হাঁটতে হাঁটতে পুবের আকাশ ফরসা হয়ে এল। নিবে যাচ্ছে নক্ষত্রেরা। বেলদার বাজারের কাছে ব্রজগোপাল টিউবওয়েলে জুতোজোড়া আর কাদা মাখা পা দুখানা ধুয়ে নেন। চায়ের দোকানের ঝাঁপ খুলেছে ভোরেই, দিন মজুর আর কামিনরা বসে ধোঁয়াটে চা খাচ্ছে, সঙ্গে সস্তা বিস্কুট। আসাম-চায়ের কড়া লিকারের গন্ধে জায়গাটা ম ম করে। মানুষজনের দিকে একটু চেয়ে থাকেন ব্রজগোপাল। বুকের মধ্যে বড় মায়া। মানুষেরা সব বেঁচে থাক।
অফিসের ভিড় শুরু হওয়ার আগেই কলকাতায় পৌছে গেলেন। বাসটাও ফাঁকা রাস্তায় চল্লিশ মিনিটে ঢাকুরিয়ায় নামিয়ে দিয়ে গেল। সংকুচিত ব্রজগোপাল সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেন। একটু সকাল সকালই এসেছেন ইচ্ছে করে। বেলায় এলে দুই ছেলেকে পাওয়া যায় না।
দরজা খুলল বীণা। দেখে খুশি হল না বিরক্ত হল তা বোঝা গেল না। চেহারাটা কিছু রোগা হয়ে গেছে, হনুর হাড় উঁচু হয়ে আছে শ্রীহীনভাবে। মুখে হাসি ছিল না। একটু তাকিয়ে রইল, যেন চিনতে পারছে না। তারপর সরে গিয়ে বলল—আসুন।
ঘরে ঢুকতেই এক বদ্ধ চাপা ভ্যাপসা ভাব। বাসি ঘরদোরের গন্ধ। পরিষ্কার দেখতে পান পরদার ফাঁক দিয়ে এখনও বিছানায় মশারি ফেলা। সবাই ঘুম থেকে ওঠেনি। ঠিকে ঝিয়ের বাসনমাজার শব্দ আসছে। বেলা পর্যন্ত ঘুমোয় সব। খারাপ অভ্যাস।
সোফার ওপর একটু হেলান দিয়ে বসলেন। কলকাতার এইসব বাক্স-বাড়িতে এরা দিনের পর দিন কি করে থাকে তা আজকাল ভাবতে বড় অবাক লাগে। এ শহরে যারা আছে, ব্যাপারি-ফড়ে-দালাল তারা চিবিয়ে চিবিয়ে রস নিংড়ে নিচ্ছে অহরহ। পড়ে আছে একটা ছিবড়ে শহর। কলকাতার প্রতি মানুষের মোহ আছে, মায়া নেই। মায়া জন্মায় বড় অদ্ভুতভাবে। যেখানে জনপদে মানুষ চাষ করে, গাছ লাগায়, গৃহপালিত পশু পাখিকে ভুক্তাবশিষ্ট দেয়, যেখানে মাটির সঙ্গে সহজ যোগ, মায়া সেখানে জন্মায়।।
ব্রজগোপাল বললেন—কেউ ওঠেনি এখনও?
বীণা বলে—মা উঠেছেন। জপ করতে বসলেন এইমাত্র। আর কেউ ওঠেনি, মোটে তো সাতটা বাজে।
গোবিন্দপুরের সকাল সাতটা মানে অনেক বেলা। ব্রজগোপাল গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বলেন—রণো?
—ওঠেনি। ওষুধ খেয়ে ঘুমোয়। নিজে থেকে না উঠলে ডাক্তার ডাকতে বারণ করেছে।
—হয়েছে কী?
বীণার ভিতরের রাগ আর ক্ষোভ চাপা ছিল। হঠাৎ যেন এই প্রশ্নে সেটা আগুনের মতো উসকে উঠল। একটু চাপা গলায় বলে—হবে আর কী! বংশের রোগ।
ব্রজগোপাল একটু অবাক হন। মেয়েটা বলে কী? বংশের রোগ? তাঁদের বংশে কারও কোনও মানসিক রোগ ছিল বলে তিনি জানেন না। রণোরই প্রথম মানসিক ভারসাম্যের অভাব দেখা দিয়েছিল সেই ছেলেবেলায়, টাইফয়েডের পর। বীণার দিকে চেয়ে অন্যমনস্ক ব্রজগোপাল বললেন—বংশের রোগ। সে কীরকম?
