির তলায় ঠেলে দিতে দিতে বলল—এ ঘরে উঁকি দেননি তো?
ননীবালা লক্ষ করে বলেন—দিলেই কী! বয়সের ছেলে, বিড়িটা সিগারেটটা তো খাবেই! এতে লজ্জার কী! বাসি বিছানাটা বরং তুলে ফেলো তাড়াতাড়ি, বেলা পর্যন্ত ঘুমনো উনি পছন্দ করেন না।
এইটুকু বলে ননীবালা এ ঘরে এলেন। মুখটুখ ধুয়ে রণেন এসে আবার বাপের কাছে বসেছে। খুবই ঘনিষ্ঠ ভঙ্গি। ব্রজগোপালের চোখমুখের ভাব কিছু দৃঢ়, কঠিন। একটু চাপা, তীব্র স্বরে বলছেন, বলো, আমি অক্রোধী, আমি অমানী, আমি নিরলস, কাম-লোভ-জিৎ বশী, আমি ইষ্টপ্রাণ, সেবাপটু, অতি-বৃদ্ধি-যাজন-জৈত্র পরমানন্দ, উদ্দীপ্ত শক্তি-সংবৃদ্ধ, তোমারই সন্তান, প্রেমপৃষ্ট, চিরচেতন, অজর, অমর, আমার গ্রহণ করো, আমার প্রণাম হও।
রণেন বলল। ব্রজগোপাল আবার বললেন। আবার রণেন বলল, ব্রজগোপাল ছেলের দিকে তীব্র চোখ চেয়ে বলেন—কথাগুলো মনের মধ্যে গেঁথে নাও। রোজ সকালে নিজেকেই নিজে বলবে। সারাদিন বলবে। বলতে বলতে ওর একটা পলি পড়ে যাবে মনের ওপর। বুঝেছ?
রণেন মাথা নাড়ল। বুঝেছে।
ননীবালা স্বামীর দিকে চেয়েছিলেন। সেই পাগল। চোখে চোখ পড়তেই বললেন-ওটা শেখাচ্ছ ওকে?
ব্রজগোপাল স্ত্রীর দিকে চেয়ে একটু যেন সামলে গেলেন। দীপ্তিটা চোখ থেকে নিবে গেল। বললেন—ও হচ্ছে অটো সাজেশান। স্বতঃ অনুজ্ঞা। যখন মানুষের কেউ থাকে না তখন এই অনুভা থাকে। এই চালিয়ে নেয় মানুষকে।
ননীবালা শ্বাস ফেলে বলেন—ওর কে নেই? আমরা ওকে বুক বুক করে রাখি।
ব্রজগোপাল একলহমায় উত্তর দিলেন না। একটু ভেবেচিন্তে বললেন—আছে। সবাই আছে।
—তবে?
—তবু কেউ নেই।
কথাটা ঠিক বুঝলেন না ননীবালা। তবু ইঙ্গিতটা ধরে নিলেন। এই সকালে ঝগড়া করতে ইচ্ছে যায় না। নইলে ক’টা কথা মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে এখন। বলা যেত। বলা যে যায় না তার আরও কারণ আছে। জমিটা কিনেও অনেক টাকা বেঁচে গেছে ননীবালার। বাড়ির ভিতটা উঠে যাবে। বাথরুম থেকে ঘুরে এসে ননীবালা অবাক হয়ে দেখেন, সাড়াশব্দে কখন নিঃশব্দে উঠে এসেছে সাহেব ছেলেটা। কোনও সংকোচ নেই, বেশ ব্রজগোপালের পাশটিতে বসেছে। ব্রজগোপাল তাকে অটো সাজেশান শেখাচ্ছেন।
বাণীর সঙ্গে ননীবালার একটা জায়গায় বড় মিল। ননীবালা জানেন যে এ হচ্ছে পাগলের বংশ। বংশের ধাত অনুযায়ী কম-বেশি পাগলামি এদের সবার। স্বামীর দিকে চেয়ে থেকে তার এই কথাটা আজ আমার মনে হল।
মাঝরাতেই ঠিক পলকা ঘুম ভেঙে যায় ব্রজগোপালের। ঝিঁঝি ডাকছে। চোরের পায়ের মতো হালকা পায়ে কে হেঁটে যায়, ব্রজগোপাল জানেন, শেয়াল। ঘুম ভাঙলেই মনের বিষণ্ণতা টের পান। ঘুমের মধ্যে কার একটা শ্বাস যেন মুখে এসে লেগেছিল। কেউ নয়। ঘুমের মধ্যে কত কী মনে হয়।
তাঁতি লোকটা আজকাল তাঁতঘরে জায়গা নিয়েছে। এখন এ-ঘরে বহেরু শোয়। ঘরে শোয়া কোনওকালে অভ্যাস নেই বহেরুর। শীতকালটা ছাড়া। বড় ভয়ে ধরেছে আজকাল ওকে। কেবলই বলে—কত পাপ করেছি, কতজনার কত সর্বনাশ! কে এসে ঘুমের মধ্যে কুপিয়ে রেখে যায়, কী নলিটা কুচ করে কেটে দেয়, কে জানে!
