বাপকু সোনা বলে সেই রণোর ছেলেবেলায় ডাকতেন তিনি। বহুকাল অব্যবহারে নামটা ভুলে গিয়েছিলেন। এক্ষুনি মনে পড়ল।
রণেনের ঠোঁট দুখানা একটু কাঁপে। পরমুহূর্তেই দুহাতের পাতায় মুখ ঢেকে মাথা নাড়ে প্রবলভাবে। অর্থাৎ ভাল নেই।
ব্রজগোপাল অন্যদিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলেন—তুমি বড় ভাল ছেলে বাবা, সংসার তোমার কাঁধে ফেলে রেখে আমি চলে গেছি, তুমি সব টেনেছ। বড় অপরাধী আছি তোমার কাছে বাবা।
রণেন নিস্তব্ধভাবে বসেছিল হাতের পাতায় মুখ ঢেকে। অনেকক্ষণ বাদে হঠাৎ সে একটু ফুপিয়ে ওঠে। ধরা গলায় বলে—এরা আমাকে আটকে রেখেছে।
ব্রজগোপাল ছেলের দিকে নিৰ্ণিমেষে তাকিয়ে ছিলেন, বললেন—তোমারই সংসার। আটকে কেন রাখবে? ওসব ভাবো কেন? কেউ আটকে রাখেনি।
বীণা ছেলে কোলে করে এ-ঘরে এল। দৃশ্যটা একপলকে তাকিয়ে দেখে বলল—বাথরুম খালি হয়ে গেছে। যাও।
রণেন মুখ তুলে বীণার দিকে তাকাল, চোখে ভয়। বলল—যাই।
—যাও। ব্রজগোপাল বললেন, হাত ধরে তুলে দিলেন ছেলেকে। বাথরুমের দিকে যতক্ষণ গেল ততক্ষণ চেয়ে রইলেন। রণেন খুব ধীরে ধীরে থপ থপ করে হেঁটে যাচ্ছিল, গায়ে যেন জোরবল নেই। প্রকাণ্ড শরীরের ভার যেন টানতে পারছে না।
কাল রাতে সোমেন যখন এল তখন তার সঙ্গে চুলদাড়িঅলা রাঙা এক সাহেব। বগুড়ার ছেলেবেলায় অনেক সাহেব দেখেছেন ননীবালা, কী সুন্দর সাজপোশাক কেমন ঝলমলে চেহারা। কিন্তু এ কি একটা সাহেবকে ধরে এনেছে সোমেন? রোগা, পরনে পায়জামা পাঞ্জাবি, সারা গায়ে ধুলোময়লা, চোখে মুখে ভীতু-ভীতু ভাব।
এসেই বলল—মা, আজ রাত্রে ম্যাক্স আমার কাছে থাকবে।
শুনে কপালে চোখ তুলেছেন ননীবালা। সাহেব মানুষরা বাংলাটাংলা বোঝে না, তাই তার সামনেই ননীবালা বলে ফেলেছিলেন—ও মা! সে কিরে, ওরা খ্রিস্টান…
সোমেন গলা নামিয়ে বলে—ও কিন্তু বাংলা জানে।
ননীবালা সামলে গেছেন। কিন্তু ছেলের আক্কেল দেখে অবাক। হিন্দু বাড়ির অন্দরমহলে কেউ সাহেবসুবো ধরে আনে? আচারবিচারের কথা না হয় ছেড়েই দিলেন, ঘরদোর জায়গাও নেই তেমন, রণোর অসুখের পর খাওয়া-দাওয়ারও আয়োজন তেমন নেই, দু-বেলা দুটো ডালভাত কি একটু মাছের ঝোল মাত্র রান্না হয়। এ দিয়ে কি অতিথিকে খাওয়াতে আছে! বীণাও খুশি হয়নি সাহেব দেখে। কেবল নাতি-নাতনিরা খুব ঘুরেফিরে সাহেব দেখছিল।
সাহেব হলেও ছেলেটা ভালই। এ-বাড়ির কেউ যে তাকে দেখে খুশি হয়নি তা বুঝতে পেরেই বোধ হয় বাইরের ঘরে জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল। চোখেমুখে ভারি ভালমানুষি আর ভয় মাখানো। মা-বাবা ছেড়ে কতদূরে পড়তে এসেছে। দেখেশুনে বুকের ভিতরটা ‘আহা’ করে উঠল ননীবালার।