বীণা উত্তর দিল না। বাথরুমের দরজায় গিয়ে ঝিকে ধমক দিল- কতদিন বলেছি সকালবেলাটায় বাথরুম বেশিক্ষণ আটকে রাখবে না!
ব্রজগোপাল অসহায়ভাবে একা বসে থাকেন। সবাই ঘুমোচ্ছে, কেবল ছোট নাতিটা বোধ হয় এইমাত্র উঠে ‘মা’ বলে কাঁদছে। বীণা পলকে দৌড়ে গেল। ব্রজগোপাল শুনলেন গুমুর গুমুর দুটো-তিনটে কিল ছেলের পিঠে বসিয়ে বীণা বলল—কতদিন বলেছি সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁদবে না। কোন মা মরা ছেলে যে কাঁদতে বসেছ? বাবা ঘুমোচ্ছে দেখছ না! ছেলেটা ভয়ে চুপ করে গেল।
ব্রজগোপাল শুনলেন। কিছু করার বা বলার নেই। চুপচাপ বসে থাকা। কতক্ষণ এভাবে বসে থাকতে হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। বোধ হয় ওদের সময়ের অনুসারে একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন। এতটা সকালে না এলেই হত। বংশের রোগ। কথাটা মন থেকে তাড়াতে পারেন না তিনি। বউটা এ কথা বলল কেন? তাঁদের বংশে কার ওই রোগ ছিল?
বসে বসে ভাবছিলেন ব্রজগোপাল। বড় ছেলের ঘর থেকে একটা কোঁকানির শব্দ এল। বিকট ‘উফ’ করে কে যেন পাশ ফেরে। বোধ হয় রণোই। বীণা চাপা স্বরে বলে—উঠছ কেন? শুয়ে থাকো!
রণোর গলার স্বর পাওয়া গেল—উঠব না! ক’টা বাজে?
গলার স্বরটাই অন্যরকম। কেমন অবাকভাব, শিশুর মতো। ব্রজগোপাল নিবিষ্ট হয়ে শুনছিলেন।
বীণা বলে—বেশি বাজেনি। আর একটু ঘুমোও।
রণো বলল—ঘুম হবে না। বাথরুমে যাব।
বীণা ধমক দিয়ে বলে—আঃ এখন উঠবে না।।
আবার একটা ককিয়ে ওঠার শব্দ পান ব্রজগোপাল, তখন ব্রজগোপাল একটু কাশলেন। ইঙ্গিতবহ কাশি। রণো যদি শুনতে পায়, ঠিক বুঝবে যে বাবা এসেছে।
রণেন শুনল। জিজ্ঞেস করল—বাইরের ঘকে কে?
বীণা চাপা স্বরে কী যেন বলে।
রণার স্বর শোনা যায় বলোনি কেন এতক্ষণ?
একটা বড় শরীর বিছানা থেকে উঠল, শব্দ পেলেন ব্রজগোপাল। পর মুহুর্তেই নীল লুঙ্গিপরা খালি-গা রণো পরদা সরিয়ে চৌকাঠ জুড়ে দাঁড়াল।
—বাবা!
ব্রজগোপালের এ বয়সে বোধ হয় একটু ভুলভ্রান্তি স্বাভাবিক। হঠাৎ যেন বা আত্মবিস্মৃত ব্রজগোপাল চোখ তুলে তাঁর দিকে ছোট রণোকে দেখতে পান। যেভাবে শিশু পুত্রের দিকে হাত বাড়ায় বাপ তেমনি হাত বাড়িয়ে বললেন—আয়।
রণেন দৌড়ে এল না। কিন্তু এক-পা দু-পা করে কাছটিতে এসে পাশে বসল। ব্রজগোপালের মুখের দিকে নিবিড় দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে প্রবল উৎকণ্ঠাভরে বলল—কেমন আছো?
এটা নিছকমাত্র কুশল প্রশ্ন নয়, এর মধ্যে যেন-বা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। ব্রজগোপাল রণেনের মাথায় আলতো হাত রেখে বললেন—বাপকু সোনা, কেমন আছো বাবা?