মেঝের উপর পোয়ালের গাদিভরা চটের গদি, তার ওপর শতরঞ্চি, বালিশ-টালিশ নেই। পড়ে আছে। ছেলেরা বড় হয়েছে, কোকা ছাড়া পেয়ে এসে জুটেছে। বহেরু আর শান্তিতে ঘুমোতে পারে না। কেবল এই ঘরে এসে ঘুমোয়। তার ভাবখানা—বামুনকর্তা তো সারারাত জেগেই থাকেন। চোখে চোখে রাখবেনখন।।
তা ঠিক। ব্রজগোপাল জেগেই থাকেন আজকাল। বড় ঘুমের সময় আসছে। একটা আবছায়া নদী, তার পারাপার দেখা যায় না, ঘোর কুয়াশার ঢাকা। সেই নদীর শব্দ পান। উঠে বসেন নিঃঝুম মাঝরাতে। মশারির বাইরে মশাদের বিপুল কীর্তন। শিরদাঁড়াটা সোজা করে বসেন। বীজমন্ত্রের ধারা নেমে উঠে সারা শরীর আর সত্তায় ছড়িয়ে পড়ে। নাসামূলে ইঞ্চিটাক গভীরে তেসরা তিল। সেখানে দয়াল দেশ। বুড়ো বামুনের মাভৈঃ মুখ।
ধ্যানের মধ্যেই ব্রজগোপাল হাসেন। হারিয়ে যান।
তবু হারিয়ে যাওয়াও যায় না। সে তো ধর্ম নয়।
॥ ছেচল্লিশ ॥
ম্যাক্সের পুরনো জুতোজোড়া ছিঁড়ে গেছে। পোঁটলা-পুঁটলিও ওর বেশি কিছু নেই। আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে যখন থাকত তখনও ওর কিছু শৌখিন জিনিস ছিল। ক্যামেরা, একটা টেপ রেকর্ডার, দামি কিছু স্যুট, ঘড়ি। তার বেশিরভাগই চুরি হয়ে গেছে। রাস্তায় ঘাটে পড়ে থাকত ছেলেটা কিংবা ধর্মশালায়, শ্মশানে। সেই সময়েই গেছে। বাকি যা ছিল তা বিলিয়ে দিয়েছে কাঙালদের। এখন ওর যা কিছু সম্পত্তি তা একটা শান্তিনিকেতনি ঝোলা ব্যাগে এঁটে যায়।
সোমেনের বাড়িতে দুরাত্তির কাটিয়ে সকালবেলায় ব্যাগটা গুছিয়ে নিল ম্যাক্স। সোমেন তাকিয়ে দেখছিল। একটা দাঁত মাজার ব্রাশ, একটা বাড়তি পায়জামা, একটা বাঁকুড়ার গামছা, একটা গেঞ্জি, একটা পাঞ্জাবি, দুটো ডায়েরি, আর তিনটে কি চারটে ডটপেন। বুকপকেটে পাশপোর্ট থাকে একটা প্ল্যাস্টিকের ফোল্ডারে, তাতেই গোঁজা আছে কিছু টাকা, গায়ের পাঞ্জাবির পকেটে একটা রুমাল, কিছু খুচরো পয়সা, দেশলাই আর কয়েক প্যাকেট সিগারেট, একপ্যাকেট সস্তা চুয়িং গাম। ব্যস। এত অল্পে একটা লোকের চলে কী করে! ম্যাক্স এত উঞ্ছবৃত্তি শিখল কোথায়?