রান্নাঘরে তাকে আর ঢোকাননি ননীবালা, বাইরের ঘরেই সোমেনের পাশে ঠাঁই করে খেতে দিলেন। আসনপিঁড়ি হয়ে বসে বেশ খেল। ঝিঙেপোস্ত, মুগের ডাল আর ট্যাংরার ঝাল। কোনও আপত্তি করল না। মাঝে মাঝে নীল রঙের চোখটা যখন তুলে তাকাচ্ছিল তখনই টের পাওয়া যাচ্ছিল যে বাঙালি ঘরের ছেলে নয়, নইলে ভাবভঙ্গি সব বাঙালির মতো। এতক্ষণ কথা বলেনি, বোবার মতো চুপ করেছিল। খেতে বসে কথা বলল—মা, ঝিঙেপোস্ত খুব ভাল হয়েছে।
মা! ননীবালা বড় অবাক। সাহেব ছেলেটা তাকে মা বলে ডাকছে! ননীবালা বিস্ময়টা সামলে নিয়ে বলেন—মা বলে ডাকছ বাবা? কার কাছে শিখলে-
ছেলেটা হেসে বলল—এখানে সবাই ডাকে। মেয়ে মাত্রই মা। আমার দেশে এরকম ডাকে না। আমি এ দেশে শিখেছি।
ননীবালা নিবিষ্টভাবে রোগা ছেলেটার দিকে চেয়ে থাকেন। ছেলেটা চেহারার যত্ন করে না, চুলদাড়িতে কেমন জঙ্গল হয়ে আছে মুখ। একটু যত্ন করলে গৌরাঙ্গের মতো চেহারাখানা চোখ জুড়িয়ে দিত।
ননীবালা শ্বাস ফেলে বলেন—মা বলে ডেকোনা বাবা, তা হলে ছেড়ে দিতে কষ্ট হবে। বলে একটু চুপ করে থেকে বলেন—মা হওয়ার জ্বালাই কী কম! সামনের জন্মে ছেলে হয়ে জন্মব, তা হলে আর মা হতে হবে না।
ছেলেটা চোখ তুলে বলে আবার জন্ম হবে? ঠিক জানেন?
ননীবালা অবাক হয়ে বলেন—জন্মব না? কর্মফল যতদিন না কাটে—
ম্যাক্স দুঃখিতভাবে বলে—আমরা খ্রিস্টানরা জন্মাই না, আমরা মাটির নীচে শুয়ে থাকি। টিল দ্য ডে অব জাজমেন্ট।
ননীবালা ফাঁপরে পড়ে বললেন—সাহেবরা জন্মায় না? তা হলে এত সাহেব জন্মাচ্ছে কোথা থেকে বাবা?
সোমেন বেদম হাসতে গিয়ে বিষম খেল। সঙ্গে বীণাও। ননীবালা বিরক্ত হয়ে বলেন—ওতে হাসার কী! সাহেবরা হয়তো জন্মায় না, কিন্তু আমরা হিন্দুরা ঠিক জন্মাই।
এইভাবে ছেলেটার সঙ্গে দিব্বি আলাপ-সালাপ হয়ে গেল। সাহেব হলেও নেইআঁকড়ে ভাব। দু-চোখে সব সময় কী যেন খুঁজছে, কী যেন দেখছে। সোমেন রণেন যেন অল্প বয়সেই বুড়িয়ে যাওয়া সবজান্তা ভাব, চোখের আলো নিবে যাওয়া রকম, ও তেমন নয়। ওর মনের কোনও আলিস্যি নেই।
ননীবালা নিজের বিছানায় সোমেনকে শুতে দিলেন, সোমেনের বিছানায় ম্যাক্স। ওরা নাকি রাত জেগে গল্প করবে। ননীবালা তাই বাইরের ঘরের সোফা-কাম-বেড-এ বিছানা পেতে নিলেন। সোফা-কাম-বেড-এ বড় অস্বস্তি, মাঝখানের দাঁড়াটা বড় পিঠে লাগে। এক কাৎ-এ শুয়েছিলেন, হঠাৎ মাঝরাতে দেখেন, আধো অন্ধকারে রণেন আন্ডারপ্যান্ট পরা অবস্থায় রেডিয়োর সামনে বসে। আস্তে রেডিয়ো ছেড়ে গান শুনছে, ওইরকমই সব করে আজকাল। উঠে বসে ছেলেকে ডাকলেন। সাড়া দিল না। থাক শুনুক। কিন্তু ননীবালার আর ঘুম হল না।।
